শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১

যে কারণে এ বছর জেলায় জেলায় ডেঙ্গু রোগী বাড়বে

পাঠান সোহাগ
  ০৫ মে ২০২৪, ২২:২৪
ছবি : যায়যায়দিন

দেশে ডেঙ্গু রোগী সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে । এ বছরের প্রথম চার মাসে ডেঙ্গু রোগী ও ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরেও ছাড়িয়ে গেছে । গত বছর ২০২৩ সালের প্রথম চার মাস রোগী ছিল ৯৮৬ জন ও মারা যায় ১১ জন । কিন্তু এ বছরের প্রথম চার মাসে হাসপাতালে রোগী হয়েছে ২ হাজার ২১০ জন এবং মারা গেছে ২৪ জন । যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি রোগী ভর্তি ও মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে । এছাড়া চলতি মাসে ৫ দিনে ৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং মারা যায় তিন জন ।

তবে বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এবারে দেশে বিভিন্ন জেলাগুতে আগের তুলনায় রোগীর বাড়বে । কারন বিভিন্ন জেলাায় লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে । আগে শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক রোগী পাওয়া যেত এখন জেলাগুলোতেও রোগী পাওয়া যাচ্ছে ।

কীটতত্ত্ববিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার যায়যায়দিনকে বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার দেশের কিছু কিছু জেলাতে ডেঙ্গু মশা বাড়বে । তার মধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বড়গুনা, বরিশাল, চাঁদপুর ও গাজীপুর জেলায় এবার ডেঙ্গু মশার উপস্থিতি বেশি ।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বড়গুনা, বরিশাল, চাঁদপুর ও গাজীপুর জেলার কিছু কিছু এলাকার কিছু বাড়িকে এডিস মশা পাওয়া যায় । এ সব মশা বংশ বিস্তার করবে । সমানে বৃষ্টির মৌসুম, যেখানে সেখানে পানি জমে থাকবে । ওই সব স্থানে মশা ডিম পারবে । লার্ভা হবে, পরে পূণার্ঙ্গ মশা হবে । এখনি সময় যে সকল জেলা আমরা চিহ্নিত করেছি, সে সকল জেলার বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে মশার লার্ভা ও প্রজনন স্থল ধ্বংস করতে পারলে মশা কমবে । নতুবা সে সব জেলায় মশা বাড়বে, রোগীও বাড়বে ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্য তথ্য ইউনিটের (এমআইএস) ইনচার্জ ডা. মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জানান, এ বছর এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রোগী পাওয়া গেছে জানুয়ারিতে ১ হাজার ৫৫ জন । এপ্রিলে ছিল বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫০৪ জন রোগী । তবে এ বছরের এপ্রিলে মৃত্যু হয় দৃই জনের। । এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম । এর আগে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছিল জানুয়ারিতে ১৪ জন । এরপর মার্চে পাঁচজন ও ফেব্রুয়ারিতে তিনজন, এপ্রিলে ২ জন মারা গেছে । পাশাপাশি চলতি মাসের পাঁচ দিনে তিন জনের মৃত্যু হয় ।

কবিবুল বাশার বলেন, এখন থেকে মশা বাড়তে থাকবে । এ বছরের আগস্ট মাসে সবচেয়ে বেশি মশা থাকে, সে সাসে হাসপাতালে সবচেয়ে রোগী পাওয়া যাবে । সে সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ি, মিরপুর ও মুগদা এলাকায় বেশি রোগী পাওয়া যাবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম তথ্য থেকে জানা যায়, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকার সরকারি—বেসরকারি হাসপাতালে ৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছে । এ সময় কেউ মারা যায়নি । এ নিয়ে এ সব হাসপাতালে মোট রোগী ভর্তি হয়েছে ৭৬৪ জন এবং মারা গেছেন ১৬ জন । এছাড়া ছাড়পত্র নিয়েছেন ৭২০ জন । বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ৫০ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায়, ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু ও সন্দেহজনক ডেঙ্গু নিয়ে ২ হাজার ২৮৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন । এর মধ্যে ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেছেন ২ হাজার ১৫২ জন । বর্তমানে সারা দেশে ভর্তি রয়েছেন ১০৯ জন । পাশাপাশি মারা গেছেন ২৭ জন । হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ৬১ শতাংশ বা ১ হাজার ৩৯৫ জন পুরুষ এবং ৩৯ শতাংশ বা ৮৯৩ জন মহিলা । মোট মৃত্যুও ৪৮ শতাংশ বা ১৩ জন পুরুষ এবং ৫২ শতাংশ বা ১৪ জন মহিলা ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৫৫ জন, ফেব্রুয়ারী মাসে ৩৩৯ জন, মার্চ মাসে ৩১১ জন, এপ্রিল মাসে ৫০৪ জন, মে মাসের প্রথম পাঁচ দিনে ৭৯ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন । সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা মহানগরের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছে ৬ জন ডেঙ্গু রোগী । এর বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোতে ২১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন । তাদের মধ্যে চট্টাগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৩ জন, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে ২ জন কেও চার জন, এবং ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে ১ জন করে ২ জন রোগী রয়েছেন । এ সময় কেউ মারা যায়নি ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে । এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয় । ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি ১ হাাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয় ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছরে শুরুর দিক থেকেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর খুবই তৎপর । মশার আবাস ও প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করতে পারলেই এডিস মশা নিমূল করা যাবে । এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করতে প্রতিনিয়ত অভিযান চলছে । তবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রস্তুত রয়েছে ।

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে—নজির আহমেদ যায়যায়দিনকে বলেন, এখন আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে । মে মাসকে খুবই গুরত্ব দেওয়া । কারন এ মাসে দেশে বৃষ্টিপাত হবে । বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকবে । জমানো পানিতে মশা জন্ম নিবে । এডিস মশার লার্ভা যদি ধ্বংস না করা যায় তাহলে মশা বাড়বে । সিটি করপোরেশন সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো খুবই যত্ন সহকারে এ মাসে কাজ করা উচিত । আর এই তিন চার মাসে তথ্য দেখে পুরো বছরে চিত্র আনা যাবে না । তকে রোগী গত বছরের চেয়ে বেশি হবে কিনা সেটা বলা যাচ্ছে না ।

যাযাদি/ এস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
X
Nagad

উপরে