রাতের ঢাকায় ফার্মেসি বিড়ম্বনা!

মগবাজার, মৌচাক, শান্তিনগর ও শাহবাগ ঘুরে দেখা গেছে, রাত ১১টার পর ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে ওষুধের দোকান। গলির ভেতরের দোকানগুলো আগেই বন্ধ হতে থাকে
রাতের ঢাকায় ফার্মেসি বিড়ম্বনা!

রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা রাকিব রসুলের স্ত্রী স্ট্রোকের রোগী। ওষুধ শেষ হয়ে যাওয়ায় এলাকার বাইরে রাতে ওষুধ কিনতে বের হয়ে তিনি মহামসিবতে পড়েছিলেন বলে জানান। তিনি বলেন, 'আমাদের এখানে ওষুধের দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামনের একটি মেডিকেলের ফার্মেসিতে গিয়ে দেখি আমার কাঙ্ক্ষিত ওষুধ নেই। এরপর মগবাজার চৌরাস্তা, শান্তিনগর, শাহবাগ ঘুরে ওষুধ পেয়েছি কলাবাগান গিয়ে। ঢাকায় রাতে ওষুধ কিনতে গিয়ে ফার্মেসি বিড়ম্বনায় পড়ে আমিও কিছুটা অবাক হয়েছিলাম।'

মিরপুরের টোলার বাগের বাসিন্দা সোহান জানান, 'রাতে গলির ভেতরের ফার্মেসি বন্ধ হয়ে গেলে সমস্যায় পড়তে হয়। মিরপুর এক নাম্বার বা দুই নাম্বার কিংবা ডেলটা হাসপাতালের ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধ আনতে হয়। মাঝে মধ্যে হাসপাতালের ফার্মেসিতে নির্দিষ্ট ওষুধ পাওয়া যায় না। এতে আরও বেশি ঝামেলা পোহাতে হয়।'

সম্প্রতি এক রোগী তার চিকিৎসকের প্রেসক্রাইব করা ওষুধ 'ফ্লুক্লক্স' কিনতে বের হন রাত ১২টার পর। মগবাজার নয়টোলার বেশির ভাগ ফার্মেসি বন্ধ থাকায় তাকে মেইনরোড পর্যন্ত যেতে হয়েছে। কয়েকটি ফার্মেসি ঘুরেও সেই ওষুধ পাওয়া যায়নি। এমনকি কয়েকটি হাসপাতালের ফার্মেসিতেও সেই ওষুধ পাননি। পরে রামপুরা, শান্তিনগর, শাহবাগ ঘুরে কলাবাগানে গিয়ে তিনি কাঙ্ক্ষিত ওষুধ কেনেন। এতে চলে গেছে দুই ঘণ্টা। প্রায়ই এ অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছেন মেগা সিটি ঢাকার বাসিন্দারা।

রাজধানীর মগবাজার, মৌচাক, শান্তিনগর ও শাহবাগ ঘুরে দেখা গেছে, রাত ১১টার পর ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে ওষুধের দোকান। গলির ভেতরের দোকানগুলো আগেই বন্ধ হতে থাকে। যেহেতু এসব ওষুধের দোকান এলাকা কেন্দ্রিক-তাই আগে বন্ধ হয়। মেইন রোডের ওপরের দোকানগুলো ১২টার পর বন্ধ হওয়া শুরু হয়। কিছু কিছু দোকান রাত ২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে বেশির ভাগ দোকান রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি শাহবাগের ওষুধের দোকানও রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। কয়েকটি দোকান খোলা থাকে তবে সব ধরনের ওষুধ সেখানে পাওয়া যায় না।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায় বস্নক বা এলাকা ভিত্তিক কয়েকটি ওষুধের দোকান বাধ্যতামূলক খোলা রাখতে হয়। যদি বাংলাদেশে ওষুধের দোকানের ক্ষেত্রে এমন কোনো নিয়ম আছে কি-না তা কেউ জানে না। তবে রাতে বিভিন্ন এলাকার সব ওষুধের দোকান বন্ধ হওয়ার কারণে নগরবাসী যে বিপাকে পড়েন, তা নিশ্চিত হওয়া গেছে কিছু ঘটনা দিয়ে। এমনকি হাসপাতালের নিজস্ব ফার্মেসি খোলা থাকলেও সেখানে অনেক ক্ষেত্রে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ওষুধ। হাসপাতালের নিজস্ব ফার্মেসিতে শুধু সেই হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রেসক্রাইব করা নির্দিষ্ট ওষুধের বাইরের কোনো ওষুধ পাওয়া যায় না। এমন বেশকিছু অভিযোগ রয়েছে রোগীদের। বলা হয় ঢাকা মেগাসিটি কিন্তু এই মেগাসিটিতেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রতিষ্ঠান ফার্মেসি বন্ধ থাকে রাতের বেলায়!

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়ম অনুযায়ী রাজধানীর একটি ফার্মেসিও পরিচালিত হয় না। ফার্মেসিগুলো নিজেদের সুবিধামতো ওষুধ রাখে। অনেক সময় চিকিৎসকের প্রেসক্রাইব করা ওষুধও পাওয়া যায় না। এতে রোগীরা যে কি পরিমাণ দুর্ভোগে পড়ে তার কোনো ধারণাই নেই সংশ্লিষ্টদের।

মিরপুর, মিরপুর-১০, ১১, ১২ এলাকায় রাতে ঘুরে দেখা গেছে, ওষুধের দোকান বেশির ভাগই ১১টার পর বন্ধ হয়ে গেছে। মিরপুর ২ ও ১০ নাম্বারে কয়েকটি হাসপাতাল থাকায় এখানে মেইন রোডের পাশের কয়েকটি দোকান খোলা ছিল। আর হাসপাতালের নিচে যেসব দোকান থাকে সেগুলোতে ওই হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রেসক্রাইব করা ওষুধের বাইরে কোনো ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে রোগীদের। তবে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় কিছু নাম করা ফার্মেসি তাদের সেবা ২৪ ঘণ্টা দিয়ে থাকে।

দিলু রোডের ব্যারিস্টার ড্রাগের স্বত্বাধিকারী মিন্টু মিয়া জানান, লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে ওষুধ বিক্রির জন্য। আমরা সেটাই করি। সরকার অনুমোদিত ওষুধ আমরা রাখি ও বিক্রি করি। করোনার মধ্যে গভীর রাত পর্যন্ত খোলা রাখা হতো কিন্তু এখন আর তা করি না। আর সারা রাত খোলা রাখার কোনো প্রয়োজনও পড়ে না। যেহেতু এখানে একটা হাসপাতাল আছে। কিছুটা দুরে আরও কয়েকটি আছে তাই এতটা জরুরি না।

একই এলাকার জাহানার ফার্মেসিরকর্মী কাওসার হোসেন জানান, আমাদের এখানে কাস্টমার খুব ভালো। বিশেষ করে রাতে কাস্টমারের চাপ বেশি থাকে। এলাকার ভেতরে হওয়ায় অনেকেই অফিস থেকে ফিরে একটু দেরি করে ওষুধ কিনতে বের হয়। তারপরও রাত একটার আগেই আমাদের দোকান বন্ধ করে ফেলি। গভীর রাতে ওষুধের জন্য কেউ আসে না।

মগবাজার চৌরাস্তা মোড়ে লাজ ফার্মার এক কর্মী জানান, মূলত সন্ধ্যা থেকে ১১টা পর্যন্ত ওষুদের জন্য লোকজন আসেন। তারপর খুবই কম আসেন। আর ১২টার পর ওষুধ নিতে কেউ আসে না বললেই চলে। তারপরও আমরা রাত ১২টা পর্যন্ত খোলা রাখি। যদি কেউ আসে তাহলে আমরা ওষুধ সরবরাহ করি।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীসহ দেশের সব ফার্মেসিকে আমাদের কাছ থেকে ড্রাগ লাইসেন্স নিতে হয়। ঢাকার বাইরে দোকানিরা উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে এবং রাজধানীর ভেতরের সবাই সরাসরি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছ থেকে লাইসেন্স নিবে। দুই বছর পরপর লাইসেন্স রিনিউ করতে হবে। সেজন্য আবার তাকে আবেদন করতে হয়। সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স করে তারপর আমাদের এখান আবেদন করতে হবে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আইয়ুব হোসেন বলেন, প্রতিটি ফার্মেসি রোগীদের ওষুধ দিতে বাধ্য। এই ওষুধ সরবরাহের ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রেসক্রিপশন থাকতে হবে। তা না হলে ফার্মেসি ওষুধ বিক্রি করতে পারবে না। আমাদের সরাসরি আইন আছে এর ব্যত্যয় ঘটলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। রেজিস্ট্রেশন নিতে হলে অবশ্যই ফার্মেসি থাকতে হবে। ফার্মেসি না থাকলে তো ড্রাগ লাইসেন্স দেওয়া হয় না। মডেল ফার্মেসিতে গেলে তাই দেখতে পারবেন। আমরা সবাইকে দেখানো জন্য মডেল ফার্মেসি করে দিয়েছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো ফার্মেসি ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার কথা বলা নেই। গভীর রাতে লোকজন না থাকলে ফার্মেসি বন্ধ করে দেবে এটাই স্বাভাবিক। এমন কোনো নির্দেশনাও নেই। তবে রাজধানীর হাসপাতালের সামনে সারারাত ফার্মেসি খোলা থাকে। গলির ভেতরে ওষুধ না পেলেও হাসপাতালের সামনে ওষুধ পাওয়া যায়।

হাসপাতালগুলো তাদের চিকিৎসকের প্রেসক্রাইব করা ওষুধ ছাড়া অন্য ওষধু রাখে না, এটা কি ঠিক? এমন প্রশ্নের উত্তরে আইয়ুব হোসেন বলেন, কোন ফার্মেসি কি ওষুধ রাখবে তা আমরা নির্ধারিত করতে পারব না। তবে এটুকু নিশ্চিত করতে পারব যেগুলোর বিক্রির অনুমোদন নেই সেগুলো রাখতে পারবে না। হাসপাতালের নিজস্ব ফার্মেসিগুলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্বারা পরিচালিত। তাই তারা নিজেদের চিকিৎসকের ওষুধগুলোই রাখে। এতে আমাদের কিছু বলার নেই।

\হ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে