রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯

আতঙ্ক ছড়াচ্ছে কিশোর গ্যাং

সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও মতিঝিলসহ বস্তিকেন্দ্রিক এলাকায় ম মাদকাসক্ত হওয়ায় গ্যাং সদস্যরা চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, ইভটিজিং ও খুনের মতো অপরাধ করছে
গাফফার খান চৌধুরী
  ০২ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
কিশোর গ্যাং হালের মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আতঙ্কের দিক থেকে তারা শীর্ষ সন্ত্রাসীদেরও ছাড়িয়ে গেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা যাদের কাছে চাঁদা দাবি করে বা হুমকি দেয়, তারাই শুধু ভয়ে থাকেন। কিশোর গ্যাংয়ের ক্ষেত্রে চিত্রটি একেবারেই উল্টো। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ কিশোর গ্যাংকে ভয় করছেন। হালের কিশোর গ্যাং কালচার রীতিমতো সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। গ্যাংয়ের প্রায় শতভাগ সদস্যই ইয়াবা, হেরোইন ও ড্যান্ডির মতো মাদকে আসক্ত। মাদকের টাকা জোগাড় করতে তারা চুরি, ছিনতাই এমনকি খুনের মতো অপরাধ করছে। মাদকাসক্ত হয়ে তারা ইভটিজিংয়ের পাশাপাশি পাড়া-মহলস্নায় উচ্চ শব্দে হর্ন বাজিয়ে মোটর সাইকেল মহড়া দিচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে মোটর সাইকেল চাপায় এক নারীর মৃতু্য হয়। প্রথম দিকে ঘটনাটি সড়ক দুর্ঘটনা বলে প্রচার করা হয়। পরে নিহতের মেয়ে থানায় করা অভিযোগে বলেন, তাকে উত্ত্যক্ত করত স্থানীয় বখাটেরা। প্রতিবাদ করায় তার মাকে মোটর সাইকেলে চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ সাতজনকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তে বেরিয়ে আসে অভিযোগের সত্যতা এবং ঢাকায় কিশোর গ্যাং কালচারে চাঞ্চল্যকর তথ্য। গ্রেপ্তাররা স্বীকার করে, তারা পরিকল্পিতভাবে ওই নারীকে মোটর সাইকেল চাপা দিয়ে হত্যা করেছে। ঘটনাটি দুর্ঘটনা বলে প্রচার করে। তারা গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হয়। এরপর ২০১৫-২০১৯ সাল পর্যন্ত ঢাকায় ও আশপাশের এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্র ধরে ১৩ কিশোর সদস্য খুন হয়। জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি আর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে ২০১৯ সালে কিশোর গ্যাং কালচার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। করোনাভাইরাসের মহামারি চলার সময়ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের তেমন কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি। মহামারির পর নতুন করে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা চুরি, ছিনতাই, মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের সূত্র ধরে খুনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ঢাকায় ছোট বড় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা প্রায় ৩০০ আর সারাদেশে এর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৭০০। পুলিশের নথিপত্র মোতাবেক, ঢাকার প্রতিটি থানা এলাকায় কমপক্ষে গড়ে অন্তত পাঁচটি করে কিশোর গ্যাং রয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায়। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কমলাপুরের টিটি পাড়া বস্তি, মতিঝিলের এজিবি কলোনি এবং শেরেবাংলা নগর বিএনপি বস্তিতে। ঢাকায় সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে বস্তি এলাকায়। মোটামুটি ধনাঢ্য এলাকার মধ্যে উত্তরায় কিশোর গ্যাং কালচারের প্রবণতা বেশি। যার অধিকাংশই গড়ে উঠেছে মাদককে কেন্দ্র করে। তাদের অধিকাংশই ধনাঢ্য পরিবারের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা ছাত্র। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, স্থানীয় প্রভাবশালীদের মদদ আর সরাসরি তত্ত্বাবধায়নে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, এলাকায় প্রভাব বিস্তার, চাঁদা বা অন্য কোনো কারণে হুমকি দেওয়া, কাউকে গুলি করে ভয় দেখানোসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করার সঙ্গে জড়িত কিশোর গ্যাং সদস্যরা। ধনাঢ্য পরিবারের যেসব সন্তান কিশোর গ্যাংয়ে জড়িত, তাদের কাছে পিস্তল ও রিভলভারের মতো আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এ ছাড়া গ্যাংয়ের সব সদস্যের কাছে অত্যাধুনিক সুইচ গিয়ার চাকু থাকে। এসব চাকু সহজেই বহনযোগ্য। যা দেখে বোঝার উপায় নেই। পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুলস্নাহ আল মামুন ওর্ যাব মহাপরিচালক পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এম খুরশীদ হোসেন সারাদেশে থাকা কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধে জড়িত সদস্যদের গ্রেপ্তারে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশোধনাগার থেকে বের হওয়া কিশোরদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে কিশোর গ্যাং সদস্যদের দৌরাত্ম্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ওই সময়র্ যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফ থেকে কিশোর গ্যাং সদস্যদের অপরাধের সময় হাতেনাতে ধরা হয়।র্ যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অনেক গ্যাংয়ের সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়। সাজাপ্রাপ্ত কিশোর গ্যাং সদস্যদের গাজীপুর ও টঙ্গীতে থাকা কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে অনেকে জামিনে বেরিয়েছে। অনেকে এখনো সেখানে রয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সবশেষ গত ৫ জুলাই ঢাকার আশুলিয়ায় পলাশবাড়িতে মাদক ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে গোচারটেক ভাইবেরাদার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য লিখন হত্যার ঘটনা ঘটে। হত্যাকান্ডে জড়িত ওই এলাকার কাইচ্চাবারি কিশোর গ্যাংয়ের পাঁচ সদস্য গ্রেপ্তার হয়। র্ যাব-৪ এর সাবেক অধিনায়ক বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশে কর্মরত পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোজাম্মেল হক যায়যায়দিনকে বলেন, কিশোর গ্যাং কালচারে জড়িতদের ৯০ ভাগেরও বেশি সমাজের নিম্নআয়ের মানুষের সন্তান। পারিবারিক অশান্তি, পিতা-মাতার মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ, অনাদর-অবহেলায় বেড়ে ওঠা, উপযুক্ত পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পাওয়া ও উপার্জনের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকার কারণে কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে। গ্যাং সদস্যদের প্রায় শতভাগই মাদকাসক্ত, মাদকের টাকা জোগাড় করতে তারা চুরি, ছিনতাই ও খুনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। প্রতিটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ১০-১৫ জন। পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া বিভাগের সহকারী মহাপরিদর্শক মো. মনজুর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে পুলিশের সব ইউনিটকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান। একই সঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। র্ যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলছেন, কিশোর গ্যাং সম্পর্কে তাদের গোয়েন্দারা গভীর নজরদারি করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তারে অভিযানও চলমান রয়েছে। সমাজ থেকে কিশোর গ্যাং কালচার নির্মূল করতে তারা অভিযান ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। বিশিষ্ট অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ডক্টর জিয়া রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, কিশোর গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার জন্য প্রথমত দায়ী পারিবারিক ও সামাজিক অসচেতনতা। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় না হওয়ার কারণে সন্তানরা হতাশায় ভোগে। হতাশা থেকে মুক্তি পেতে তারা মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করে। এসব সন্তানরা ছন্নছাড়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেক সন্তান অর্থাভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। এটিও কিশোর গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণের মধ্যে একটি। এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মাদকের টাকা জোগাড় করতে এক সময় ছিনতাই, মাদক বিক্রিসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। নেশা করে পাড়া-মহলস্নার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে বসে তরুণী ও কিশোরীদের ইভটিজিং করে। পাড়া-মহলস্নায় নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে একসঙ্গে অনেক কিশোর জোটবদ্ধ হয়। অধিকাংশ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাই উচ্চ শব্দে মোটর সাইকেল চালিয়ে এলাকা দাপিয়ে বেড়াতে পছন্দ করে। নিজেদের ক্ষমতা প্রমাণ করতে তারা এসব করে। জিয়া রহমানের মতে, কিশোর গ্যাং কালচার থেকে মুক্তি পেতে প্রথমে পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। সন্তানরা কোথায়, কার সঙ্গে মিশছে, তা জানতে হবে। পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে হবে। এ ছাড়া সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িত গ্যাং সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের সংশোধন করতে হবে। পাশাপাশি দেশ থেকে মাদক নির্মূল করতে হবে। মাদক কিশোর গ্যাং কালচার গড়ে ওঠা এবং তা টিকে থাকার নেপথ্য শক্তি হিসেবে কাজ করে। বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আব্দুর রশীদ যায়যায়দিনকে বলেন, কিশোর গ্যাং পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য রীতিমতো হুমকি। কারণ, এক সময় কিশোর অপরাধীরাই বড় বড় অপরাধী হয়ে উঠতে পারে। জড়িয়ে পড়তে পারে মারাত্মক সব অপরাধ কর্মকান্ডে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের দুর্ধর্ষ আত্মঘাতী জঙ্গি হয়ে বড় ধরনের নাশকতা চালানোও বিচিত্র নয়। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। এতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা কমে আসবে।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে