বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯
walton1
ডেটলাইন ১০ ডিসেম্বর

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে ঢাকা!

৭ ডিসেম্বর থেকে ঢাকাগামী বাসের সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিলে ওইদিন থেকেই রাস্তায় গাড়ি নামানো পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে
সাখাওয়াত হোসেন
  ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০
আগামী ১০ ডিসেম্বর বিএনপির মহাসমাবেশে যোগ দিতে সারা দেশ থেকে লাখ লাখ নেতাকর্মী ঢাকায় আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এই সমাবেশকে ঘিরে রাজধানীতে পাল্টা কর্মসূচিসহ সতর্ক পাহারা বসানোর পরিকল্পনা করছে। এতে পরিস্থিতি বেগতিক হয়ে উঠতে পারে- এ আশঙ্কায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো রাজধানীতে বহিরাগতদের অপ্রয়োজনীয় প্রবেশ বন্ধে একগুচ্ছ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাজধানীতে প্রবেশের আটটি পথেই অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসানোর ছক তৈরি করা হয়েছে। বাহিনীর সূত্রগুলো বলেছে, বিশেষ কোনো দুরভিসন্ধিতে রাজধানীতে বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকাতে প্রয়োজনে সারা দেশের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হতে পারে। এদিকে গণপরিবহণের মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেও ১০ ডিসেম্বর এবং এর এক-দুই দিন আগে ও পরে বাসসহ সব ধরনের গণপরিবহণ চলাচল বন্ধ থাকার আভাস পাওয়া গেছে। ঢাকা-যশোর রুটে চলাচলকারী বেসরকারি একটি বাস সংস্থার মালিক বলেন, ৭ ডিসেম্বর থেকে ঢাকাগামী বাসের সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিলে ওইদিন থেকেই রাস্তায় গাড়ি নামানো পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে পরিবহণ মালিক সমিতি থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না- তা জানা নেই দাবি করে, ওই বাস মালিক বলেন, বিএনপি যেসব জেলায় সমাবেশ করেছে, সেখানেই পরিবহণ ধর্মঘট হয়েছে। যদিও ঢাকায় মহাসমাবেশের আগে একই সিদ্ধান্ত হয়তো না-ও নেওয়া হতে পারে। তবে ১০ ডিসেম্বর ঢাকার পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা আগেভাগে আন্দাজ করা মুশকিল। একই দিন রাজধানীতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি রয়েছে। দুইপক্ষই রাজপথ দখলে রাখার হুমকি দিচ্ছে। এতে সড়ক-মহাসড়কে নৈরাজ্য সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। তাই তিনি কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চান না। বেশিরভাগ পরিবহণ মালিকই এমনটি ভাবছেন বলে দাবি করেন তিনি। ঢাকা-বরিশাল রুটের একাধিক পরিবহণ শ্রমিকের কাছ থেকেও একই ধরনের আভাস পাওয়া গেছে। তারা জানান, বেশিরভাগ মালিকই ১০ ডিসেম্বর এবং এর আগে-পরের এক-দুই দিন রাস্তায় গাড়ি নামাতে ভয় পাচ্ছেন। তারা সবাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে কোনো ধরনের গ্যাঞ্জাম হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়া মাত্রই গাড়ি চালানো বন্ধ করে দিতে মালিকরা আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছেন। সেইসঙ্গে যেকোনো রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ঢাকায় নিয়ে যেতে রিজার্ভ বাস ভাড়া না দেওয়ার জন্যও তারা নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান শ্রমিকরা। এদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে রাজপথে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। প্রতিদিন যেখানে আট হাজারের মতো পুলিশ সদস্য ঢাকার রাস্তায় দায়িত্ব পালন করেন, সেখানে ১০ ডিসেম্বর তার কয়েকগুণ বেশি পুলিশ মোতায়েন থাকবে। ডিএমপির মোট ৩৫ হাজার পুলিশ সদস্যের বেশিরভাগ সদস্যকেই মোতায়েনের কথা ভাবা হচ্ছে। ডিএমপির একজন উপ-কমিশনার বলেন, 'ওইদিন আমরা কঠোর অবস্থানে থাকব। কেউ কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলেই তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হবে। কে কোন দলের নেতাকর্মী তা বিবেচনায় নেওয়া হবে না, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কিছু কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলেছে, বিএনপির নেতাকর্মীরা ওইদিন যেন কোনো রকম হামলা চালাতে না পারে সে জন্য আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকবেন। এ ব্যাপারে এরই মধ্যে তারা নানা পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি শুরু করেছেন। ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ রাজধানীর অন্যতম বড় প্রবেশমুখ সাভারে ১০ ডিসেম্বর সমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ ওই দিন রাজধানীতে দু'টি সমাবেশ করতে দলের অনুমতি চেয়েছে। এছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারা নিজেদের মতো করে আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। যাতে হাইকমান্ডের নির্দেশনা পাওয়ামাত্র তারা তাৎক্ষণিক সাড়া দিতে পারে। পুলিশের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার আটটি প্রবেশপথ পোস্তগোলা সেতু, সদরঘাট, আব্দুলস্নাহপুর সেতু, আশুলিয়ার ধাউর সেতু, বাবুবাজার সেতু, গাবতলী, যাত্রাবাড়ী ও ডেমরায় সুলতানা কামাল সেতুতে অতিরিক্ত তলস্নাশি চৌকি থাকবে। ডিএমপির উপ-কমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীতে প্রবেশ করা সব যানবাহনকে নিরাপত্তা তলস্নাশির ভেতর দিয়ে যেতে হবে, যাতে নাশকতা করা যায় এমন কিছু নিয়ে যেন কেউ প্রবেশ করতে না পারে। পাশাপাশি ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ শুরুর দিন থেকে রাজধানীর হোটেলগুলোতে অবস্থানকারী অতিথিদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিদিন তা গোয়েন্দাদের সরবরাহ করার আগাম নির্দেশ দেওয়া হবে। এছাড়াও কেউ যেন অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক বহন করতে না পারে সে লক্ষ্যে ঢাকার সবক'টি বাস টার্মিনাল, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ও কমলাপুর রেল স্টেশনে আইন প্রয়োগকারীরা নজরদারি বৃদ্ধি করবে। নজরদারি বাড়াতে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল ও রেল স্টেশনে যেসব সিসিটিভি রয়েছে এগুলো সচল আছে কি না- তা পরীক্ষা করে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে খুলনা, রংপুর, বরিশাল ও ফরিদপুরসহ বিএনপির প্রায় প্রতিটি বিভাগীয় গণসমাবেশের আগের দিন থেকে নানা অজুহাত দেখিয়ে পরিবহণ ধর্মঘট ডাকলেও নেতাকর্মীরা বিকল্প যানবাহনে চেপে, এমনকি হেঁটে এতে যোগ দিয়েছে। নদীপথে লঞ্চ বন্ধ থাকলে ট্রলার, স্পিডবোড, নৌকায় চড়ে হাজার হাজার মানুষ সমাবেশে এসেছেন। তাই এবার পুরনো কৌশলে কিছুটা পরিবর্তন আনা হতে পারে। জনসমাবেশে যোগ দিতে সড়ক পথে বাস-মিনিবাসের বিকল্প যান হিসেবে ব্যবহার হওয়া মাইক্রোবাস নছিমন, করিমন, মাহিন্দ্র, ইজিবাইক মালিক শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১০ ডিসেম্বরের এক-দুই দিন আগে তাদের চলাচলের ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ হতে পারে। হাইওয়ে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আলাপচারিতায়ও একই ধরনের আভাস পাওয়া গেছে। ওই কর্মকর্তা জানান, হাইওয়েতে ত্রি-চক্র যান চলাচল নিষেধ। এ ব্যাপারে হাইকোর্টেরও আদেশ রয়েছে। নানা কারণে উচ্চ আদালতের এ নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। এ কারণে মহাসড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে। তাই এবার জোরেশোরে 'ড্রাইভ' দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে মহাসড়কে চলাচলকারী বেশকিছু থ্রি-হুইলার আটক করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দাবি যে অমূলক নয়, তা বিভিন্ন জেলা-উপজেলার জনপ্রতিনিধি ও আমাদের সংবাদদাতাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। গত ১৭ নভেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিলস্নার দাউদকান্দি অংশে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ব্যাটারিচালিত ৫০টি সিএনজি অটোরিকশা ও থ্রি-হুইলার আটক করে দাউদকান্দি হাইওয়ে থানা পুলিশ। এদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দির বিশ্বরোড, হাসানপুর, শহীদনগর, গৌরীপুর মোড়, আমিরাবাদ ও জিংলাতলী এলাকায় হাইওয়ে থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে এসব যান আটক করে। এর আগের দিন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে থ্রি হুইলার চলাচল বন্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে শায়েস্তাগঞ্জ হাইওয়ে থানা পুলিশ। গত ২২ নভেম্বর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধে বিশেষ অভিযান চালানো হয়। সরাইল বিশ্বরোড থেকে শুরু করে আশুগঞ্জ, বিজয়নগর সাতবর্গ পর্যন্ত মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এই অভিযান পরিচালনা করে হাইওয়ে পুলিশ। অন্যান্য জেলাগুলোতে এ ধরনের অব্যাহত থাকার খবর পাওয়া গেছে। এদিকে, ডিসেম্বরের শুরুতে রেন্ট-এ-কারের মাইক্রোবাস চলাচলের ব্যাপারেও কড়াকড়ি আরোপের খবরও বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া গেছে। ট্রাফিক পুলিশের একজন সার্জেন্ট এ ব্যাপারে বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ি কিনে তা ভাড়ায় চালানোর কোনো বৈধতা নেই। তবুও দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে রেন্ট-এ-কারের ব্যবসা চলছে। ডিসেম্বরের শুরু থেকেই এ লাগাম টানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে