শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি ২০২১, ৮ মাঘ ১৪২৭

মানসম্মত শিক্ষা ও ঝরেপড়া

মানসম্মত শিক্ষাই পারে টেকসই উন্নয়নের গতি বেগবান করতে। আমরা আশা করতে পারি, মিড-ডে-মিল কার্যক্রম প্রাথমিকে ঝরেপড়ার হার আরও অনেক কমিয়ে আনবে। সে সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকেও ঝরেপড়া হ্রাস পাবে এবং সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হবে।
মানসম্মত শিক্ষা ও ঝরেপড়া

শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন ও পরিমার্জন করার উদ্দেশ্য হলো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষাকে আরো যুগোপযুগী করে তোলা। শিক্ষার এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার বহুবিধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এসব বহুবিধ উদ্দেশ্যের মধ্য অন্যতম হলো শিক্ষায় টেকসই উন্নয়ন সাধন বা মানসম্মত শিক্ষা প্রণয়ন করা। যেখানে শিক্ষার্থীর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়া হ্রাস করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘদিনের পদক্ষেপ। ঝরে পড়া আমাদের দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই সমস্যা ক্রমহ্রাস করার চেষ্টাও দীর্ঘদিনের। সেই চেষ্টার অন্যতম সফলতা হলো মিড-ডে-মিল বা দুপুরের খাবার। মিড-ডে-মিল প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বৃদ্ধি করা এবং পুষ্টি নিশ্চিত করা এই দুই প্রধান উদ্দেশ্য সাধন করবে। এ ছাড়াও বহুমুখী উদ্দেশ্যও রয়েছে। তবে এটি যে ঝরে পড়া রোধে সহায়ক হবে তা বলাই যায়। কিন্তু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে কেন এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার। কেন শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে বা কেন হঠাৎ বিদ্যালয়ে আসা ছেড়ে দেয় তার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে দরিদ্রতা। অবশ্যই এটি কেবল আমাদের দেশের সমস্যা নয় বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অনেকে দেশেই এই সমস্যা রয়েছে। দরিদ্রতা উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যার দূর হওয়ার কথা। মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে দরিদ্রতার সঙ্গে আরও একটি সমস্যা হলো বাল্যবিবাহ। পাবলিক পরীক্ষা এসএসসি, জেএসসি এমনকি পিইসি পর্যন্ত যেসব মেয়ে শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকে তাদের একটি বড় অংশের অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধান করলে বাল্যবিয়ে কারণ হিসেবে দেখা যাবে। এই সমস্যার সঙ্গে বহু আগে থেকেই সচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে। তবুও এটি ঘটেই চলেছে। একই সময় ছেলে শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে অনেককেই বিভিন্ন শ্রমমূলক কাজে দেখা যাবে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৩৫ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। প্রথম শ্রেণিতে ১০০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হলে এসএসসি পর্যন্ত পৌঁছাছে ৬৫ জন। সরকারের দুটি সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরো। ২২ মার্চ এটি প্রকাশের কথা থাকলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে তা স্থগিত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অপরটি গত মাসে প্রকাশ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাহলে বাকি ৩৫ জনের গন্তব্য কোথায়? কেন এরা পরীক্ষা দিচ্ছে না? সরকারের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা হলো সবাইকে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করানো। দেশকে স্বনির্ভর করতে হলে এর কোনো বিকল্পও নেই। উভয় প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রাথমিক স্তরে বর্তমানে ঝরে পড়ার হার ১৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ৬১ দশমিক ৪ জন পিইসি পরীক্ষা পাস করে। তাদের মধ্যে আবার ৪ জনই ভর্তি হয় না মাধ্যমিকে। ঝরে পড়ার কারণ হিসেবে আটটি কারণ উলেস্নখ করা হয়েছে। এগুলো হলো- পরিবারের অন্যত্র চলে যাওয়া, বইখাতাসহ লেখাপড়ার উপকরণ নষ্ট হয়ে যাওয়া, তাৎক্ষণিকভাবে স্কুলের ব্যয় বহনে অক্ষমতা, বাবা মাকে ঘরের কাজে সহায়তা করা, উপার্জনে বা ভাগ্যান্বেষণে নেমে পড়া, লেখাপড়ায় আগ্রহ না পাওয়া, স্কুলে যেতে নিরাপদ বোধ না করা, যাতায়াতে যানবাহন সংকট সমস্যা ইত্যাদি। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট যে পড়ালেখার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে অনেক পরিবারই তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে এবং এ ক্ষেত্রে তাদের সদিচ্ছারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ধরে রাখার জন্য সরকার যেসব প্রচেষ্টা করেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো বিনামূল্যে বই বিতরণ। বছরের শুরুতেই নতুন বই লাইব্রেরি থেকে কিনতে হচ্ছে না। যা অভিভাবকের মধ্যে এক সময় মানসিক চাপ হিসেবে বিরাজ করত। যেহেতু বছরের শুরুতেই বিনামূল্যে নতুন বই নিয়ে সন্তান বাড়ি ফিরছে। ফলে সেই মানসিক চাপটা এখন আর নেই। তবে সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে কোনো একক বিষয় প্রভাব বিস্তার করার চেয়ে বহু উদ্যোগ ভালো কাজে দেয়। বিনামূল্যে বইয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির কথা বলা যায়। প্রাথমিকের প্রতিটি ছাত্রছাত্রী প্রতি মাসে এই উপবৃত্তি পাচ্ছে- যা তার লেখাপড়াকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে। এটা শিক্ষার্থীর এবং তার অভিভাবকের বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহও বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। তবুও ঝরে পড়ার হার হ্রাসে অগ্রগতি গত পাঁচ বছরে সামান্যই। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান বু্যরোর তথ্যমতে, ২০১৯ সালে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৭ দশকি ৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০১৭ সালে ১৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ, ২০১৬ সালে ১৯ দশমিক ২ শতাংশ, ২০১৫ সালে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ২০ দশমিক ৯ শতাংশ। এই পাঁচ বছরের হিসেবে ঝরে পড়ার হারে খুব বেশি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। অথচ এ সময়ে শিক্ষায় বহু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ফলে এই হার আরও কমা প্রয়োজন ছিল। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে এই হার কমাতেই হবে। মাধ্যমিকে ২০১৮ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ৩৭ দশমিক ৬২ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৩৭ দশমিক ৮১ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৩৮ দশমিক ৩০ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৪০ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ৪১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিকে ২০১৮ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ, ২০১৭ সালে ১৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ২০১৬ সালে ২০ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, ২০১৫ সালে ২০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ২১ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

আমাদের লক্ষ্য এসডিজি অর্জন করা। আর এসডিজি অর্জনের জন্য মানসম্মত শিক্ষা অপরিহার্য। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত না করতে পারলে ঝরে পড়ার হারও কমিয়ে আনা সম্ভবপর হবে না। অন্য সব কারণের সঙ্গে আনন্দহীন শিক্ষা ব্যবস্থাও ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে খানিকটা দায়ী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক বা মানসিক আঘাত করা নিষিদ্ধ করা হলেও আজও পত্রপত্রিকায় শিক্ষকের বেতের আঘাতে শিক্ষার্থীর আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ শারীরিক শাস্তি বহাল তবিয়তেই রয়েছে। কেউ আইনের তোয়াক্কা করছেন না। এটা শিক্ষকের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার প্রতিই বিরূপ ধারণা শিক্ষার্থীর মনে জন্ম দেয়। ফলে সামান্য কারণেই যখন তাকে আর স্কুলে যেতে হয় না সে তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এ জন্য প্রয়োজন আনন্দপূর্ণ পাঠদান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান আনন্দপূর্ণ করার নানা কৌশল প্রণীত হয়েছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তা রপ্ত করানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তা প্রয়োগ করা হয় কমই। তা ছাড়া শিক্ষার্থীদের একটি বিরাট অংশ বেসরকারি স্কুলে লেখাপড়া করছে। যেখানে কর্তৃপক্ষের নজরদারি কমই রয়েছে। প্রচুর পরীক্ষা, প্রাইভেট বা কোচিংয়ের চাপ এসব প্রতিষ্ঠানের ভালো ফলাফলের মূল কৌশল। মোট কথা শিক্ষার সঙ্গে আনন্দের সমন্বয় কমই ঘটছে। ফলে শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারাচ্ছে। আগেই বলেছি দরিদ্রতা একটি বড় বাধা। আমাদের দেশ দরিদ্রতা থেকে উত্তরণের পাশাপাশি মানসম্পন্ন শিক্ষা অর্জনে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তবে শিক্ষায় বাজেট আরও বাড়াতে হবে। ঝরে পড়া রোধে শিক্ষার পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রাথমিকে ভর্তির হার প্রায় শতভাগে উন্নীত হয়েছে। এটি একটি বড় সাফল্য। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে জেন্ডার সমতাও নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু এদের ধরে রাখতে হবে এবং উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। এই শিক্ষা হবে মানসম্মত শিক্ষা।

মানসম্মত শিক্ষাই পারে টেকসই উন্নয়নের গতি বেগবান করতে। আমরা আশা করতে পারি, মিড-ডে-মিল কার্যক্রম প্রাথমিকে ঝরেপড়ার হার আরও অনেক কমিয়ে আনবে। সে সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকেও ঝরেপড়া হ্রাস পাবে এবং সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হবে।

অলোক আচার্য : শিক্ষক ও কলাম লেখক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে