সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যেভাবে 'ফেলুদা' হয়ে উঠলেন

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যেভাবে 'ফেলুদা' হয়ে উঠলেন

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনয় জগতের একজন কিংবদন্তি। অসুস্থ হয়ে বেশ কিছুদিন কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এরপর তার অবস্থার বেশ কয়েকবার পরিবর্তন হলেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানলেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। ৮৫ বছর বয়সী এই অভিনেতা গত ৬ই অক্টোবর করোনাভাইরাসের রিপোর্ট পজিটিভ প্রমাণিত হওয়ার পরে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

চলচ্চিত্রের রূপালি পর্দায় ৬০ বছরের ওপর অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সফল মঞ্চাভিনেতা, নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক, কবি এবং এক্ষণ নামে সাহিত্য ও সংস্কৃতি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক মি. চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম পশ্চিমবঙ্গে নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে ১৯শে জানুয়ারি ১৯৩৫ সালে।

তাদের পরিবারের আদিবাড়ি ছিল বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় শিলাইদহের কাছে কয়া নামে একটি গ্রামে। তার পিতামহের সময় থেকে তারা কৃষ্ণনগরে বসবাস শুরু করেন।

কৃষ্ণনগরেই ছিল তার স্কুলের প্রাথমিক লেখাপড়া। পরে কাজের সুবাদে তার বাবা কলকাতায় চলে এলে পরবর্তীতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা নেন কলকাতাতেই।

অভিনয়ের প্রতি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মি. চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন কৃষ্ণনগরে বেশ উন্নতমানের নাট্যচর্চ্চা হতো তার ছেলেবেলায়। তার বাবা সেখানে শৌখীন নাট্য দলে নাটক করতেন, বাড়িতেও কবিতা আবৃত্তি এবং নাটকের একটা আবহ ছিল।

"শৈশবকালে আমরাও বাড়িতে তক্তাপোষ দিয়ে মঞ্চ তৈরি করে, বিছানার চাদর দিয়ে পর্দা খাটিয়ে ভাইবোন ও বন্ধুবান্ধবরা মিলে ছোট ছোট নাটিকার অভিনয় করতাম। বাড়ির বড়রাও প্রচুর উৎসাহ দিতেন। ক্লাস ফোর ফাইভে পড়ার সময় থেকেই আমার নাটকের নেশা প্রচুর বেড়ে গেল," বলেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

স্কুলের মঞ্চে প্রথম অভিনয় করেছিলেন ইংরেজি একটি নাটক- 'স্লিপিং প্রিন্সেস'। যার জন্য পদক ও মেডেলও পেয়েছিলেন তিনি।

কলেজে বাংলা অনার্স নিয়ে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় নাট্যব্যক্তিত্ব শিশির কুমার ভাদুড়ীর সাথে যোগাযোগ হয়েছিল তার। তখন থেকেই অভিনয়কে জীবনের মূল লক্ষ্য করে নেবার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার ন্যাটাভিনয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

"বি.এ. ফাইনাল ক্লাসে পড়ার সময়ই আমি মনস্থির করে ফেলেছিলাম- আমি অভিনয় করব, আর কিছু করব না," বলেছিলেন তিনি।

অপুর সংসার

চলচ্চিত্রে তার প্রথম আত্মপ্রকাশ সত্যজিত রায়ের 'অপুর সংসার' ছবিতে ১৯৫৯ সালে। সত্যজিত রায়ের ১৪টি ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এবং পরিচালক সত্যজিত রায়ের সাথে তার একটা গভীর বন্ধন গড়ে উঠেছিল। সত্যজিত রায়কে নিয়ে মি. চট্টোপাধ্যায় "মানিকদার সঙ্গে" নামে একটি বইও লিখেছিলেন । তার ইংরেজি অনুবাদটির নাম "দা মাস্টার অ্যান্ড আই"।

সত্যজিত রায় যেমন ছবির খুঁটিনাটির ব্যাপারে খুবই পার্টিকুলার ছিলেন, তার সঙ্গে কাজ করা অভিনেতাদেরও তিনি একই ভাবে তৈরি করে নিতেন। তার ঘনিষ্ঠ এবং তথ্যচিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার বিবিসিকে বলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের লাইব্রেরিতে একটা পুরনো খাতা তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন যেটি ছিল চারুলতা ছবির শুটিংয়ের সময়কার।

রবীন্দ্রনাথের সময় যেধরনের হাতের লেখার চল ছিল, তা ফুটিয়ে তোলার জন্য সেখানে সাদা কাগজে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কীভাবে অসংখ্যবার সেধরনের লেখার অনুশীলন করেছিলেন তা দেখা যায় বলে বিবিসিকে বলেন মি. দস্তিদার।

পথের পাঁচালী

সত্যজিত রায় তার প্রথম ছবি 'পথের পাঁচালী' করার পর যখন দ্বিতীয় ভাগ 'অপরাজিত' করবেন বলে কিশোর অপুর চরিত্রের জন্য একজনকে খুঁজছিলেন, তখন মি. রায়ের পরিচিত একজন, যিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে চিনতেন তিনি তাকে নিয়ে যান সত্যজিত রায়ের কাছে। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মি. চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন তিনি তখন এম.এ. পড়েন।

"আমি তখন ওই কিশোর বয়সের অপুর পক্ষে বড়। আমাকে দেখামাত্র উনি বলেন- এহে আপনি তো বড্ড বড় হয়ে গেলেন। যাই হোক, তার অনেক পরে যখন উনি তৃতীয় ভাগ- অপুর সংসার- করবেন বলে মনস্থির করেন, যেখানে যুবক অপুকে দরকার, তখন আমাকে খবর দেন। আমি যাই এবং আরও অনেক পরে জেনেছিলাম যে মোটামুটি আমাকে দেখার পর উনি ঠিক করেছিলেন, তাহলে যুবক অপুর জন্য একজনকে পাওয়া যাবে এবং উনি স্থির করেন উনি তৃতীয় ভাগও করবেন।"

সত্যজিত রায় ছাড়াও মৃণাল সেন, তপন সিংহসহ বহু নামী পরিচালকের প্রায় দুইশয়ের মত ছবিতে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এর মধ্যে তার খুবই জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে আছে মৃণাল সেনের 'আকাশ-কুসুম', তপন সিংহের 'ক্ষুধিত পাষাণ', 'ঝিন্দের বন্দী', অজয় করের 'অতল জলের আহ্বান', 'সাত পাকে বাঁধা', 'পরিণীতা', আশুতোষ বন্দোপাধ্যায়ের 'তিন ভুবনের পারে' ইত্যাদি।

অনেক ছবিতে এক সাথে অভিনয় করেছেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক উত্তম কুমার এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। একসাথে তাদের পর্দায় দেখা যাক বা না যাক বাঙালি সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে চরম বিভক্তি ছিল তাদের প্রিয় নায়ক কে তা নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের সিনেমাভক্তদের একদল মনে করতেন 'জনতার মহানায়ক' একজনই - তিনি উত্তম কুমার। আর প্রতিপক্ষ দলের পরিষ্কার রায় ছিল বুদ্ধিজীবী মননের চলচ্চিত্রে 'শেষ কথা' একজনই - তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

কোভিড-১৯য়ে আক্রান্ত হবার আগে পর্যন্ত বড় ও ছোট পর্দার নানা ছবিতে তিনি কাজ করে গেছেন। সাম্প্রতিককালের বহু পরিচালকের ছবিতে তার অভিনীত অনেক ছবি খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

সত্যজিত রায়ের বিভিন্ন ছবির তিনি সফল নায়ক তো বটেই, কিন্তু সত্যজিত রায়ের 'ফেলুদা' চরিত্রের সুবাদে মানুষের কাছে তার আরেকনাম হয়ে গিয়েছিল 'ফেলুদা'।

সত্যজিত রায়ের পরিচালনায় ফেলুদা বা অন্যান্য চরিত্রে অভিনয়ের চেয়েও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অনেক বেশি কাজ করেছিলেন অন্যান্য পরিচালকদের ছবিতে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগের প্রধান মধুজা মুখার্জী বলছিলেন সৌমিত্র চ্যাটার্জীর একটা বিরল দক্ষতা ছিল যে একই সময়ে একই সাথে সত্যজিত রায়ের মত পরিচালক এবং অন্য পরিচালকের ছবিতে তিনি ভিন্ন ধরনের চরিত্র চিত্রণ করতে পারতেন।

মঞ্চ অভিনয় এবং নাট্য নির্দেশনাতেও দারুণ সফল ছিলেন মি. চট্টোপাধ্যায়। বিবিসি বাংলাকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন নাটক ছিল তার প্রথম প্রেম। তাই সিনেমার কাজে ব্যস্ত থাকার পরেও তিনি ছুটে যেতেন মঞ্চ নাটকে অভিনয় করতে। তিনি বলেছিলেন পেশাদার রঙ্গমঞ্চে তার নাট্যজীবন তিনি শুরু করেছিলেন কলকাতার স্টার থিয়েটারে ১৯৬৩ সালে 'তাপসী'নাটকে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে।

তিনি রূপালি পর্দার পাশাপাশি তার নাটকের প্রেমকে সজীব রাখতে অনেক পরিশ্রম করেছেন। শ্যুটিং শেষ করে দৌড়েছেন মঞ্চে অভিনয় করতে। তিনি বলেছিলেন তখন চলচ্চিত্রে তিনি এত ব্যস্ত নায়ক যে থিয়েটারের জন্য সময় বের করা তার জন্য খুবই কষ্টকর ছিল। তার জন্য "অনেক কাঠখড় পোড়াতে" হয়েছে তাকে।

"থিয়েটারের জন্য আমার নেশাই বলুন বা ভালবাসাই বলুন, সেটা এত প্রবল ছিল যে সেই কষ্ট আমি খুবই সানন্দে বরণ করে নিয়েছিলাম,"বলেছিলেন মি. চট্টোপাধ্যায়। কর্মজীবনের শেষ বেলা পর্যন্ত তিনি মঞ্চ অভিনয় ছাড়েননি।

তার নাট্যরূপ দেওয়া গোয়েন্দা কাহিনী "টিকটিকি" তিনি বিবিসি বাংলা স্টুডিওতে রেকর্ড করেছিলেন ১৯৯৭ সালে।

নাটক ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম প্রেম আর দ্বিতীয় প্রেম ছিল সাহিত্য। তিনি এবং নির্মল আচার্য ১৯৬১ সালে তৈরি করেছিলেন এক্ষণ নামে একটি সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা। মননশীল পাঠকরা ওই পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করে থাকতেন। পত্রিকার নামকরণ করেছিলেন সত্যাজিত রায়।

মি. চট্টোপাধ্যায় ছিলেন পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক। তিনি সম্পাদনার কাজ করতেন, লিখতেন আবার বিজ্ঞাপনও যোগাড় করার জন্য ছুটে বেড়াতেন সেই সময়ের মহাব্যস্ত নায়ক, বিবিসি বাংলাকে বলেছেন এক্ষণ পত্রিকার পরিপূরক আরেকটি পত্রিকা অনুষ্টুপের সম্পাদক অনিল আচার্য।

পত্রিকার জন্য যেমন সিরিয়াস প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি, তেমনই লিখেছেন অসংখ্য কবিতা। প্রকাশিত হয়েছে তার কবিতার আর নাটকের বই।

অভিনয়ে তার অবদানের জন্য দেশি বিদেশি অজস্র পুরস্কার পেয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ২০০৪ সালে পেয়েছেন ভারত সরকারের পদ্মভূষণ সম্মান, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন দুবার, এবং সিনেমায় তার সারাজীবনের অবদানের জন্য ২০১২ সালে পেয়েছেন ভারত সরকারের সবোর্চ্চ চলচ্চিত্র খেতাব 'দাদাসাহেব ফালকে সম্মাননা'।

নাট্যশিল্পে তার অবদানের জন্যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ফরাসি সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ১৯৯৯ সালে পান সম্মানজনক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি Commandeur de l' Ordre des Arts et des Lettres।তিনিই প্রথম ভারতীয় অভিনেতা যাকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়। ২০১৭ সালে তিনি ফরাসি সরকারের বেসামরিক সম্মাননা লিজিয়ন অফ অনারে ভূষিত হন।

ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্যাথরিন বার্জ তার জীবন নিয়ে তৈরি করেছিলেন তথ্যচিত্র 'গাছ'।

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনাবসানের মধ্যে দিয়ে চলচ্চিত্র জগতের বিশাল সেই 'গাছ' বা মহীরুহের পতন ঘটল। সূত্র: বিবিসি বাংলা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2020

Design and developed by Orangebd


উপরে