মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

করোনায় বস্তিবাসী কেমন আছেন?

বস্তিবাসীর কল্যাণ বা দেশের কথা ভেবে সরকার বা অন্য যে কোনো সংগঠনের এদের বিষয়ে তাড়াতাড়ি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। যাতে দেশের সব নাগরিক করোনা সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকতে পারে। চীন যদি পারে আমরাও আলস্নাহর রহমতে করোনার সংক্রমণ থেকে মুক্ত হতে পারব। কিন্তু দরকার সচেতনতা আর মনোবল। আমরা যেন সবাই মিলে সুন্দর ও অনুকূল পরিবেশে বসবাস করে এগিয়ে যেতে পারি এটাই হোক আমাদের কামনা।
করোনায় বস্তিবাসী কেমন আছেন?

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় পোশাকশ্রমিক ও বস্তিবাসী কেমন আছেন? জানতে ইচ্ছে করল। কারণ আমরা সাধারণত ধনী শ্রেণির খবর রাখি। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষের খবর কম রাখি। কষ্ট করে এক লোকের নম্বর সংগ্রহ করে কল দিলাম। কল দিয়ে নানা সমস্যার কথা শুনলাম। তারা ভালো নেই।

পোশাকশ্রমিকরা গণপরিবেশে কাজ করেন, এমনকি ৩০-৪০ জন এক রুমে কাজ করতে হয়। আমরা একদিকে বলি জনসমাগম ও জনসমাবেশ পরিহার করতে, অন্যদিকে এরা গণরুমে কাজ করে যাচ্ছেন। এটা কেমন খবর। যদিও আপাতত গার্মেন্ট বন্ধ রয়েছে। তবে পিপিই তৈরির জন্য চট্রগ্রামের একাধিক গার্মেন্ট খোলা রয়েছে। নিম্ন লেবেলে করোনার আতঙ্ক বেশি কাজ করছে। কারণ তারা এক সঙ্গে গণরুমে থাকছে।

সম্প্রতি করোনার সংক্রমণ থেকে শ্রমিকদের ঝুঁকি কমানোর জন্য সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখা এবং স্ব বেতনে ছুটির জন্য বাংলাদেশ পোশাকশ্রমিক সংহতি সরকার ও মালিকপক্ষের কাছে অনুরোধ করেছেন। শেষ পর্যন্ত গার্মেন্ট বন্ধ করা হয়েছে। তখন তারা এ অভিযোগ করেছিলেন, বেশির ভাগ পোশাক কারখানায় নিরাপদে হাত ধোঁয়া বা স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা, ভিটামিন সি গ্রহণসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের ঘাটতি রয়েছে। শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে অপরিচ্ছন্ন হাতে মেশিন ও অন্যান্য দ্রব্য স্পর্শ করেন। যা তাদের জীবনের জন্য খুবই হুমকিস্বরূপ। তারা সর্বদা আতঙ্কের মধ্যে কাজ করছেন। এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতারা তাদের অফিসে মাঝেমধ্যে আসেন যা করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।

পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। গার্মেন্টশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের ৮০-৯০ শতাংশ এই পেশায় ভর করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট জিডিপির ১১.৮৭% গার্মেন্টশিল্প থেকে আসে। বৈদেশিক আয়ের ৮৩% আমরা পোশাকশিল্প থেকে পেয়ে থাকি। ২৩ মার্চ ২০২০, বিজিএমইএ সভাপতির কথা অনুসারে ৮৯টি গার্মেন্টশিল্প কারখানার যেখানে ৮৭ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ৬২২টি অর্ডার বাতিল করেছে। দিন যত যাচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম খাত পোশাকশিল্পের ওপর করোনার নেতিবাচক প্রভাব তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এটা অর্থনীতির জন্য চরম অশনিসংকেত। বিপুলসংখ্যক লোক এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এমনকি তাদের পরিবারের ওপর নির্ভরশীল। আবার বৈদেশিক ক্রেতারা নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনসহ পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলেছেন, পোশাকশ্রমিকের জন্য উত্তম পরিবেশ নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।

পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাতে কোনো প্রকার পোশাকশিল্পে সমস্যা ও বিতর্ক সৃষ্টি না হয়। তাহলেই দেশ ও জাতির জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক মঙ্গল হবে বলে মনে করছি। চারদিকে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রেখে করোনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ একান্ত জরুরি।

অন্যদিকে আশার আলো দেখাচ্ছেন ঢাকার কেরানিগঞ্জের গার্মেন্টপলিস্ন। তারা ২৩ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সব কারখানা ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সব শ্রমিক তাদের বেতন-ভাতা যথারীতি প্রাপ্য হবেন। এটা প্রশংসার দাবিদার।

বস্তির খবর মারাত্মক। বস্তিগুলো এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গড়ে ওঠে। যেখানে পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন ও রাস্তাঘাটের সুবিধা পর্যাপ্ত বা মানসম্মত নয়। বস্তির জীবন মানে আগুনের সঙ্গে যুদ্ধ করা আর উচ্ছেদের ভয়। তাই এক ভীতিকর পরিবেশের সঙ্গে করোনা আতঙ্ক নিয়ে চলছে তাদের জীবন। নতুন করে যোগ হয়েছে করোনা সংক্রমণ। যা তাদের জীবন চলার পথ কঠিন করে দিচ্ছে। ২০১৬ সালের তথ্য অনুসারে ঢাকায় ও গাজীপুরে প্রায় ২২ লাখ লোক বস্তিতে বসবাস করছে। বর্তমানে প্রায় ১১০০০-১২০০০ বস্তি রয়েছে। বস্তিতে অধিকাংশ লোক এক শয়নকক্ষ বিশিষ্ট ঘরে থাকে। তাদের মধ্যে ৯৫% লোক পাইপ বাহিত খাবার পানি এবং ৯০% পরিবার ভাগাভাগি করে ল্যাট্রিন ব্যবহার করে। বস্তির বেশি লোকই অশিক্ষিত এবং ৮ বা ৮-এর বেশি বছর বয়সি ছেলেমেয়েরা অর্থ উপার্জনের সঙ্গে জড়িত। যাদের মধ্যে পরিবেশ ও সমাজ নিয়ে নেই কোনো সচেতনতা। আমি এ বিষয়ে লিখতে গিয়ে পোশাক শ্রমিকের মতো একজনের কাছে থেকে বস্তির এক লোকের নম্বর নিলাম ও কল দিয়ে শুনলাম তাদের বস্তিতে প্রায় তিন লাখ লোক বসবাস করেন, বস্তির নাম হলো গুলশানের কড়াইল বস্তি এবং এটি নাকি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বস্তি। শুধু ওখানে করোনা সম্পর্কে মাইকিং করা হয়েছে। করোনাভাইরাস সম্পর্কে জানতে পারলেও সতর্ক হওয়ার মতো সচেতনতা কিংবা সামর্থ্য নেই তাদের। রাজধানীসহ সব জায়গায় করোনার ভয়ে মানুষ বারবার হাত ধুচ্ছেন, মাস্ক ব্যবহার করছেন, ঘরে বসে দিন কাটাচ্ছেন, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করছেন। কিন্তু গুলশান, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ভাষানটেক, ফতুলস্না এবং গাজীপুরের বস্তিবাসীরা কীভাবে জীবন পার করছেন? তারা এক ধরনের আতঙ্ক ও নিরুপায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যদি এসব জনবসতিপূর্ণ এলাকায় কোনোভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমণিত হয়, তাহলে মহামারি দেখা দেবে সম্পূর্ণ বস্তিতে। তাদের নিয়ে কোনো সংস্থা বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। এ ছাড়া সব এলাকাতে সরকারেরও কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। অনেকের মাস্ক কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই। তারা একমাত্র আলস্নাহর উপর ভরসা করে জীবন পার করছে। কেউ কেউ মনে করছে করোনায় তাদের মরণ হবে। আমরা শুধু হোয়াইট কলার শ্রমিক বা লোকদের বিষয় ভাবী, কিন্তু বস্নু কলার লোকদের খোঁজ কেউ রাখি না। পোশাক কর্মীরা ও বস্তিবাসী উভয় শ্রেণি করোনা আতঙ্কে তাদের জীবন অতিবাহিত করছেন। এদের মধ্যে যদি করোনা হানা দেয়, তা নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে পড়বে।

বস্তিবাসীর কল্যাণ বা দেশের কথা ভেবে সরকার বা অন্য যে কোনো সংগঠনের এদের বিষয়ে তাড়াতাড়ি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। যাতে দেশের সব নাগরিক করোনা সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকতে পারে। চীন যদি পারে আমরাও আলস্নাহর রহমতে করোনার সংক্রমণ থেকে মুক্ত হতে পারব। কিন্তু দরকার সচেতনতা আর মনোবল। আমরা যেন সবাই মিলে সুন্দর ও অনুকূল পরিবেশে বসবাস করে এগিয়ে যেতে পারি এটাই হোক আমাদের কামনা।

মো. শফিকুল ইসলাম: পিএইচডি ফেলো, জংনান ইউনির্ভাসিটি অব ইকোনমিকস অ্যান্ড ল, উহান, চীন এবং শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2020

Design and developed by Orangebd


উপরে