logo
শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ১০ মাঘ ১৪২৬

  তানভীর হাসান   ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

সৈকত আটক

প্রেমিকের ফোন পেয়ে ওই ভবনে যান রুম্পা

প্রেমিকের ফোন পেয়ে ওই ভবনে যান রুম্পা
রুবাইয়াত শারমিন রুম্পা
প্রেমের সম্পর্কের বিচ্ছেদ মিমাংসা করতে প্রেমিকের ফোনে সাড়া দিয়ে সিদ্ধেশ্বরীর মেসে ছুটে যান স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী রুবাইয়াত শারমিন রুম্পা। পরে তারা সন্ধ্যা ৭টা থেকে ওই ফ্ল্যাটে দীর্ঘসময় কথা বলেন। ওইদিন রাত সোয়া ১০টায় তার মরদেহ পাওয়া যায় ওই ভবনের নিচে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ওই ভবনে সৈকত নামের প্রেমিকের সঙ্গে রুম্পার প্রবেশ করার ফুটেজ পাওয়া গেছে। এ পর্যায়ে বিষয়টি আত্মহত্যা না হত্যা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য সৈকতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহাবুবুল আলম যায়যায়দিনকে জানান, ওই ভবনে রুম্পা তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে প্রবেশ করার বিষয়টি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ কারণে সৈকত নামের ওই যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, বাদানুবাদের এক পর্যায়ে তিনি দৌড়ে ছাদে গিয়ে লাফিয়ে পড়তে পারেন। তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত, গত বুধবার রাত পৌনে ১১টার দিকে সিদ্ধেশ্বরীর ৬৪/৪ নম্বর বাসার নিচে রুম্পার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আলামত সংগ্রহ করেন। ধারণা করা হচ্ছে, মৃতু্যর আগে ধর্ষিত হয়েছিলেন। পুলিশের সুরতহাল রিপোর্ট অনুযায়ী মেরুদন্ড, বাম হাতের কনুই ও ডান পায়ের গোড়ালি ভাঙা। মাথা, নাক, মুখে জখম এবং রক্তাক্ত অবস্থায় ছিল। বুকের ডান দিকে ক্ষত চিহ্ন রয়েছে।

এদিকে মরদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডি ও সিদ্ধেশ্বরী ক্যাম্পাসে আয়োজিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, কয়েক মাস আগে সৈকতের সঙ্গে মনোমালিন্যে হয় রুম্পার। এরপর থেকে সৈকত তাকে এড়িয়ে চলছিলেন। ঘটনার দিন সৈকত তার সাথে যোগাযোগ করেন। এরপর তারা সিদ্ধেশ্বরীর ৬৪/৪ নম্বর বাসায় দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন। ওই ভবনের নিচ তলায় ও তৃতীয় ফ্ল্যাটে ব্যাচেলর কিছু ছাত্র বসবাস করেন। সেখানে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও রয়েছেন। সেখানকার তিন তলার মেসে রুম্পা ও সৈকত দীর্ঘসময় কথা বলেন।

যুগ্মকমিশনার ডিবি মাহাবুবুল আলম বলেন, তারা ওই ভবনে প্রবেশ করেন এটা নিশ্চিত। কিন্তু তাকে হত্যা করে ওই ভবন থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে নাকি তিনি কথা বলার এক পর্যায়ে দৌড়ে ছাদে গিয়ে লাফিয়ে পড়েন এটি এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এজন্য তার বয়ফ্রেন্ডকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাকে এখনো আটক বা গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, দীর্ঘ দিনের সম্পর্কের পর সৈকত রুম্পাকে ছেড়ে যাওয়ায় ক্ষিপ্ত ছিল রুম্পা। ঘটনার দিন সৈকতের পরিচিত একজনের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে রুম্পার কথা হয়। সৈকতের সঙ্গে আলোচনায় তাদের সম্পর্কের বিষয়টি মীমাংস না হলে তিনি আত্মহত্যা করবেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েই হয়তো তিনি বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। এজন্য হয়তো বাসায় তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রেখে বের হন। এ কারণে ময়না তদন্ত প্রতিবেদন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তাদের অপেক্ষা করতে হবে।

রমনা জোনের ডিসি সাজ্জাদুর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, হত্যা না আত্মহত্যা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এজন্য আমরা ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করব। তবে আমাদের তদন্ত থেমে নেই। ঘটনাস্থলের আশপাশের তিনটি ভবনের একটিতে মেস রয়েছে। সেখান থেকেই আমরা তদন্ত শুরু করেছি। তদন্তের স্বার্থে এখনই সবকিছু প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে দু-একদিনের মধ্যে আমরা এ বিষয়ের সমাধান পর্যায়ে আসতে পারব।

জানা গেছে, রুম্পার মোবাইল ফোনের কয়েকটি কল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিটি কলই সৈকতের পরিচিতজনের। এজন্য পুলিশের কাছে সৈকত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেন। তাকে শনিবার ভোরে তুলে নেওয়া হয় ডিবি কার্যালয়ে। এরপর দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার কথা স্বীকার করেনি। রুম্পা আত্মহত্যা করেছে মর্মেই তিনি বক্তব্যে দিয়ে যাচ্ছেন। বাদানুবাদের এক পর্যায়ে তিনি ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন বলে ডিবি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন। এ কারণে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত হয়তো তার বিরুদ্ধে আত্মহত্যা প্ররোচনার অভিযোগ আনা হতে পারে। কারণ বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তিনি রুম্পার সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। এবং তাদের সম্পর্কটাও অনেক গভীর পর্যায়ে ছিল।

রুম্পার সহপাঠীদের বিক্ষোভ

এদিকে গতকালও রুম্পার সহপাঠীরা বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন। তাদের দাবি, রুম্পা হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। কিন্তু এ ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও হত্যাকান্ডের রহস্যের কূলকিনারা করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। এ হত্যার সঙ্গে জড়িত যে বা যারা আছেন তাদের যেন দ্রম্নত আইনের আওতায় আনা হয়।

মানববন্ধনে রুম্পার সহপাঠীরা বলেন, আর যেন কোনো রুম্পাকে এভাবে জীবন দিতে না হয়। এই হত্যাকান্ডের একমাত্র বিচার মৃতু্যদন্ড। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলেই পরবর্তীতে আমরা রক্ষা পাব, তা না হলে এ ধরনের নির্মম হত্যাকান্ড চলতেই থাকবে।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ছাইফুল ইসলাম মাছুম বলেন, শুরু থেকেই এই হত্যাকান্ড অন্যদিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফেনীর নুসরাত হত্যার ঘটনাও ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হয়েছিল। অন্য কোনো ইসু্যতে যেন রুম্পা হত্যাকান্ড ধামাচাপা না পড়ে সেদিকে নজর দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, 'চারদিকে এত হত্যা, খুন-ধর্ষণের ভিড়ে আমরা শুধু স্বাভাবিক মৃতু্যর গ্যারান্টি চাই, আর কিছু নয়।'

মানববন্ধন শেষে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ধানমন্ডি ১৯ থেকে ১৫ নম্বর রোড পর্যন্ত প্রদক্ষিণ করেন। এ সময় ইউনিভার্সিটির সাতটি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কর্মসূচিতে অংশ নেন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে