শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

শান্তিগঞ্জ প্রেসক্লাব: আস্থা-ভালোবাসায় পথচলার পনেরো বছর

ইয়াকুব শাহরিয়ার
  ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৩:৩৩

বলা হয়ে থাকে সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এই স্তম্ভের উল্লেখযোগ্য উপাদান হচ্ছেন ‘খবরিয়া’ মানুষগুলো। তাদেরকে আমরা সাংবাদিকও বলে থাকি। যারা ঝড়-ঝাপটা, বন্যা-আফাল, বজ্রপাত-বৃষ্টিপাতসহ মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে মানুষের সামনে বস্তুনিষ্ট সংবাদ পরিবেশন করে থাকেন। এসব সামনের সারির বা ‘ফোকাস’ যুদ্ধাদের নিয়ে যে সংগঠন গঠিত হয় সেটিই হচ্ছে প্রেসক্লাব। যেখানে এসে বঞ্চিত মানুষ তাদের কণ্ঠস্বরে জোর পান, অধিকারহীনেরা অধিকারের কথা বলেন, পাওয়া-না পাওয়ার কথা তুলে ধরতে পারেন সব শ্রেণির মানুষ, নিজেদের আশা-নিরাশার গল্প শোনাতে পারেন সাংবাদিকদের গলায়। অস্তিত্বের অসংখ্য সংকটে জোড়াতালি দিয়ে জাতি যখন ভগ্ন হৃদয়ে দাঁড়ায় টিকে থাকার রাজপথে, গণমাধ্যম তখন আশ্রয়ের বাতিঘর হিসেবে আবির্ভূত হয়। সংকট সংগ্রামে পিঠ পেতে দাঁড়ায় জাতি রক্ষায়। সম্মুখ যোদ্ধাদের মত পালন করে সক্রিয় ভূমিকা। গণমাধ্যমে কাজ করা শব্দ শ্রমিকদের এটাই বড্ড গৌরবের আর অহংকারের বিশাল মঞ্চ। মানুষ, সমাজ, মানবতা আর সত্য প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে পারার বিশাল প্লাটফর্ম হচ্ছে এ গণমাধ্যম বা সাংবাদিকতা পেশা। সকল মত আর পথকে এক সূতায় বেঁধে আমরা (গণমাধ্যমকর্মীরা) সমষ্টির দিকে এগিয়ে যাই। এই বিশাল সমষ্টিকে নিয়ে কাজ করতে করতে যখন হাঁপিয়ে যাই তখন দম ফেলবার দরকার পরে। এমন সময় আমরা যে জায়গাটির কথা প্রথমেই অনুভব করি সেটি হচ্ছে প্রেসক্লাব। প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের জন্য আনন্দের এক অঘোষিত বীজতলা। মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য তো প্রেসক্লাব আশ্রয়ের আরেক নাম। শহর কিংবা নগর সাংবাদিকতায় প্রেসক্লাব বিষয়টা খুবই সহজলভ্য হলেও মফস্বল সাংবাদিকতায় তা খুবই দুরূহ ব্যপার। যাদের এ ক্লাব নেই তারাই শুধু বুঝেন কতটক দুরূহ। এদিক থেকে শান্তিগঞ্জ উপজেলার সাংবাদিকেরা বেশ সৌভাগ্যবান বটে। আর এ সৌভাগ্যের বরপুত্র হচ্ছেন সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি। কারণ তিনিই আমাদের ক্লাবের ভবনের জন্য ৩০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলেন। এখনো কাজ চলমান আছে। আমাদেরকে অতিমূল্যবান চার শতক জায়গা দিয়েছেন তেঘরিয়া গ্রামের গয়ানাথ ওরফে তারানাথের ছেলে গোপেন্দ্র কুমার তালুকদার, অতুল কৃষ্ণ তালুকদারসহ তাদের পরিবার। আমরা সাবেক মন্ত্রী মান্নান মহোদয় ও মুক্তিযুদ্ধে শহিদ পরিবার, স্বর্গীয় তারানাথ বাবুর পরিবারের প্রতি চির কৃতজ্ঞ। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল প্রেসক্লাবের জায়গা ও নির্মাণাধীন ভবন নিয়ে ঢালবাহানা করার চেষ্টা করলেও তা সফল হয় নি। এখনো মান্নান মহোদয়ের দেওয়া কাজ চলমান। আমরা আশাবাদী তিনি অচিরেই আমাদের সকল কাজ শেষ করার ব্যবস্থা করে দেবেন।

হাওর-বাওর, পীর-ফকির, মাছ-পাথর, গান-কবিতা আর ভাটির দেশ সুনামগঞ্জ। জেলার সদর উপজেলা থেকে ২০০৬ সালে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা নামে পৃথক একটি উপজেলা পাই আমরা। তৎকালীন সময় সিনিয়র সাংবাদিক, মোহনা টিভির সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি কুলেন্দু শেখর দাশ ও দৈনিক কাজির বাজারের প্রতিনিধি এম এম ইলিয়াছ আলী তখন দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে সুনামগঞ্জ শহরে গিয়ে পত্রিকায় পাঠাতেন। এরপর কাজি জমিরুল ইসলাম মমতাজ, এইচ এম মোশাহিদ আহমদ, আলমগীর হোসেন, এম জে এইচ জামিল, মহিম উদ্দিন মহিম গণমাধ্যমে কাজ শুরু করেন। যেহেতু প্রয়োজনীয়তাই উদ্ভাবনের জনক তাই প্রেসক্লাবের কমিটি গঠন জরুরি হয়ে পড়ে। ২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তারিখে আত্মপ্রকাশ করে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাব। সেদিন যে ক্লাব আত্মপ্রকাশ করেছিলো সে ক্লাবের প্রথম কমিটির সভাপতি ছিলেন কুলেন্দু শেখর দাশ। সহ-সভাপতি ছিলেন- এইচ এম মোশাহিদ আহমদ, সাধারণ সম্পাদক কাজি এম জমিরুল ইসলাম মমতাজ, সহ-সাধারণ সম্পাদক এমজেএইচ জামিল, অর্থ সম্পাদক এম এম ইলিয়াছ আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হোসাইন, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুল হাই আযাদ সেলিম ও দপ্তর সম্পাদক- আবদুল বারিক। যত সহজ করে এই লেখাটি লিখে ফেলেছি, পথ চলা তত সহজ ছিলো না। সদ্য জন্ম নেওয়া এক উপজেলায় হাসপাতাল, উপজেলা পরিষদ ভবন, রেজিস্ট্রি অফিস, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ইত্যাদি কিছুই ছিলো না। শুধু নাই আর নাই। নাইয়ের রাজত্বে খুব সংগ্রাম করে সাংবাদিকতা চালিয়ে যেতে হয়েছিলো। বর্তমানের মতো এতো ইন্টারনেট সহজলভ্যতাও ছিলো না। এমন বৈরি পরিবেশে একটি পেশার প্রতি খুব বেশি ভালোবাসা না থাকলে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ (শান্তিগঞ্জ) উপজেলায় সংবাদিক পরিবার বোধহয় এতো সমৃদ্ধ হতো না। এরপর কত চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে৷ সময়ের ব্যবধানে কুলেন্দু শেখর দাস সুনামগঞ্জ স্থিত হয়েছেন। সভাপতি হয়েছেন কাজি এম জমিরুল ইসলাম মমতাজ। ২০০৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় দৈনিক সংবাদ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতায় নাম লেখান সোহেল তালুকদার ও ২০১০ সালে সাপ্তাহিক সুনামকণ্ঠ হোসাইন আহমদ । এর ভিতরে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ (শান্তিগঞ্জ) উপজেলায় সাংবাদিকতায় অনেকে নাম লেখিয়েছেন। সময়ের ঘেরাটোপে অনেকে ঠিকে থাকলেও অনেকেই আবার পথের মাঝেই হারিয়েছেন তাদের পথ।

উপজেলার প্রতিষ্ঠাকালীন এ প্রেসক্লাবের বর্তমান কমিটির সভাপতি হিসেবে আছেন কাজি এম জমিরুল ইসলাম মমতাজ। তিনি বর্তমানে এনটিভি ইউরোপ, দৈনিক মানবকণ্ঠ ও দৈনিক উত্তরপূর্বে কর্মরত আছেন। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন সোহেল তালুকদার। তিনি কাজ করছেন- দৈনিক যায়যায়দিন, দৈনিক সিলেট মিরর ও দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। সাংগঠনিক সম্পাদক হোসাইন আহমদ কাজ করছেন দৈনিক ভোরের কাগজ ও দৈনিক সুনামকণ্ঠে। অর্থ সম্পাদক ইয়াকুব শাহরিয়ার কাজ করছেন দৈনিক আমার সংবাদ, দৈনিক জাগ্রত সিলেট ও দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। দপ্তর সম্পাদক এম এম ইলিয়াছ আলী লিখছেন দৈনিক কাজির বাজারে, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সালেহ্ আহমদ হৃদয় কাজ করছেন দৈনিক একাত্তরের কথায়, ক্রীড়া সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক জামিউল ইসলাম তুরান কাজ করছেন দৈনিক তরুণ কণ্ঠ ও দৈনিক সুনামগঞ্জের সময়ে, সদস্য এইচ এম মোশাহিদ আহমদ কাজ করছেন দৈনিক মানবজমিনে, নাহিদ আহমদ লিখছেন দৈনিক ইত্তেফাকে ও নোহান আরেফিন নেওয়াজ লেখালেখি করছেন দৈনিক খোলা কাগজ ও দৈনিক সুনামগঞ্জ প্রতিদিনে। আস্থা ও ভালোবাসার জায়গা থেকে এখনো সম্মানের সাথে কাজ করে যাচ্ছি আমরা।

সড়ক, হাওর, বন্যা, খড়া আরও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ পিঠাপিঠি করে শুয়ে পড়ে আমাদের জেলায়। তবু আমাদের কাজ করে যেতে হয়। কলমের প্রতিটি কালো হরফে ধীরে ধীরে লিখা হয় বিজয়ের ইতিহাস। সবকিছুতেই বদলে যাচ্ছে সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় গণমাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে ভিন্ন মতের ও পথের বহুরৈখিক মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে। সংকরজাতের মানুষের সাথে মিশতে পারার দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে আমাদের। পেয়েছি বহু পথের খোঁজ। সাংবাদিকতা রাজনীতির কাছাকাছি বিষয়। উপজেলার রাজনীতির সারমর্ম আছে প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের কাছে৷ তবু তারা সকলের বন্ধু, সকলের জন্য সমান। সম্প্রদায়ের উর্ধ্বে; অসাম্প্রদায়িক। সকলের আস্থার মূর্ত প্রতিক। উপজেলায় যে কোনো ঘটনা ঘটলে মানুষ এ উপজেলার মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীদের টাইমলাইন খুঁজতে দেখেছি বহুবার। এটি আমাদের উপর আস্থার শতভাগ প্রমাণ। উপজেলার সব রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনের বিশ্বাসের জায়গা হচ্ছে শান্তিগঞ্জ প্রেসক্লাব। সরকারি, বেসরকারি, আধা সরকারি চাকুরিজীবী বা বিভিন্ন বাহিনীর লোকজনও পরম বিশ্বস্ততা আর আস্থা নিয়ে একবার হলেও ‘মুখর’ দেন শান্তিগঞ্জ প্রেসক্লাবে। আমরা জনগণের কথা লিখি, আমাদের কণ্ঠ ও কলমে ভাস্বর হয় তাদের কথা আর অধিকারের প্রতিচ্ছবি তাই এখনো তাদের আস্থা আছে আমাদের উপর৷ টিক এ কারণেই এ প্রতিষ্ঠান ও আমাদের ওপর এখনও এলাকার মানুষ তথা জনতা, জনপ্রতিনিধিদের আস্থা ও ভরসা অম্লান। আমরাও ঠিকে থাকতে চাই আপনাদের ভালোবাসা নিয়ে। সকলের সহযোগিতা কামনা করছি। এগিয়ে যেতে চাই আরও বহু পথ। পনেরো বছরের পথ চলাকে আরো মসৃণ করে শতবর্ষ পাড় করে নিয়ে যেতে চাই।

লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে