শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
walton

নবীন শিক্ষার্থীদের বিশ্বময় প্রতিযোগিতায় প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান উপাচার্যের 

যাযাদি ডেস্ক
  ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ২১:২০

নবীন শিক্ষার্থীদের বিশ্বময় প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মশিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘তোমার পাশের বন্ধুর সঙ্গে তোমার প্রতিযোগিতা হবে না। সে তোমার বন্ধু। তোমার প্রতিযোগিতা হবে উন্নত বিশ্বে বেড়ে ওঠা তোমার বয়সি শিশুর সঙ্গে। তার মেধাকে চ্যালেঞ্জ করে তোমার মেধাকে আরও শ্রেষ্ঠতর করতে হবে।’

বৃহস্পতিবার (৭ ডিসেম্বর) মিরপুর কলেজের একাদশ শ্রেণির ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষের নবীনবরণ ও কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন উপাচার্য ড. মশিউর রহমান।

নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেশের প্রথিতযশা এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, ‘তোমরা জেনে নিশ্চয়ই আনন্দিত হবে, আমাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা দেশে বসে বিদেশের কাজ করছে। দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আমাদের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা যাচ্ছেন। দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। আমাদের চিকিৎসক, নার্স, প্রকৌশলী, শিক্ষার্থীরা যেখানেই যায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। আমাদের একটাই লক্ষ্য এই পবিত্র দেশমাতৃকা সুরক্ষা করা। আমার দেশের যা কিছু ভালো তা এগিয়ে নিয়ে যাব। আগামীর পথ চলায় বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আমাদের নতুন প্রজন্মকে তৈরি করব।’

উপাচার্য ড. মশিউর রহমান বলেন, ‘কোনো শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে পরীক্ষা দিতে পারবে না ভবিষ্যতে এমনটি আমরা হতে দেব না। আমি আস্থার সঙ্গে বলতে পারি তোমরা যদি সঠিকভাবে চারটি বছর কাজে লাগাও, তাহলে কেউ তোমার চলার পথকে রুখতে পারবে না। যদি সময়কে হেলায় হারাও, তাহলে মনে রেখো জীবনযুদ্ধে পরাজিত মানুষের পাশে হাত বাড়ানোর মানুষ খুব কম পাবে। সুতরাং নিজেকে জ্ঞানের আলোকে উজ্জীবিত করো। তোমাদের পাশে শিক্ষক আছেন, পিতা-মাতা আছেন, বড় ভাই আছেন। আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেকোনো বিষয়ে তোমাদের পাশে থাকবে- এটি আমি নিশ্চিতভাবে বলে যাচ্ছি। আমি আহ্বান জানাই তোমরা সবাই ক্লাস রুমে নিয়মিত উপস্থিত থাকবে। তোমরা তোমাদের কাজটি করবে আমরা আমাদের অভিভাবক হিসেবে আমাদের কাজটি করব।’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরিশ্রমী এবং আত্মপ্রত্যয়ী হয় উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, ‘যারা আমাদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাঝে মাঝে হতাশার কথা বলে, যারা বলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঠিকমত পড়াশোনা করে কি না, যারা বলে তারা পাস করে ঠিক মতো চাকরি পায় কি না, বেকার তৈরি হচ্ছে...আমি তাদের অনুরোধ করব- আমাদের শিক্ষার্থীদের মতো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে নিজে পড়াশোনা করে একইসঙ্গে বাবা-মা ভাই বোনকে দেখাশোনার দায়িত্ব গ্রহণ করার বাস্তবতা অনুধাবন করুন। তাহলে বুঝবেন যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী কতটা কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়ার চেষ্টা করছে। আমার শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কলেজে পড়ে বাধ্য হয়ে অথবা সুযোগের অপেক্ষায় থেকে দেশের বাইরে পাড়ি জমায় না। আমার শিক্ষার্থীরা এদেশে থেকে দেশমাতৃকাকে ভালোবেসে নিজেদের জীবন নিয়ে লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে।’

নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে উপাচার্য আরও বলেন, ‘তোমারা যারা এই কলেজে নতুন এসেছ- পথ চলা অনেক কঠিন বটে। কিন্তু একথাও ঠিক, আগামী যে কয়টা বছর তুমি পাবে সে কয়টি বছর নিজেকে প্রস্তুত করবে। কারণ এই অনন্য সুযোগ কখনোই পাবে না। আমি অনুরোধ করব- যে বিদ্যাপীঠে তুমি এসেছ সেটিকে জ্ঞান চর্চার অনন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে। এটিই আমাদের স্বপ্ন।’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বলেন, ‘আমাদের সরকার যে ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলেছেন সেটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। ডিজিটাল সুবিধার মধ্য দিয়ে শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে সেটি নয়, এটি একটি দর্শন। এর মধ্য দিয়ে আইসিটিতে পৃথিবীর সেরা ধনী বিল গেটস যে সুবিধা পায় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থী একইরকম ইনফরমেশন পায়। এটিই হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশের সমতার অনন্য দিক। তোমার হাতে যে ডিভাইসটি আছে সেটিতে তুমি গান শোন, বন্ধু খোঁজ, ইউটিউব দেখ, ছবি তোলো কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে এই ডিভাইস দিয়ে তুমি ই-বুক, ই-জার্নাল অ্যাকসেস নিশ্চিত করবে। আমার শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন উচ্ছ্বাস করবে, সংস্কৃতিবান হবে একইসঙ্গে নিয়মিত পড়া লেখা করবে। ক্লাসরুমে আসবে, ই-কনটেন্ট খুঁজবে। নিয়মিত লাইব্রেরিতে যাবে। যে টপিকটি শিক্ষক পড়াল সেটি খুঁজে নেবে। তাহলে তোমার কাক্সিক্ষত জায়গায় তুমি পৌঁছতে পারবে।’

নবীন শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেমিক নাগরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বলেন, ‘প্রযুক্তি ভাবনায় আগামীর বাংলাদেশ তোমার হাতে গড়ে দেবে বলেই পূর্বসূরীরা রক্তস্নাত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অপূর্ব সুন্দর এক দেশ দিয়ে গেছেন। এ এক ভিন্ন চরিত্রের বাংলাদেশ। এ এক অনন্য সুন্দর ভূমি। ১৯৭১ সালে মাত্র ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন আমাদের পূর্বসূরীরা। আজ যে বাংলাদেশে বসে নবীনবরণের উচ্ছ্বাসে তুমি মেতেছ- এইটুকুন সুন্দর সময়ের জন্য আমাদের পিতা-মাতা, ভাই-বোনসহ এই বাংলাদেশের ত্রিশ লাখ মানুষ লুঙ্গি, গেঞ্জি পরে বুকে-পিঠে গেরিলা যুদ্ধ করে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীকে পরাস্ত করে একটি মানচিত্র এঁকেছেন। দুই লাখ মা-বোন নির্যাতন সয়ে সয়ে লাল-সবুজের পতাকা ছিনিয়ে এনেছেন। আমাদের ভালো থাকার জন্য তাঁরা জীবন উৎসর্গ করে এই দেশ আমাদের দিয়ে গেছেন।’

দেশের বিশিষ্ট এই সমাজচিন্তক বলেন, ‘আমাদের এই বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক সময় সংঘাত ছিল। তারা আমাদের ভাই, আমাদের পাহাড়ি বন্ধু। আমরা নিজেরা বসে সেই সংঘাত নিরসন করেছি। আমরা শান্তি চুক্তি করেছি। কারো মধ্যস্থতা গ্রহণ করিনি। অতিসম্প্রতি আমরা একটি পদ্মা সেতু করতে চেয়েছিলাম। বিশ্বব্যাংক বলল আমরা নাকি দুর্নীতি করেছি অর্থ দেবে না। আমরা বিনয়ের সঙ্গে বলেছি অর্থ না দেন তাতে সমস্যা নেই। আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে অর্থ পাঠায়। আমাদের পোশাকশ্রমিকরা দিন-রাত পরিশ্রম করে অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। আমাদের মজুর, কৃষক, শ্রমিক ভাইয়েরা দেশের ভালোর জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেন। তাদের টাকায় আমরা আত্মমর্যাদার সেতু নির্মাণ করেছি। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ নিয়েছি। কিন্তু যুদ্ধে নামিনি। সমুদ্রসীমা বিজয় করে আরেকটি বাংলাদেশ পেয়েছি। ছিটমহল সমস্যা সমাধান করেছি। কারো সঙ্গে সংঘাতে জড়াইনি। বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে মিয়ানমারের লাখো শরণার্থীকে নিজেদের পেটের অর্ধেক খাবার দিয়ে আশ্রয় দিয়েছি। এতে বিশ্বে মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ।’

মিরপুর কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. শরীফ এনামুল কবীর সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আজ একজন দক্ষ উপাচার্যের নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা নিজেদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ফরেইন ক্যাডারসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করছে। সুতরাং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। তারা এগিয়ে যাচ্ছে। সব জায়গায় দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। তোমরাও দেবে। সেভাবেই নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।’

অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এইচ এম মাহবুবুর রহমান, কলেজের বিদ্যোৎসাহী সদস্য মো. আমিনুল ইসলাম আমিন, চিকিৎসক সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মো. জামাল উদ্দিন খলিফাসহ কলেজের শিক্ষক, অভিভাবক, বিভিন্ন কলেজ থেকে আগত আমন্ত্রিক অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও কলেজের শিক্ষার্থীরা।

যাযাদি/ এম

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে