logo
বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২০, ২৬ চৈত্র ১৪২৫

  সালাম সালেহ উদদীন   ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

একুশের চেতনা ও ভাষাপ্রেম

কেবল ভাষার মাস এলেই আমরা একুশের কাছে, একুশের চেতনার কাছে ফিরে যাই। এই চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করি। সারা বছর একুশ নিয়ে আমাদের কোনো ভাবনা ও মনোযোগ থাকে না। আমরা সচেতনভাবে নয়, অবচেতনভাবেই আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তিভূমি একুশকে অবহেলার চোখে দেখে আসছি। এই ধরনের প্রবণতা আত্মঘাতী।

একুশের চেতনা ও ভাষাপ্রেম
একুশে ফেব্রম্নয়ারি আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। অনেক ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা মাতৃভাষা আন্দোলনে বিজয় অর্জন করেছি, হয়েছি নবচেতনায় উজ্জীবিত। সঙ্গত কারণেই একুশ আমাদের প্রতিবাদী সংগ্রামী হতে শিক্ষা দেয়। কেবল ভাষার মাস এলেই আমরা একুশের কাছে, একুশের চেতনার কাছে ফিরে যাই। এই চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করি। সারা বছর একুশ নিয়ে আমাদের কোনো ভাবনা ও মনোযোগ থাকে না। আমরা সচেতনভাবে নয়, অবচেতনভাবেই আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তিভূমি একুশকে অবহেলার চোখে দেখে আসছি। এই ধরনের প্রবণতা আত্মঘাতী। বাংলা ভাষার বিকাশ ও চর্চার জন্য, সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের প্রচেষ্টা সারা বছর থাকতে হবে। যে ভাষার জন্য এত ত্যাগ ও সংগ্রাম সে ভাষা উপেক্ষিত হতে পারে না, বন্দি হতে পারে না কোনো দৃষ্টচক্রের হাতে। সাংস্কৃতিক চেতনা দিয়েও যে সংগ্রাম করা যায় বাঙালির ভাষা আন্দোলন তার বড় প্রমাণ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাঙালি সংগ্রামের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে তা সত্যিই বিস্ময়কর। ভাষা শহিদদের দেশপ্রেম ও ভাষাপ্রেমের ইতিহাস আজও আমাদের আত্মচেতনাকে জাগ্রত করে ভাষা সংস্কৃতি, কৃষ্টির উত্তরাধিকার ও ঐতিহ্য রক্ষায় সংকল্পবদ্ধ করে তোলে। একুশের যে চেতনা এ দেশের মানুষকে আত্মপরিচয়ের পথ দেখিয়েছে, সে চেতনায় সমগ্র বাঙালিসত্তা উপলব্ধি করে আমি বাঙালি, বাংলা আমার মাতৃভাষা, আমি মায়ের ভাষায় কথা বলি।

আশার কথা, ভাষা শহিদ দিবসসহ বিভিন্ন দিবসের উদযাপনে বাংলা সন ও তারিখ ব্যবহারে নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ এ রুল দেয়। এক সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে আবেদনকারীর পক্ষের আইনজীবী মো. মনিরুজ্জামান লিংকন জানিয়েছেন।

উলেস্নখ্য, গত ১২ ফেব্রম্নয়ারি চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার নস্কর আলী সরকারি-বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান- সংস্থায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বা শহিদ দিবসসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দিবসের অনুষ্ঠান, পালন, উদযাপনে বাংলা সন ও তারিখ ব্যবহার বা উলেস্নখের নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদনটি করা হয়। জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দিবস পালন বা উদযাপনে ইংরেজি তারিখের উলেস্নখ থাকলেও বাংলা সন, তারিখের কোনো উলেস্নখ থাকে না। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, ভাষা শহিদ দিবসের তারিখটাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইংরেজি তারিখে। ঘটনার দিনটি যে ৮ ফাল্গুন ছিল, ব্যবহার না করায় তা অনেকেই জানেই না। সরকার বাংলা পঞ্জিকা পরিবর্তনের পর এখন থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ৮ ফাল্গুন পড়ার কথা। কিন্তু কেউ তো বাংলা সন-তারিখটা ব্যবহার করছে না। তাই বাংলা সন-তারিখ ব্যবহারের নির্দেশনা চেয়ে আবেদনটা করা হয়েছিল। এই আবেদনটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। সারাদেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের যে অনুষ্ঠান হয়, তাতে যে সাইনবোর্ড থাকে, সেখানে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা তারিখও লেখা উচিত। এই চর্চা এতদিন কেন করা হয়নি সেটাই বড় প্রশ্ন।

অপ্রিয় হলেও সত্য, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের যে দাবি ছিল তা আজও পূরণ হয়নি। শুধু কাগজে-কলমে রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু সর্বত্রই ইংরেজিসহ বিদেশি ভাষার দাপট ও আগ্রাসন। ভাষা শহিদদের চাওয়া এখনো পূরণ হয়নি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেয়া হয়। বিভিন্ন সরকারের আমলে আইনও প্রণয়ন করা হয়। আইনের প্রয়োগ না থাকা অথবা মাতৃভাষার প্রতি অবজ্ঞার কারণে দেশের বেশিরভাগ স্তরেই বাংলা বিমুখতা প্রকট আকার ধারণ করে। সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। এত কিছুর পরও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্রভাষা বাংলা একদিন অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তাই মাতৃভাষার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে সবাইকে। অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন ভাষাবিদরা। বাংলা বিশ্বের ২২ কোটি মানুষের মাতৃভাষা, বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা তথা সরকারি ভাষা। যে কোনো ভাষাই সচল প্রবহমান নদীর মতো। চর্চা ও গবেষণার মাধ্যমেই ভাষা সমৃদ্ধশালী হয়। পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয় নতুন আঙ্গিক ও অবয়বে। হাজার বছরের বাংলা অনেক সমৃদ্ধ ভাষা। এর শব্দভান্ডার অফুরন্ত। এর রয়েছে নানা বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ও মাধুর্য। অথচ বাংলা ভাষার ঐতিহ্য হারিয়ে আমরা জগাখিচুড়ির মতো অবস্থায় উপনীত হয়েছি। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দাপটে শিক্ষার মাধ্যম বাংলা এখন দিশাহারা। এই ধরনের পরিস্থিতি সত্যিই দুঃখজনক। যে করেই হোক এমন নাজুক অবস্থার উত্তোরণ ঘটাতে হবে। বাংলা থাকবে ইংরেজিও থাকবে, তবে বাংলাকে অমর্যাদা উপেক্ষা করে যে কোনো উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ, সঠিক ব্যবহার ও প্রয়োগ এবং সঠিক বানান রীতির ওপর বাঙালি হিসেবে সব বাঙালিকে অপরিহার্যভাবে যত্নবান হতে হবে। শতভাগ মনোযোগ দিতে হবে মাতৃভাষার প্রতি। উন্নত অনেক দেশই নিজস্ব ভাষাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড নিজস্ব ভাষাতেই হচ্ছে। চিন জাপান ফ্রান্স জার্মান ল্যাটিন আমেরিকার দেশসমূহ- এমন অনেক দেশেরই নাম নেয়া যেতে পারে।

সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার নিশ্চিত করার আগে জরুরি হলো আমরা শুদ্ধভাবে বাংলা বলতে এবং লিখতে পারি কিনা তা যাচাই করা। যারা বাংলায় লেখালেখি করেন তারা অবগত আছেন ভাষা আন্দোলন, বাংলা একাডেমি আর একুশের বইমেলা মূলত একই সূত্রে গাঁথা। একুশে ফেব্রম্নয়ারির এই যে বইমেলা, এ শুধুই বইমেলা নয়, একুশের চেতনায় ভাস্বর বাঙালির আন্দোলনের প্রতিবাদের প্রতীক। তাই এ মেলার সঙ্গে মিশে আছে একুশের চেতনা একুশের আদর্শ, নিহিত রয়েছে বাঙালি সংস্কৃতির উৎসমূল। সঙ্গত কারণেই সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালুসহ ভাষার বিকৃতি রোধ করতে হবে। রক্ত দিয়ে কেনা আমাদের এই ভাষা আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এরপরও আমরা কেন এই ভাষার সম্মান আর মর্যাদা রাখতে পারছি না।

আমাদের ছেলেমেয়েরা বাংলিশ ভাষায় কথা বলছে। তারা বাংলাভাষার প্রতি উদাসীন। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ভুল বানানে বাংলা লেখা সাইন বোর্ড চোখে পড়ে, ইংরেজি সাইন বোর্ডেরও সর্বত্র ছড়াছড়ি। এটা মেনে নেয়া যায় না। ভাষাপ্রেমের আরেক প্রাপ্তি অমর একুশের গ্রন্থমেলা। মেলায় এখন পাঠকদের চেয়ে লেখকের সংখ্যা বেশি। যার কারণে অনেক নিম্নমানের বই বাজার দখল করে আছে। তবে লেখার মান নিশ্চিত করতে না পারলে বাংলাভাষা তার মর্যাদা হারাবে। ভাষাপ্রেম তথা মাতৃভাষার প্রতি দরদ ও ভালোবাসাই কেবল পারে জাতি হিসেবে আমাদের আরো সমৃদ্ধ, উন্নত ও বিকশিত করতে।

সালাম সালেহ উদদীন : কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে