logo
বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর, ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬

  শফিকুল ইসলাম খোকন   ১০ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০  

এ বর্বরতা আর কতকাল চলবে?

আবরারের পিতামাতার মতো শূন্য বুক আর দেখতে চাই না, দেখতে চাই না স্বাধীন দেশে এমন নির্মম বর্বরতা। আমরা বিশ্বজিতের কথা মনে হয় ভুলে যাইনি, বিশ্বজিতকে তো প্রকাশ্যে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।

এ বর্বরতা আর কতকাল চলবে?
'আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই/স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের চিতা আমি তুলবই', কথাগুলো বলেছিলেন তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। সাম্যবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী সুকান্ত প্রতিবাদ ও সংক্ষোভের ভাষা ব্যবহার করেছিলেন শোষক ও নির্যাতকদের বিরুদ্ধে। কবির 'ছাড়পত্র' কাব্যগ্রন্থে 'বোধন' শিরোনামের কবিতায় কথাগুলো আছে।

সুকান্ত যদি আজকের প্রেক্ষাপটে বেঁচে থাকতেন, তাহলে শোষক ও নির্যাতকদের বিরুদ্ধেও ক্ষোভের দাবানল জ্বালাতেন। আমাদের আশপাশে মনুষ্য-সৃষ্ট মৃতু্যকূপ দেখে তিনিও সহ্য করতে পারতেন না। কারণ, প্রতিনিয়ত চলমান শোষণ ও নির্যাতনের ধারায় সমাজে যে হারে ঠান্ডা মাথার হত্যা ও বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে চলেছে, তা কবি বা সংবেদনশীল মানুষ তো বটেই, যে কোনো সাধারণ মানুষও সহ্য করতে পারছে না। আমি এ প্রজন্মের সন্তান হয়ে আমিও এ ঠান্ডা মাথার হত্যাকান্ড বর্বরোচিত ঘটনা সহ্য করতে পারছি না। আমি এও বিশ্বাস করি, এ বর্বরোচিত ঘটনা সমাজের কেউ সহ্য করতে পারছেন না।

কি ঘটেছিল ওইদিন? কি কারণে নির্মমভাবে হত্যা হয়েছিল আবরার? কেনই বা তার পিতামাতাকে সন্তান হারা করা হলো, কি অপরাধ ছিল ওর...? এ প্রশ্ন শুধু আমার নয়; গোটা জাতির। হত্যা করেই প্রতিহিংসা, ক্ষোভ আর রাগ শেষ হয়ে যায়? না... আমি বিশ্বাস করি না। একজনের প্রতি ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা থাকলে তাকে হত্যা করলেই শেষ হয়ে যায় না। বরং এ থেকে আরও তিক্ততা, শত্রম্নতা বাড়ে। ক্রমশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বা পড়তে হয়। আমরা জানি, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) সর্বোচ্চ মেধাবীরাই স্থান পায়। বুয়েটের ছাত্র আবরারকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তা মানার নয়। হিংসা ও বিদ্বেষবশে, মতপার্থক্যের জন্য, এমনকি তুচ্ছ ঘটনায় হত্যার মতো ঘটনা কেন্দ্র করেই তো ঘটছে? শুধু আবরার কেন, এ রকমের ঘটনায় বাইরের কেউ নয়, হত্যাকান্ড ঘটাচ্ছে আত্মীয়-প্রতিবেশী, আশপাশের লোক, স্বজন, সহপাঠীরা। শেষ পর্যন্ত কি হলো? আবরারকে হত্যা করে কি পাওয়া গেল? কিছুই পাওয়া যায়নি, পাওয়া গেছে সমাজ ও রাষ্ট্রের ধিক্কার, প্রাণ হারালো একজন তরুণ, পিতামাতা হারালো তার সন্তান, বিশ্ববিদ্যালয় হারালো একজন মেধাবী শিক্ষার্থী, বন্ধুরা হারালো একজন বন্ধুকে, ছাত্র ভাইয়েরা হারালো একজন মেধাবী ছাত্র ভাইকে। এই উন্মত্ততা ও নৃশংসতার ব্যাখ্যা করাও দুষ্কর। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এহেন হিংস্রার বিশ্লেষণ ও প্রতিবিধান করা আজকে জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে এ ধরনের আইন বহির্ভূত ও হঠকারিতামূলক আচরণ- যা হত্যা ও নির্মমতার পরিচায়ক, তার নিন্দা, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা।

বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যার ঘটনায় পুরো দেশ উত্তাল। দেশ থেকে এর প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে বিদেশেও। সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে প্রতিবাদের ঝড়। দলমতনির্বিশেষে আবরারের হত্যাকারীদের শাস্তি দাবি করছেন সবাই। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পাশাপাশি বিশ্ব গণমাধ্যমে আবরার হত্যার খবর। ফরাসি গণমাধ্যম এএফপি, দ্য হিন্দুর খবর, আল-জাজিরার খবর, এ ছাড়া ভয়েস অব আমেরিকাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই হত্যাকান্ডের খবর প্রকাশ পেয়েছে। এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় সবচেয়ে যেটা উদ্বেগের বিষয় তা হলো, হত্যার কারণ ভিন্নমত। আবরার ফাহাদ ফেসবুকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক কয়েকটি চুক্তির সমালোচনা করেছিলেন। কেউ কোনো বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করতেই পারেন। তার মতের সঙ্গে সবাই একমত হবেন এমন কোনো কথা নেই। তাই বলে তাকে মেরে ফেলা হবে! এ যুগে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্নমত প্রকাশের কারণে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হবে, এটি অকল্পনীয়। তবে বাস্তবতা হলো, ভিন্ন মতের কারণে হত্যার ঘটনা দেশে আগেও ঘটেছে। এমন অসহিষ্ণুতা সমাজের জন্য একটি অশনিসংকেত। এ অসহিষ্ণুতার কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এমন ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এ ঘটনায় আমাদের সমাজে অসহিষ্ণুতা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা ভেবে শঙ্কিত হতে হয়। এটি বাস্তবিকই চিন্তার বিষয়। আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের সংবিধান যে কোনো নাগরিককে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার দিয়েছে। বাকস্বাধীনতা মানবাধিকারও বটে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ বর্বরতা, হিংসাত্মক ও নিমর্মতা আর কতকাল চলবে। স্বাধীন দেশে আর কত এভাবে দেখবে জাতি। আসলে কি এ থেকে মুক্তি পাবে না দেশ? আমার বিশ্বাস মুক্তি পাবে, কিন্তু তার আগে কিছু কাজ রয়েছে। সেটি হলো আগে মানসিকতার পরিবর্তন, তারপরে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা, আন্তরিকতা ইত্যাদি। আমরা জানি মুক্তিযুদ্ধ করা যতটা না সহজ তার চেয়ে স্বাধীন দেশটাকে রক্ষা করা কঠিন। ঠিক তেমনি এ রকমের অপরাধ করার পরে অপরাধীদের শাস্তি দেয়া যতটা সহজ তার চেয়ে কঠিন সমাজে বা রাষ্ট্রে অপরাধ না হওয়া বা অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটা। আমরা দেখে আসছি একটি ঘটনা ঘটলেই কয়েকদিন আলোচিত থাকে, পরে তা মুছে যায়। একটি ইসু্য এসে আগের ইসু্য চাপা পড়ে যায়। এমনটা কি হতে পারে না যে, একটি অপরাধ ঘটার পরে ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না এবং ওই ঘটনার সঠিক বিচার হবে? আবরার থেকেই হোক না আইনের শাসনের বাস্তবায়নের সূচনা, হোক না ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। কিভাবে পারা যায় সহপাঠিকে নির্মমভাবে হত্যা করতে, কিভাবে পারে একটি জীবন্ত প্রাণ নিমিষেই স্তব্দ করে দিতে? তাহলে আমরা বুঝতে পারি বিবেক, মানবতা আজ বিলিন হয়ে গেছে? তাহলে আমি কি বলতে পারি না 'বিবেক তুই কোথায় আছিস, বিবেকের কান্না পারলে মাপিস' মানবতা তুই কোথায় আছিস, পারলে মানবতার চিত্র ধরে রাখিস, সেরা বিদ্যাপীঠে এ কেমন পশুর অভিলাষ, সহপাঠীকে মেরে পিতার কাঁধে দিলি লাশ'।

\হদেখুন, দেখতে থাকুন, ভাবুন, ভাবতে থাকুন। চলছে নির্মমতা, হিংসাত্মক বর্বরতা। ওকে হত্যা করেই সব শেষ হয়ে গেল? না হয়নি। আরও আছে দেখেন, শোনেন, বোঝেন... কিন্তু চুপ... কোনো কথা নয়, প্রতিবাদ নয়, সোচ্চার নয়...। শুধুই দেখা...। এমনই অবস্থা বিরাজ করছে দেশে। তবে হঁ্যা, মানুষ এখন সচেতন হয়েছে, কথা বলতে শিখেছে। দেখব, শুনব, প্রতিবাদও করব, পিতার কাঁদে সন্তানের লাশ... কত বড় বোঝা তা বুঝতে পারছে আবরারের বাবা। আবরারের বাবার মতো আমাদেরও বুঝতে হবে।

\হআবরারের পিতামাতার মতো শূন্য বুক আর দেখতে চাই না, দেখতে চাই না স্বাধীন দেশে এমন নির্মম বর্বরতা। আমরা বিশ্বজিতের কথা মনে হয় ভুলে যাইনি, বিশ্বজিতকে তো প্রকাশ্যে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।

পরিশেষে সুকান্ত ভট্টাচার্যের বোধন কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে শেষ করব 'হে মহামানব, একবার এসো ফিরে শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম নগরের ভিড়ে, এখানে মৃতু্য হানা দেয় বারবার; লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার।'

শফিকুল ইসলাম খোকন: কলাম লেখক

সংর.শযড়শড়হঢ়@মসধরষ.পড়স
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে