মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
বাংলাদেশকে আরও বিনিয়োগের আশ্বাস শি'র

ঢাকা-বেইজিং ২১ চুক্তি ও এমওইউ স্বাক্ষর

যাযাদি ডেস্ক
  ১১ জুলাই ২০২৪, ০০:০০
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন -স্টার মেইল

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে 'কৌশলগত অংশীদারত্ব' থেকে 'ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশদারত্বে' নিয়ে যেতে ২১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক এবং সাতটি প্রকল্পের ঘোষণাপত্রে সই করেছে দুই দেশ।

অর্থনৈতিক ও ব্যাংক খাতে সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা, ষষ্ঠ ও নবম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণ, বাংলাদেশ থেকে কৃষি পণ্য রপ্তানি, দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক রয়েছে এর মধ্যে।

বাসস জানিয়েছে, বুধবার বেইজিংয়ের 'গ্রেট হল অব দ্য পিপল' বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে এসব দলিল সই হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালে 'গ্রেট হল অব দ্য পিপল' এ পৌঁছলে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানান।

শুভেচ্ছা বিনিময় এবং দুই দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয় পর্বের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে অভিবাদন মঞ্চে যান প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং। সামরিক বাহিনীর একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় অতিথিকে গার্ড অব অনার দেয়।

রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের পর দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শুরু হয়। পরে শেখ হাসিনা ও লি চিয়াংয়ের উপস্থিতিতে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

বাসস জানিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকট ছাড়াও ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে গুরুত্ব পায়।

বৈঠকের পর দুই প্রধানমন্ত্রী চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই, ঘোষণাপত্র সই এবং দলিল হস্তান্তর প্রত্যক্ষ করেন।

সই হয়েছে যেসব দলিল

১. ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে সমঝোতা স্মারক।

২. ব্যাংক ও বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়াতে চায়না ন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রেগুলেটরি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনএফআরএ) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে সমঝোতা স্মারক।

৩. বাংলাদেশ থেকে চীনে তাজা আম রপ্তানির জন্য 'ফাইটোস্যানিটারি' বিধি নিয়ে একটি প্রটোকল।

৪. অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতির ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে সমঝোতা স্মারক

৫. বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াতে সমঝোতা স্মারক

৬. ডিজিটাল অর্থনীতির ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে সমঝোতা স্মারক।

৭. বাংলাদেশে চীনা সহায়তায় 'ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার' করার সম্ভাব্যতা যাচাই বিষয়ে বৈঠকের কার্যবিবরণী সই।

৮. চীনা সহায়তায় ষষ্ঠ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু সংস্কার প্রকল্পের পত্র বিনিময় হয়।

৯. চীনা সহায়তায় নাটেশ্বর আর্কিওলজিকাল সাইট পার্ক প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই বিষয়ে পত্র বিনিময়।

১০. চীনের সহায়তায় নবম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু প্রকল্প বিষয়ে পত্র বিনিময়।

১১. চিকিৎসাসেবা এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সহযোগিতা বাড়াতে সমঝোতা স্মারক।

১২. অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা জোরদারে সমঝোতা স্মারক।

১৩. কার্বন নির্গমণ কম রেখে উন্নয়ন বিষয়ে সহযোগিতার জন্য সমঝোতা স্মারক।

১৪. বন্যা মৌসুমে ইয়ালুজাংবু (ব্রহ্মপুত্র) নদীর হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য বাংলাদেশকে দেওয়ার বিধি-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক নবায়ন।

১৫. চীনের জাতীয় রেডিও এবং টেলিভিশন প্রশাসনের সঙ্গে বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা বাড়াতে সমঝোতা স্মারক।

১৬. চায়না মিডিয়া গ্রম্নপ (সিএমজি) এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে সমঝোতা স্মারক।

১৭. চায়না মিডিয়া গ্রম্নপ (সিএমজি) এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে সমঝোতা স্মারক।

১৮. চীনের বার্তা সংস্থা সিনহুয়া এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) মধ্যে একটি চুক্তি।

১৯. চীনের বার্তা সংস্থা সিনহুয়া এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মধ্যে একটি চুক্তি।

২০. শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিষয়ে দুই দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝাতা স্মারক নবায়ন।

২১. টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক।

সাত প্রকল্পের ঘোষণা

১. চীন-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বিষয়ে যৌথ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমাপ্তি ঘোষণা।

২. চীন-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির আলোচনা শুরুর ঘোষণা।

৩. ডিজিটাল কানেকটিভিটি প্রকল্পের জন্য টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের সমাপ্তি ঘোষণা।

৪. ডাবল পাইপ লাইনের মাধ্যমে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের কার্যক্রমের পরীক্ষামূলক পর্যায়ের সমাপ্তি ঘোষণা।

৫. রাজশাহী ওয়াসার সারফেইস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট পস্ন্যান্ট প্রকল্প শুরুর ঘোষণা।

৬. শানদং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক।

৭. বাংলাদেশে লুবান ওয়ার্কশপ নির্মাণের ঘোষণা।

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক

এদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, 'বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় অব্যাহতভাবে সহযোগিতা করে যাব। বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে চাই আমরা।'

বুধবার স্থানীয় সময় বিকালে বেইজিংয়ের 'গ্রেট হল অব দ্য পিপল'-এ সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে চীনের এই আগ্রহের কথা জানান শি জিনপিং।

পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায়, উন্নয়ন অগ্রগতিতে চীন অব্যাহতভাবে সহযোগিতা করে যাবে।

বাংলাদেশকে অনুদান, সুদমুক্ত ঋণ, কম সুদে ঋণ এবং বাণিজ্যিক ঋণ; এই চার ক্ষেত্রে চীন সহযোগিতা করবে বলেও উলেস্নখ করেন তিনি।

এ বিষয়ে দুই দেশের টেকনিক্যাল কমিটি যৌথভাবে কাজ করবে। শিগগিরই চীন থেকে টেকনিক্যাল কমিটি বাংলাদেশে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।

গত কয়েক দশকে চীনের অভূতপূর্ব উন্নয়নের কথা উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, 'এই উন্নয়ন আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।'

পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু টানেলসহ বিভিন্ন আইকনিক স্থাপনা নির্মাণ, বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন সহযোগিতার জন্য চীনের প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ দেন শেখ হাসিনা।

চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৮০০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়ার কথা উলেস্নখ করে সেখানে, ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং আইটি কলেজগুলোতে চীনের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, তারা বাংলাদেশ থেকে আরও পণ্য আমদানি করবেন।

আমসহ অন্যান্য পণ্য আমদানির বিষয়ে আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেন শি জিনপিং।

আগামী বছর বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি। এটিকে সামনে রেখে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক, বিদ্যমান গভীর সম্পর্ককে দ্বিতীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন শি জিনপিং।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীরতর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

চীনের প্রেসিডেন্ট দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়, জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর কথাও বলেন।

আওয়ামী লীগ ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীরতর করার ওপর গুরুত্বারোপ করে শি জিনপিং বলেন, সুশাসনের জন্য ভালো দল দরকার।

রোহিঙ্গা ইসু্যটি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তোলার আগেই শি জিনপিং এ বিষয়ে কথা বলেন বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

রোহিঙ্গা ইসু্যতে চীনের রাষ্ট্রপতি বলেন, আমি জানি বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইসু্য। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন বাংলাদেশকে সর্বত সহায়তা করবে।

মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতির কথা উলেস্নখ করে শি জিনপিং বলেন, মিয়ানমার সরকার এবং প্রয়োজনে আরাকান আর্মির সঙ্গেও তারা যোগাযোগ করে এই সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে চীন।

ওয়ান চায়না নীতির পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রশংসা করেন শি জিনপিং।

শি জিনপিং বলেন, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে চীন হস্তক্ষেপ করে না। আমরাও চাই না কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করুক।

আন্তর্জাতিক ফোরামে চীন ও বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করবে জানিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, আন্তর্জাতিক ফোরামে আমরা একসঙ্গে কাজ করব এবং বিশ্ব শান্তি এবং সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ এবং চীন একসঙ্গে কাজ করবে।

ব্রিফিংয়ে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব মো. নাঈমুল ইসলাম খান।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে