বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১

চার বিভাগে তাপপ্রবাহ হিট অ্যালার্ট জারি

বিশেষ প্রতিনিধি
  ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ০০:০০

রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ওপর দিয়ে বইছে তীব্র তাপপ্রবাহ। আগামী ৭২ ঘণ্টায় এ তাপপ্রবাহের মাত্রা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ কারণে রাজধানীসহ এসব অঞ্চলে হিট অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। চলতি মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ছয়টির মতো তাপপ্রবাহের শঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হতে পারে অতিতীব্র এতে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে।

চৈত্রের মধ্য আকাশেও মেঘ নেই। আছে সূর্যের চোখ রাঙানি। প্রখর রোদকে সঙ্গী করে সকাল শুরু হচ্ছে। ভরদুপুরে তেতে উঠছে সূর্য। শেষ বিকালেও রোদের তেজ কমছে না। মাঠে-ঘাটে ঠা-ঠা রোদ। মধ্য চৈত্র বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছে তার কেমন ঝাঁঝ। সূর্য ডোবার পরও শীতল হচ্ছে না পরিবেশ। প্রতিদিনই বাড়ছে তাপমাত্রা। রাজশাহী অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এটি আরও কয়েক দিন থাকার আশঙ্কা করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। রাজধানীর তাপমাত্রাও ৩৮ ডিগ্রিতে পৌঁছে গেছে। চৈত্রের নির্দয় খরতাপে পুড়ছে মাঠের ফসল। রমজানে গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন।

রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগ এবং দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলার ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, তা আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে এবং বিস্তার লাভ করতে পারে। মঙ্গলবার ঈশ্বরদী ও মংলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক নয় ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত মৃদু ও ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক নয় ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বিবেচনা করা হয়।

আবহাওয়াবিদ

মো. বজলুর রশিদ বলেন, বুধবার বিকেল তিনটা পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ঈশ্বরদীতে ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া চলমান তাপপ্রবাহ পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। এছাড়া এর মাত্রা আরও বাড়তে পারে। এ জন্য হিট অ্যালার্ট দেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী গরমের দাপট আরো বাড়বে। নিয়মিত কালবৈশাখী ও বৃষ্টিপাত শুরু না হওয়া পর্যন্ত তাপমাত্রা কমবে না। এ বছরের আবহাওয়া বৈরী আচরণ করছে। মরুর দেশের মতো গরম অনুভূত হচ্ছে। ইতোমধ্যেই দেশের অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। তপ্ত রোদে খাঁ-খাঁ করছে ফসলের মাঠ। তাপপ্রবাহের কারণে গণপরিবহণে মানুষের চলাচলে কষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ তীব্র রোদে কাজ করতে হাঁপিয়ে উঠছেন। প্রচন্ড গরমে অতিষ্ঠ মানুষ। দিনের পর দিন বেড়েই চলছে তাপমাত্রা। গরমে ফসল ও জনজীবন বিপর্যস্ত।

বুধবার দেশের সব্বোর্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ঈশ্বরদীতে ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় দুপুরে যার মাত্রা ছিল ৩৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কক্সবাজার ও টেকনাফে ৩০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সেন্টমার্টিনে ৩২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সিলেটে ২৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, চট্রগ্রামে ৩০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সনদ্বীপ ও শীতাকুন্ডে ৩১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, টাঙ্গাইলে তাপত্রা ছিল ৩০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, নেত্রকোনায় ২৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ময়মনসিংহে ২৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, দিনাজপুরে ৩০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, মংলায় ২৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যশোরে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বরিশাল ২৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২৯ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আবহাওয়াবিদ আব্দুর রশিদ বলেন, রাজধানীর বেশির ভাগ স্থানে সূর্যের আলো এসে জমা হচ্ছে। দিনের শেষে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে রাতেও তাপমাত্রা কমছে না। রাতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য টাইলস ও কাচের ভবন দায়ী। রাজধানীতে সবুজায়ন ও জলাশয় না থাকায় গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে। দিনের বেলা ঘর থেকে বের হলেই লু হাওয়া এসে গায়ে জ্বালা ধরাচ্ছে। সূর্য ডোবার পরও তাপমাত্রা কমছে না, শীতল হচ্ছে না-চারপাশ। রাজধানীর ফ্ল্যাটগুলোর ভেতরে ভাপসা গরম। গণপরিবহণগুলো অগ্নিবর্ষণ করে সড়কে ছুটছে। কংক্রিটের তৈরি সড়ক আর যানবাহনের গরম বাতাস তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। চলতি মাসে বেশির ভাগ জেলার তাপদাহ ৪০ ছুঁইছুঁই করছে। বাতাসে জলীয়বাষ্প বেশি থাকার কারণে মরুভূমির মতো বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে।

নগরপরিকল্পনাবিদ ড. সফিউল আলম বলেন, রাজধানীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য অপরিকল্পিতভাবে উঁচু ভবন নির্মাণ ও ভবনের মধ্যে উন্মুক্ত স্থান না রাখাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইট, বালু ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি হওয়ায় ভবনগুলোতে তাপ জমে থাকছে। আর উঁচু হওয়ায় এবং উন্মুক্ত স্থান না থাকায় জমে থাকা তাপ বের হতে পারছে না। গাছপালা কেটে ফেলা, জলাশয় ভরাট, যানবাহন ও কংত্রিক্রটের স্থাপনা বেড়ে যাওয়ার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে। কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে নেওয়া ছবি আর তাপমাত্রা পরিমাপ করে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগ ঢাকার তপ্ত এলাকা বৃদ্ধির পরিমাণ নির্ণয় করেছে। তাতে দেখা যায় রাজধানীর আটটি অঞ্চলের ২৫টি এলাকা তপ্ত হয়ে উঠেছে। আর অন্য এলাকার সঙ্গে তপ্ত এলাকার তাপমাত্রার পার্থক্য ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যেখানে দিনে জমা হওয়া তাপের বেশির ভাগ রাতেও থেকে যাচ্ছে। পরদিন নতুন করে ওই এলাকায় তাপ জমা হচ্ছে। এভাবে এলাকাটি তপ্ত ভূখন্ডে (হিট আইল্যান্ড) পরিণত হচ্ছে। মতিঝিল, তেজগাঁও, মিরপুর, গুলশান, উত্তরা, মহাখালী, পান্থপথ, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট এলাকায় বেশি গরম অনুভূত হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নেচার কনজার্ভেশন ম্যানেজমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম মনজুরুল হান্নান খান যায়যায়দিনকে বলেন, ধুলা আর দূষণে অতিষ্ঠ নগরজীবন। জলাভূমি ভরাট করে একের পর এক কংক্রিটের ভবন ও পিচঢালা পথ নির্মাণের ফলে শহরে তাপমাত্রাও বাড়ছে। সবুজ বনানী আর বৃক্ষের ছায়াতল সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। মাটি, পানি আর ঘাস ঢেকে যাচ্ছে কংক্রিটের আস্তরণে। তীব্র গরম আর দূষণে অতিষ্ঠ নগরজীবন।

তিনি আরো বলেন, বিশ্বের অনেক শহরের তাপমাত্রা এভাবে বেড়ে যাওয়ার পর সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা নেওয়া হচ্ছে। কৃত্রিমভাবে উদ্যান ও জলাভূমি সৃষ্টি করা হচ্ছে। রাজধানীর ভবনগুলো চারপাশ বন্ধ একেকটি খাঁচার মতো করে নির্মিত হচ্ছে। সেখানে বাতাস খেলা করার মতো জায়গা থাকছে না। আর দিনের বেলায় যে পরিমাণ সূর্যের আলো আসছে, তা ভবনের গায়ে, ছাদে, পার্শ্ববর্তী রাস্তায় জমে থাকে। সূর্য ডুবে গেলে ওই জমে থাকা তাপ অল্প অল্প করে ছাড়ছে। ফলে ঘরের বাইরে ও ভেতরে সমান গরম অনুভূত হয়।

এ দিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ধুলা আর দূষণে অতিষ্ঠ নগরজীবন। নিমভূমি ও জলাভূমি ভরাট করে একের পর এক কংক্রিটের ভবন ও পিচঢালা পথ নির্মাণের ফলে শহরে তাপমাত্রাও বাড়ছে। মৌসুমি বায়ু আসার আগের এই সময়ে যে বৃষ্টিপাত হয়, তার উৎস হচ্ছে স্থানীয় নদী ও জলাশয় থেকে সৃষ্ট জলীয়বাষ্প। জলাশয় কমে যাওয়ায় বৃষ্টিপাতও কমছে। প্রতিবছর এই তিন মাসে দশমিক শূন্য ৬৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়ছে। ক্রমে ধূসর হয়ে উঠছে ঢাকা। জলাশয় কমছে আশঙ্কাজনক হারে।

আবহাওয়াবিদ আবুল কাশেম বলেন, বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার বৈরী আচরণে মরুভূমির সব বৈশিষ্ট্যই যেন ভর করেছে রাজধানীর বুকে। আর উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী বা দক্ষিণাঞ্চলের যশোর-চুয়াডাঙ্গার তাপমাত্রাও যেন মরুভূমির তাপমাত্রাকে ছাড়িয়েছে। প্রকৃতি হঠাৎ করেই বিরূপ হয়ে ওঠেছে। এই অসহনীয় গরম কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। মৌসুমি বায়ু দেশে প্রবেশ করলে শীতল হবে প্রকৃতি। গরম বৃদ্ধির জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের অধিক ব্যবহারও দায়ী। এসব যন্ত্রের ব্যবহার যতই বাড়ছে, ভবনের বাইরের এলাকার তাপমাত্রা ততই বাড়ছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে