ঈদযাত্রায় করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের শঙ্কা

ঈদযাত্রায় করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের শঙ্কা

সড়ক পথের দূরপালস্নার গণপরিবহণ এবং লঞ্চ ও ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকলেও ঈদকে সামনে রেখে বিকল্প নানা উপায়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ গাদাগাদি করে গ্রামে ফিরে গেছে। আরও বিপুল সংখ্যক গার্মেন্টস শ্রমিক, দোকান কর্মচারী, রিকশা-ভ্যান-অটোরিকশাচালক ঈদের দিন বাড়িতে ফেরার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। সব মিলিয়ে বাড়ি ফেরা মানুষের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে এভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষের ঈদযাত্রায় দেশে করোনাভাইরাসের তৃতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। যা সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, 'ঈদে যেভাবে মানুষ বাড়ি ফিরছে, তাতে দেশে করোনাভাইরাসের তৃতীয় ঢেউয়ের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। আমরা নিজেদের সর্বনাশ নিজেরা ডেকে আনলে, করোনার সংক্রমণ থেকে মুক্তি পাওয়া মুশকিল।'

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, শহরের কর্মস্থল থেকে গ্রামে ছুটে যাওয়া উপসর্গহীন করোনা রোগীর মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে ভয়াবহভাবে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে। তাদের ভাষ্য, গ্রামে থাকা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে লাখ লাখ মানুষ বাড়িতে ছুটে গেলেও তাদের এ আগমন সহসাই বিষাদে রূপ নিতে পারে। যা হয়তো ঈদ পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যেই টের পাওয়া যাবে।

তাদের ভাষ্য, ঈদকে সামনে রেখে যারা গ্রামে গেছেন, তাদের অনেকের বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদি রয়েছেন। শহর থেকে গ্রামে ফেরা যুবক ও তরুণ আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে তারা করোনায় আক্রান্ত হলে মৃতু্য ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়বে। এছাড়া গ্রামে করোনা নমুনা পরীক্ষা ও গুরুতর অসুস্থ রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় তাদের জেলা শহরে ছুটতে হবে। অথচ সেখানেও চিকিৎসা সেবার ততটা সুযোগ নেই। ফলে গ্রামাঞ্চলে আক্রান্ত রোগীদের ভয়াবহ বিপাকে পড়তে হবে।

অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের সংক্রমণের এ প্রভাব শহরেও পড়বে। বিপুল সংখ্যক রোগীকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দিতে হবে। অথচ এ ধরনের ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হলে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে

\হগুরুতর রোগীর ঠাঁই দেওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। ভারতের মতো চিকিৎসার অভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষ মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশের করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে করোনার প্রকোপ কিছুটা কমলেও তা এখনো ৮ শতাংশের উপরে রয়েছে। এ হার ৫ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত করোনা নিয়ন্ত্রণে এসেছে তা বলার সুযোগ নেই। এর উপর দেশে এরইমধ্যে ভারতীয় ভেরিয়্যান্ট ঢুকে পড়েছে। যা সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশ আগেই ভারতের সঙ্গে আকাশপথ ও স্থলপথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হলেও সীমান্তের বিভিন্ন চোরপথে চোরাকারবারিরা আসা-যাওয়া করছে। এতে দেশের সীমান্ত এলাকার গ্রামগুলোতে ভারতীয় ভেরিয়্যান্ট ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহর থেকে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে মানুষ যেভাবে ছুটছে, তাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এ সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকারের ঈদযাত্রা নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক মহামারি নিয়ে ছোট-বড় সব দেশ বিভিন্ন পরিকল্পনা নিলেও বাংলাদেশে শুরু থেকেই সমন্বয়হীনতা ছিল। যা এবারের ঈদযাত্রার শুরু থেকেই প্রকট আকার ধারণ করেছে। দূরপালস্নার গণপরিবহণ বন্ধ রেখে জেলার অভ্যন্তরীণ রুটের বাস চালু করার পর ঈদযাত্রায় ভয়াবহ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যা শেষ পর্যন্ত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ফলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবাইকে নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করে ঈদ পালনের নির্দেশনা দেওয়া হলেও বাস্তবে উল্টো ঘটনা ঘটেছে। যে চিত্র গত কয়েকদিনের ফেরিঘাটের চিত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বেগতিক এ পরিস্থিতিতে সরকারও নিয়ন্ত্রণের হাল ছেড়ে দিয়েছে। যা গোটা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সরকারের অদূরদর্শিতা ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবকে এ জন্য দায়ী করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে বারবারই সুযোগ এসেছে করোনা পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার। এমনকি গত দুই মাস ধরে যেভাবে বিধি-নিষেধের কড়াকড়ি ও সর্বাত্মক লকডাউন দেওয়া হয়েছে তাতেও অর্থনীতির চাকা সচল রাখার পাশাপাশি করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণের বড় আশা দেখা গিয়েছে। কিন্তু ঈদযাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতায় এ সফলতা পুরোপুরি ভেস্তে যেতে বসেছে। এ ব্যাপারে সরকার এভাবে ব্যর্থ না হলে করোনা সংক্রমণ ঈদের পর অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসত বলে মনে করেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, শহর থেকে গ্রামে ফেরা একজন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি কতজনের মধ্যে ছড়াবেন তা অনুমানই করা যাবে না। আবার যারা সুস্থ অবস্থায় শহর থেকে যাবেন, তারাও আসার সময় ভাইরাসটি বহন করে নিয়ে আসতে পারেন।

রোগতত্ত্ববিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন যায়যায়দিনকে বলেন, এখনো সংক্রমণ কিছুটা নিম্নমুখী হলেও নিয়ন্ত্রিত নয়। এ অবস্থায় মার্কেট-শপিংমল খুলে দেওয়া এবং জেলা অভ্যন্তরীণ গণপরিবহণ চালু করা ঠিক হয়নি। এর উপর মানুষ গাদাগাদি করে সিটি সার্ভিসের বাসে দূরের পথে যাতায়াত করলেও তা মনিটর করা হচ্ছে না। তা নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। গণপরিবহণে স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। অধিকাংশ যাত্রীই মুখে মাস্ক ছাড়াই চলাচল করছে। ফলে যাত্রাপথ থেকেই রোগের সংক্রমণ হতে পারে। অর্থনৈতিক কারণে অনেক কিছুই খুলে দিতে হলেও ঈদযাত্রার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে রাখলে ভালো হতো। তিনি বলেন, 'এ পরিস্থিতিতে যদি আবার গ্রাম থেকে শহরে এবং শহর থেকে গ্রামে রোগটি ছড়ায়, তাহলে সেটি মোকাবিলা করা আমাদের জন্য খুব কঠিন হবে।'

ঈদযাত্রার হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. লেলিন চৌধুরী যায়যায়দিনকে বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বেশ কয়েকটি বড় শহর করোনার হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত। অথচ এসব শহর থেকেই বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রামে ফিরছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই গ্রামাঞ্চলে এ মরণব্যাধি ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া দেশে এরইমধ্যে ভারতীয় ভেরিয়্যান্ট ঢুকে পড়েছে। ফলে যে কোনো সময় তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দেশের হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট দেখা দেবে। এতে মৃতু্যর হার উদ্বেগজনক হারে বাড়তে পারে। এ ব্যাপারে সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনা তৈরির পাশাপাশি জনগণকে আরও অনেক বেশি সচেতন হওয়া জরুরি ছিল বলে মনে করেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী আরও বলেন, এবারের ঈদে সবকিছু খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এটাই প্রমাণ করে, আমরা এই মহামারি মোকাবিলার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে গিয়েছি। এই সিদ্ধান্ত আমাদের আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে সব কিছু খুলে দেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধির যেসব নির্দেশনা দিয়েছে সেগুলো ঠিকমতো মনিটরিং না করার অর্থ দাঁড়ায় করোনা নিয়ে বেশি কিছু ভাববার নেই। আর হয়তো এ কারণে মাস্ক না পরেই গাদাগাদি করে মানুষ গণপরিবহণ, ফেরি ও অন্যান্য যানবাহনে চড়ছে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে, সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে মানুষ মার্কেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

রোগতত্ত্ববিদ ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, 'এবারের ঈদযাত্রা অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। প্রশাসনের কোনো মনিটর না থাকায় এখন পুরোটাই মানুষের নিজের সচেতনতার ওপর নির্ভর করছে। জনগণের মধ্যে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা কাজ করছে।'

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম আরও বলেন, 'রাস্তাঘাটে জনসমাগম ও মানুষের চলাচল যেভাবে বেড়েছে, তাতে আমরা শঙ্কিত। যে মানুষগুলো বাড়ি ফিরছে, তারা যখন ঢাকায় ফিরবে তখন করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।' মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৩টায় জরুরি ভার্চুয়াল প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তৃতাকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এসব কথা বলেন।

ডা. খুরশীদ আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী কয়েকদিন আগেও বলেছেন, বাড়িতে থাকুন, বাড়ি থেকে আপনারা ঈদ করুন। যে যেখানে আছেন, সেখানে থাকুন। জায়গা বদল করবেন না। প্রধানমন্ত্রীর উদাত্ত আহ্বান যদি আমরা না মেনে চলি, তাহলে আমাদের রক্ষা করবে কে? আপনারা দয়া করে, বিনীত অনুরোধ করছি, আপনাদের এই যে চলাচল, জনসমাগম বন্ধ না হলে করোনার সংক্রমণ শেষ হবে না। তাই নিজে সচেতন হোন ও অন্যকেও সচেতন করুন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে