ডিজিটাল দেশের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা অপরিহার্য :প্রধানমন্ত্রী

ডিজিটাল দেশের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা অপরিহার্য :প্রধানমন্ত্রী
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশে ছোট বোন শেখ রেহানা -ফোকাস বাংলা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে 'লেখক-সাংবাদিকদের নির্যাতন' ইসু্যতে বলেছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ যখন গড়ে তুলেছি, তখন ডিজিটাল নিরাপত্তা দেওয়াও আমাদের দায়িত্ব। কেউ যেন সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদে না জড়াতে পারে, সে জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা অপরিহার্য। তিনি বলেন, যারা সমালোচনা করছে, তারা সবকিছু কী অনুধাবন করছে? আজকের এই দিনে আমি অন্য কিছু বলতে চাই না। শুধু এটুকুই বলব, কারও মৃতু্যই কাম্য নয়। তবে সেটাকে উদ্দেশ্য করে অশান্তিও কাম্য নয়। অসুস্থ হয়ে মারা গেলে কী করার আছে?

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে। আর এই অর্জন দেশবাসীকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে প্রধানমন্ত্রী শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। গণভবন প্রান্ত থেকে ভার্চুয়ালি অংশ নেওয়া সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নিজের টিকাগ্রহণ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, কারাগারে লেখক মুশতাকের মৃতু্য, করোনা টিকা, আল-জাজিরার প্রসঙ্গসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন। এ সময় তার সঙ্গে ছোট বোন শেখ রেহানা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, তথ্যমন্ত্রী ডক্টর হাছান মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। নিউইয়র্কে ইউএন-সিডিপির ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভায় স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে বাংলাদেশের চূড়ান্ত সুপারিশ

পাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার কৃতিত্ব জনগণকে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এক যুগ আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। আজকের বাংলাদেশ এক বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। আমাদের এই উত্তরণ এমন এক সময় ঘটল, যখন আমরা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন করছি। আমরা মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে। বাংলাদেশের জন্য এই উত্তরণ এক ঐতিহাসিক ঘটনা।

এটি বাংলাদেশের একটি মহৎ এবং গৌরবোজ্জ্বল অর্জন উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পথচলার কৃতিত্বের জন্য নতুন প্রজন্মকে অভিবাদন জানান। তিনি করোনা মোকাবিলায় তার নয়, বাংলাদেশের জনগণের ম্যাজিক ছিল বলে উলেস্নখ করেন। তিনি বলেন, এটা কোনো ম্যাজিক নয়, আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ। এই জায়গা থেকে কাজ করেছি।

আল জাজিরার সংবাদ নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় বাংলাদেশ- এমনটি উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা টেলিভিশন কী করল, এটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্যও নেই। দেশবাসী দেখেছে, তারা কী করেছে!

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছি। তাদের পরিবার কী বসে থাকবে? সুযোগ পেলে তো সব বিরোধীপক্ষ (আল্টার লেফট ও আল্টার রাইট) এক হয়ে যায়। প্রতিটি বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ কাজ? তবুও আমরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এর স্থায়িত্ব ধরে রাখতেও প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছি। তিনি বলেন, যারা স্বাধীনতা চায়নি, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, আমাকে হত্যারচেষ্টা করেছে, তারা কীভাবে দেশের এগিয়ে যাওয়া সহ্য করবে?

২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেবেন কিনা জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, '২০২৪ আসলে তখন সিদ্ধান্ত নেব, কী করব। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য ২০২৬ সাল পর্যন্ত তার মান ধরে রাখতে হবে। এ জন্য আমাদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। আমার মনে হয়, এ কথার মধ্যে সব উত্তর আছে।'

করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলার লক্ষ্যে আরও তিন কোটি ডোজ টিকা আমদানির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশেও যাতে টিকা উৎপাদন করা যায়, সে ব্যবস্থাও সরকার নিচ্ছে। ইতোমধ্যে আমি নির্দেশ দিয়েছি, আরও তিন কোটি ডোজ কেনার জন্য। যাতে করে আমাদের যেটা আছে, সেটা প্রথম ডোজ দেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ আমরা শুরু করব, সঙ্গে সঙ্গেই যেন আবার টিকা আমাদের হাতে এসে যায়, একটা মানুষও যাতে এই টিকা থেকে বাদ না যায়, তার ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেসব কোম্পানি টিকা তৈরি করেছে, তাদের অনুমতি নিয়ে দেশেই টিকা উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। কোনো দেশ যদি উৎপাদন করতে না পারে, প্রয়োজনে আমাদের দেশ উৎপাদন করতে পারবে। আমি আমাদের বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে ইতোমধ্যে বলেছি, কারা কারা এটা করতে পারবে, এর জন্য প্রস্তুত থাকা এবং এখানে সিড যাতে আনা যায়, এর ব্যবস্থা করা যায় কিনা, সেটাও আমরা দেখছি।

প্রাইমারি থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত স্কুল-কলেজের সব শিক্ষক-কর্মচারী এবং যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বা হোস্টেলে থাকবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী যে বয়সিদের টিকা দেওয়া যায়, তাদের সবাইকে টিকার আওতার আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারণ, আমরা আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুব দ্রম্নত খুলতে চাই। পড়াশোনার পরিবেশটা ফিরিয়ে আনতে চাই।

নিজে কবে টিকা নেবেন- এমনটি জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, 'আমি টিকা অবশ্যই নেব, কিন্তু এর আগে দেশের কত পার্সেন্ট মানুষ নিতে পারল, কতজনকে দিতে পারলাম, সেটা আমি আগে দেখতে চাই। কারণ, আমার একটা টিকার জন্য যদি আরেকটা মানুষের জীবন বাঁচে, সেটাই তো সবচেয়ে বড় কথা। আমার বয়স এখন ৭৫ বছর। আমি খোঁজ নিচ্ছি, আমাদের একটা টার্গেট করা আছে, এই সংখ্যা পর্যন্ত আগে আমি নির্দিষ্টভাবে দেব, এটা যখন হবে, এরপর আমারটা আমি নেব, যদি টিকা বাঁচে।

উন্নয়নের চলমান গতিধারা বজায় থাকলে বাংলাদেশ অচিরেই উন্নত দেশের কাতারে উঠে আসবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ অতিক্রম করে। বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবেশ করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর বাংলাদেশের উল্টো পথে যাত্রা এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর আবার উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৮-০৯ বছরে জিডিপির আকার ছিল মাত্র ১০৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০ সালে তা ৩৩০.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০৮-০৯ বছরে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ১৫.৫৭ বিলিয়ন ডলার। আর ২০১৮-১৯ বছরে তা ৪০ দশমিক পাঁচ-চার বিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধি পায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৮-০৯ বছরের ৭ দশমিক ৪-৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৪৪ দশমিক শূন্য-তিন বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০১ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮.৯ শতাংশ এবং হত-দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৪.৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে শতকরা ২০.৫ ভাগ এবং হত-দারিদ্র্যের হার ১০.৫ শতাংশে। ২০০৯-১০ সালে বিদু্যতের উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৫,২৭১ মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদু্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৪ হাজার ৪২১ মেগাওয়াটে উন্নীত এবং বিদু্যৎ সুবিধাভোগী জনসংখ্যা ৪৭-৯৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে তৃতীয় এবং মাছ-মাংস, ডিম, শাকসবজি উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে এবং ইলিশ উৎপাদনকারী ১১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম।

উন্নয়ন অভিযাত্রায় 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' এর সুবিধা শহর থেকে প্রান্তিক গ্রাম পর্যায়েও বিস্তৃত হয়েছে। 'বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট' এর সুবিধা কাজে লাগিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এক বৈপস্নবিক পরিবর্তন এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু আয় দুই হাজার ৬৪ ডলার। অর্থাৎ মানদন্ডের চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৭ গুণ। মানবসম্পদ সূচকে নির্ধারিত মানদন্ড ৬৬-এর বিপরীতে বাংলাদেশের অর্জন ৭৫.৪। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে উত্তরণের জন্য মানদন্ড নির্ধারিত ছিল ৩২ বা এর কম। কিন্তু ওই সময় এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২৭।

১৯৭৫ সাল থেকে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে থাকা বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা ইউএন-সিডিপির সব শর্ত পূরণ করে ২০১৮ সালে।

জাতিসংঘের নিয়মানুযায়ী, কোনো দেশ পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণের মানদন্ড পূরণে সক্ষম হলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ পায়। সিডিপি তিনটি সূচকের ভিত্তিতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করে। তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ শর্ত পূরণ করে অনেক এগিয়ে গেছে।

উন্নয়নশীল দেশ হতে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হয় কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশ ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১৮২৭ ডলার। সিডিপির প্রবিধান অনুযায়ী, উত্তরণের সুপারিশ পাওয়ার পর একটি দেশ তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত প্রস্তুতিকালীন সময় ভোগ করতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন মূখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস। শুরুতেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার উপস্থাপনা সবার দৃষ্টি কাড়ে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর হাতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশপত্র তুলে দেন অর্থমন্ত্রী। এরপর প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় প্রান্তে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, আওয়ামী লীগের নেতা ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে