logo
  • Tue, 25 Sep, 2018

  সালাম সালেহ উদদীন   ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০  

আর নয় আত্মহনন : জীবনকে ভালোবাসুন

আত্মহননকারীরা জীবনের নানামুখী সমস্যা সংকট থেকে মুক্তি পেতেই নিজেকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে নেয়। প্রকৃতপক্ষে নিজেকে ধ্বংস করার ভেতর কোনো বীরত্ব নেই, নেই কোনো কৃতিত্ব। চিকিৎসকদের মতে, আত্মহত্যাকারীদের ৯৫ শতাংশই মানসিক রোগে ভোগেন। দেশে ৬৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা। গভীর হতাশা বিষণœতার কারণেই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে সব চেয়ে বেশি। আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষকে সঙ্গ দেয়া, বিনোদনমূলক ও প্রকৃতিনিভর্র কোনো জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাওয়া উচিত। আর এটা করতে হবে বন্ধু আত্মীয়-স্বজনকেই। আত্মহত্যা ব্যক্তি পরিবার ও সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, এই প্রভাব নেতিবাচক।

আর নয় আত্মহনন : জীবনকে ভালোবাসুন
নানা কারণে দেশে আত্মহত্যা করার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। শুধু আমাদের দেশেই নয় বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই আত্মহত্যাপ্রবণতা চোখে পড়ে। প্রতিবছর সারা বিশ্বে ৮ লাখ মানুষ এই পথ বেছে নেয়। যদিও প্রচলিত আইনে আত্মহত্যা অপরাধ হিসেবে গণ্য। আত্মহত্যা জীবনের একটি অমীমাংসিত সমাধান। কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, ‘যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চঁাদ/মরিবার হ’লো তার সাধ।’ মরিবার সাধ- এই কথাটির মধ্যে অনেক তাৎপযর্ বহন করে। স্বেচ্ছায় নিজের জীবন বিসজর্ন দেয় ভীরু-কাপুরুষ যারা তারা। এই কথাও সমাজে প্রচলিত রয়েছে। অথবা এটাও বলা যেতে পারে যে যারা জীবনকে ভালোবাসে না কেবল তারাই আত্মহননের পথ বেছে নেয়। আত্মহত্যা মহাপাপ। ধমর্ এটাকে সমথর্ন করে না। বরং এ ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে।

বাংলাদেশের অন্যান্য সামাজিক সমস্যার মধ্যে আত্মহত্যারপ্রবণতাও একটি গুরুত্বপূণর্ ও জটিল সমস্যা। ১৪ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃতু্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ এটি। প্রতিবছরই তা বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, গত বছর দেশে আত্মহত্যা করে ১১ হাজার ৯৫ জন, দিনে যা ৩০ জনেরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকসেবন বেড়ে যাওয়া, কমর্সংস্থানের অভাব, পারিবারিক কলহ, নিযার্তন, ভালোবাসায় ব্যথর্তা, পরীক্ষায় অকৃতকাযর্, বেকারত্ব, যৌন নিযার্তন, অপ্রত্যাশিত গভর্ধারণসহ বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। তবে সম্পদশালী বা অথর্শালীর আত্মহত্যা খবর খুব কমই শোনা যায়। আত্মহত্যার রকমফের আছে যেমনÑ বয়সী কোনো গাছের সঙ্গে রশি বেঁধে গলায় ফঁাস লাগিয়ে আত্মহত্যা, এটা ইদানীং আমাদের অভিমানী নিযাির্তত তরুণীরা ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে করে। আর ছোট সময়ে খালেক ব্যাপারীর বাস্তুভিটায় পরাজিত জীবন নিয়ে মনাই শেখকে আত্মহত্যা করতে দেখেছিলাম। গলায় ফঁাস লেগে তার জিহŸা তিনগুণ হয়ে মুখ থেকে বাইরে ঝুলেছিল, যেন ওই জিহŸাই ফঁাসের আরও একটি মিনিসাইজের রশি। আর তার চোখ দুটো বড় হয়ে ঠিকরে পড়ার চেষ্টা করছিলÑ তা ছিল বৃহৎ কোনো মাছের চোখের মতো পলকহীন। কোনো উঁচু দালান থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা, চলন্ত ট্রেনের সামনে গিয়ে আত্মহত্যা, নদীতে ঝঁাপ দিয়ে কিংবা বিষপান করে আত্মহত্যা বা অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যা।

এক পরিসংখ্যান বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে ১০ হাজার ৬০০, তার আগের বছর সাড়ে ১০ হাজার, ২০১৪ সালে ১০ হাজার ২০০ জন, ২০১৩ সালে ১০ হাজার ১২৯ জন, ২০১২ সালে ১০ হাজার ১০৮ জন, ২০১১ সালে ৯ হাজার ৬৪২ জন, ২০১০ সালে ৯ হাজার ৯৬৫ জন আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীই বেশি। এর কারণ উদ্ঘাটনে আত্মহত্যার ৯৭০টি ঘটনা পযাের্লাচনা করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ। তারা বলেছে, বাংলাদেশে নারীদের ওপর শারীরিক, যৌন ও মানসিক নিযার্তন এবং ইভ টিজিংয়ের ঘটনা বাড়ায় অনেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন। অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের আগে যৌন সম্পকর্ স্থাপনে বাধ্য হওয়া অথবা স্বেচ্ছায় যৌন সম্পকর্ স্থাপনের পর গভর্ধারণের কারণে অনেকে আত্মহত্যা করেন। বেশিরভাগ নারী আত্মহত্যা করেছেন গলায় দড়ি দিয়ে, পুরুষেরা কীটনাশক খেয়ে। আবেগতাড়িত ও পরিকল্পিত এ দুই ধরনের আত্মহত্যা হয়। তবে দেশে আবেগতাড়িত আত্মহত্যার পরিমাণ বেশি, এটি একটি মানসিক সমস্যা। সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে এ ধরনের ঝুঁকি থেকে বঁাচানো সম্ভব।

আত্মহননকারীরা জীবনের নানামুখী সমস্যা সংকট থেকে মুক্তি পেতেই নিজেকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে নেয়। প্রকৃতপক্ষে নিজেকে ধ্বংস করার ভেতর কোনো বীরত্ব নেই, নেই কোনো কৃতিত্ব। চিকিৎসকদের মতে, আত্মহত্যাকারীদের ৯৫ শতাংশই মানসিক রোগে ভোগেন। দেশে ৬৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা। গভীর হতাশা বিষণœতার কারণেই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে সব চেয়ে বেশি। আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষকে সঙ্গ দেয়া, বিনোদনমূলক ও প্রকৃতিনিভর্র কোনো জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাওয়া উচিত। আর এটা করতে হবে বন্ধু আত্মীয়-স্বজনকেই। আত্মহত্যা ব্যক্তি পরিবার ও সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, এই প্রভাব নেতিবাচক।

মৃত্যুর রং কালো কিনা জানি না। খ্রিস্টের জন্মেরও বহু আগে গ্রিক দাশির্নক সক্রেটিস হ্যামলক পান করার আগে বলেছিলেন, ‘আই টু ডাই ইউ টু লিভ, হুইচ ইজ বেটার অনলি গড নোজ।’ কবি সিলভিয়া প্লাথ, লেখক মাইকোভস্কি অথবা আমাদের কথাসাহিত্যিক কায়েস আহমেদ আত্মহত্যার আগে কোনো উক্তি বা বাণী উচ্চারণ করেছিলেন কিনা আমাদের জানা নেই। তারপরেও তারা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। অনেকেই মনে করেন, রাতের অন্ধকার মৃত্যুর রঙের মতো। পৃথিবীতে অন্ধকার না থাকলে মানুষের মৃত্যু হতো না। অন্ধকার হচ্ছে মৃত্যুর প্রতীক। এ কথা সত্য, আমাদের দেশে বিনোদনকেন্দ্রের অভাবে মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ হচ্ছে না। এ ছাড়া আত্মহত্যা মানসিক রোগ হিসেবে না দেখে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক ও বন্ধুত্বের সম্পকের্ আরও দায়িত্ববান হতে হবে। সরকারেরও কিছু উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্যনীতিতেও আত্মহত্যাকে দেখতে হবে গুরুত্বের সঙ্গে। পরিবারের উচিত বিষয়টি খোলামেলাভাবে আলোচনা করা।

বাংলাদেশে আত্মহত্যা করার পেছনে সামাজিক, অথৈর্নতিক বিভিন্ন কারণ রয়েছে। পরিবারের সঙ্গে দ্ব›দ্ব এবং দূরত্ব তৈরি হওয়া, প্রেমে ব্যথর্তা, পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না করা, কাক্সিক্ষত জিনিস না পাওয়া, স্বপ্ন বা ইচ্ছা পূরণ না হওয়া, বেকারত্বের অভিশাপ ও ঋণ থেকে মুক্তি পেতে, মানসিক সমস্যাজনিত কারণে, মাদকদ্রব্যে আসক্ত হলে ইত্যাদি আরও অনেক ছোট-বড় বহু কারণ রয়েছে। আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমেই একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। যে করেই হোক এই ব্যাধি রুখতে হবে। মনে রাখতে হবে, জীবন একটাই, নিজের জীবনের গুরুত্ব নিজেকেই বুঝতে হবে, ভালোবাসতে হবে জীবনকে। অবশ্য সমাজে এমন কিছু মানুষ রয়েছে যাদের সব কিছুতেই অতিরিক্ত কৌত‚হল ও চরম হতাশা থাকে এবং ক্ষুদ্র বিষয়টিও মাথার মধ্যে জামিন দিয়ে রাখে। আমাদে প্রয়াত দাশির্নক আরজ আলী মাতুব্বরের মতো মনের মধ্যেই অজস্র কেন-এর জন্ম নেয়। কী পেলাম কী পেলাম না কী পাওয়া উচিত ছিল ইত্যাদি সব প্রশ্ন। এর থেকে জন্ম নেয় হতাশা অপ্রাপ্তি বঞ্চনার। এরাই ধীরে ধীরে জীবনকে তুচ্ছ মনে করে। ফলে আত্মহননের দিকে ধাবিত হয়।

জীবনকে জীবন দিয়েই গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। আমরা বাংলাদেশের মতো একটি শান্তিপূণর্ দেশে বাস করি। এ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দযর্, মানুষের মন হরণ করা ব্যবহার, অতিথিপরায়ণতা এবং আহার-বিহার সবই আকষর্ণীয় নজরকাড়া। সবদিক দিয়েই পরিপূণর্ এ বাংলা। বাংলার সম্পদ, এর সবুজ-শ্যামলী, নদ-নদী, পাহাড়-হ্রদ-জলের প্রপাত, সমুদ্রের ঢেউয়ের গজর্ন সবুজ প্রকৃতি সবই সৃষ্টিকতার্র অশেষ দান। এমন দেশে বাস করে আত্মহত্যার চিন্তা করতে হবে কেন? যে দেশ ও মানুষকে ভালোবাসে, আত্মীয়-স্বজনকে ভালোবাসে তারপক্ষে আত্মহত্যা করা কঠিন। এটা মনে রাখা জরুরি যে, জীবন সংগ্রামশীল স্বপ্নময় স্মৃতিকাতর ভয়াবহ এক নরককুÐ অথবা সুখের হাতছানি। জীবন জীবন নয় কিংবা জীবন ক্ষণিকের। এই জীবন টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নিজের। জীবন সম্পকের্ যত কথাই বলা হোক না কেনÑ জীবনের সংজ্ঞা দেয়া কঠিন। কোনো কবি সাহিত্যিক মনীষী পÐিত দাশির্নক এ পযর্ন্ত জীবনের সঠিক সংজ্ঞা দিতে পারেননি। জীবনকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না বলেই জীবন এত তাৎপযর্পূণর্ বৈচিত্র্যময়, নানা রং ও রেখার দ্বারা জীবনের প্রতিটি পরত ও বঁাক অঁাকা। তাই খুব সহজে কেউ জীবনের মায়া ত্যাগ করতে চায় না। সবাই আত্মপ্রেমে মশগুল থাকতে চায়। সক্রেটিস এও বলেছিলেনÑ‘নিজেকে চেন’। তাই কোনো মানুষ এক জীবনেও নিজেকে চিনতে পারে না। অথবা এভাবে বলা যায় যে নিজেকে চেনা সহজ নয়। নিজেকে চিনতে পারলে মানুষ ও জগৎ চেনা যায়। জীবনতো তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করা যায়। এ সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন তাদের জীবন সম্পকের্ কোনো গভীর উপলব্ধি নেই। তারা মনে করেন জীবন একভাবে কেটে গেলেই হলো। অথবা গভীর হতাশাবাদী-নৈরাশ্যবাদীরা ভাবে এ ক্ষুদ্র জীবনের কী মূল্য আছে? নানা দুঃখ কষ্ট হতাশায় অপ্রাপ্তি আর বঞ্চনায় অনেকেই জীবনকে তুচ্ছভাবে। আত্মহননের মাধ্যমে জীবনের মায়া ত্যাগ করে পৃথিবী থেকে চলে যায়, ঘটাতে চায় জীবনের পরিসমাপ্তি। এটা কোনো সমাধান নয়। বেঁচে থেকেই জীবনের সমাধান খুঁজতে হবে। জীবনের সমাধান জীবনের মধ্যেই নিহিত, আত্মহননের মধ্যে নয়।

সালাম সালেহ উদদীন: কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

উপরে