শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১

মৌসুমী ফল কেন খাব, কি প্রয়োজন?

তরিকুল ইসলাম মাসুম, এমএসসি
  ০১ জুলাই ২০২৪, ২৩:৪৫
আপডেট  : ০২ জুলাই ২০২৪, ১৩:৫১
ফাইল ছবি

“ফলের রাজা আম, বেশী করে খান” এটি একটি উপদেশ। শুধু আম নয়, মৌসুমী ফল খাওয়ার গূরুত্ব অপরিসীম। সৃষ্টিকর্তা তাইতো নানান মৌসুমে নানান ফল আর ফুলের সমাহার ঘটান। পরিমিত ফল প্রতিদিন খেলে যেসব উপকার হয়ঃ

ক. দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়

খ. শরীরের ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ হয়

গ. ভিটামিন এর অভাব পূরণ হয়

ঘ. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে

ঙ. ডায়াবেটিকস এর ঝুকি কমে যায়

চ. লৌহ ও খনিজ লবণের ঘাটতি থাকে না প্রভৃতি।

আমাদের দেশে সহজলভ্য এমন ফল নিয়ে আলোচনা করব:

আম

ফলের রাজা আম, আর আম খাওয়ার মৌসুমে আমের ঘ্রাণ পাওয়া যাবে না এমন বাড়ির দেখা ভার। আমগাছ বাংলাদেশের শহর কিংবা গ্রাম, প্রতিটি বাড়িতেই দেখা যায়। পুষ্টিগুনে ভরপুর আম আমাদের শুধু দেশেই নয়, অন্যান্য দেশেও নানাভাবে উপযোগিতার শীর্ষে। আম আচার, জেলি, মোরব্বা, শরবত করে খাওয়া যায়। প্রক্রিয়াজাত করে আমকে অনেকদিন রেখেও খাওয়া যায়। জনশ্রুতিমতে, প্রায় ছয় হাজার বছর আগে চাষ শুরু হওয়া আম রাজশাহী অঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রসিদ্ধ। আমের ইংরেজি নাম Mango এবং বৈজ্ঞানিক নাম Mangifara indica. কিছু কিছু আম ব্যতীত প্রায় সকল আমই সুস্বাদু। পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ প্রতি ১০০ গ্রাম আমের মধ্যে আছে ০.৫ ভাগ প্রোটিন, ০.১ ভাগ ফ্যাট, ০.৫ ভাগ খনিজ পদার্থ, ১২ ভাগ কার্বোহাইড্রেট, ০.০১ ভাগ ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস। এছাড়াও লৌহ, ভিটামিন এ, বি এবং সি। অর্থকরী ফসল হিসেবে আমের এখন ব্যাপক জনপ্রিয়।

জাম

জাম একটি চমৎকার স্বাদের বিশেষ ধরণের ফল, যা ঔষধী ফল হিসেবেও বেশ পরিচিত। কেননা, জাম রক্তের চাপ এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও চীনে জনপ্রিয় ফল হিসেবে এর খ্যাতি রয়েছে। বাংলাদেশের সর্বত্রই জাম বেশ জনপ্রিয় এবং অর্থকরী ফসল হিসেবেও অনেকে জাম চাষ করেন। এর ইংরেজি নাম Java Plum এবং বৈজ্ঞানক নাম Szzzgium cumir. সকল ধরণের মানুষের জন্য জাম অনেক উপকারী। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ এবং সি পাওয়া যায়। পরিপক্ক ও পুষ্টিগুণ সম্পন্ন প্রতি ১০০ গ্রাম জামে শতকরা ১৫.৬ ভাগ শর্করা, ০.২৫ ভাগ স্নেহ পদার্থ, প্রোটিন ০.৭৫ ভাগ, ১৯ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ১৭ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৭৯ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ৭৪ গ্রাম এবং লৌহ থাকে। টক ও মিষ্টি স্বাদযুক্ত জামের রস রক্তকে ফিলট্রেট করতে সহায়তা করে।

কাঁঠাল

জাতীয় ফল কাঁঠাল, যার ইংরেজি নাম Jack fruit এবং বৈজ্ঞানিক নাম Artocarepas heterophzllus. মাটির উপরিভাগ থেকে গাছের সরু ডাল পর্যন্ত যেকোন স্থানে কাঁঠালের মুচি (ফুল) হয়, যা পরিণত হয়ে বৃহৎ কাঁঠালে রূপ নেয়। কাঁঠাল রসালো ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ মিষ্টি ও সুস্বাদু ফল হিসেবেই সবার কাছে পরিচিত। কাঁঠাল পাতা ছাগলের প্রিয় খাবারের মধ্যে অন্যতম। পুষ্টিগুণসম্পন্ন প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁঠালে জলীয় অংশ ৭৭ ভাগ, ২ ভাগ প্রোটিন, ১ ভাগ স্নেহ, ০.৮ ভাগ খনিজ লবণ, আঁশ ১.২ ভাগ, প্রায় ১৯ ভাগ শর্করাসহ লৌহ, ফসফরাস এবং ক্যালসিয়াম থাকে। অর্থকরী ফসল হিসেবে অনেকেই কাঁঠালের চাষ করে থাকেন গ্রামাঞ্চলে।

কলা

বারমাস পাওয়া যায় এমন একটি ফল কলা, তবে গ্রীষ্মকালের কলার চাহিদা ব্যাপক। পার্বত্য অঞ্চল ছাড়াও বরিশাল এবং ঝিনাইদহ কলা চাষের জন্য বিখ্যাত। কলা মূলত দু'ধরনের হলেও বিভিন্ন জাতের কলা এদেশে চাষ হয়। তরকারি হিসেবে কাঁচাকলা (কাঁচকলা নামে সমধিক পরিচিত) বেশি জনপ্রিয়, আর পাঁকা কলা হিসেবে সবরি, চিনি চম্পা ও সাগরকলাই বহুল পরিচিত। কলার ইংরেজি নাম Banana এবং বৈজ্ঞানিক নাম Musa Species.

কলাতে শতকরা ১.৪ ভাগ প্রোটিন, ০.২ ভাগ ফ্যাট, ৩৭ ভাগ শর্করা, ০.০১ ভাগ ক্যালসিয়াম, ০.০৫ ভাগ ফসফরাসসহ ভিটামিন বি, সি এবং লৌহ থাকে। এক কেজি পাঁকা কলায় প্রায় ১৫০০ ক্যালরি শক্তি থাকে। কলা নিয়ে একটি জনপ্রিয় গান রয়েছে-

“আমার দয়াল বাবা, কলা খাবা - গাছ লাগায়ে খাও,

পরের গাছে হাত দিও, কেন মিটমিটাইয়া চাও বাবারে...।

পেয়ারা

পেয়ারা কাঠবিড়ালির প্রিয় খাবার! তাই বলে আমাদের কম প্রিয় নয়। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ এই ফলটি নিয়মিত খাওয়া প্রয়োজন। এটি বর্তমানে দেশের গ্রামে-শহরে সর্বত্রই চাষ হয়। সহজলভ্য এই ফলটি বরিশাল ও চট্রগ্রাম অন্ঞ্চলে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। পেয়ারা প্রাপ্তির প্রধান মৌসুম বর্ষাকাল। এর ইংরেজি নাম Guava এবং বৈজ্ঞানিক নাম Pisidiune guava. প্রতি কেজি পেয়ারায় ৬৬০ ক্যালরি শক্তি থাকে এবং শতকরা ১৪.৫ ভাগ কার্বোহাইড্রেট, ১.৫ ভাগ প্রোটিন, ০.২ ভাগ ফ্যাট, ০.৮ ভাগ খনিজ, ০.০৪ ভাগ ফসফরাসসহ লৌহ, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি এবং সি পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যের জন্য পেয়ারা বেশ উপকারী ফল। রক্তের প্রবাহমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পেয়ারা এবং পেয়ারা পাতার উপকার লক্ষ্যণীয়। তাই সকলে নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণে মৌসুমী ফল খাওয়ার চেষ্টা করি, অন্যদেরকে সচেতন করি।

কমলা

লেবু জাতীয় ফল কমলা উপমহাদেশের জনপ্রিয় ফল ও পথ্য হিসেবে সুপরিচিত। কথিত আছে, ভাস্কো দ্য গামা এই ফলটি ভারত থেকে ইউরোপে নিয়ে গিয়েছিলেন। টক, মিষ্টি ও ম্যান্ডারিন কমলার মধ্যে মিষ্টি জাতীয় কমলার চাহিদাই বেশি। কমলার ইংরেজি নাম Mandarin orange or Mandarine এবং বৈজ্ঞানিক নাম Citrus reticulata. বরফহীন অথচ গ্রীষ্মে প্রখর তাপ এবং শীতে প্রচন্ড শীত এমনস্থানে কমলার উৎপাদন ভালো হয়। পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় চার কোটি টন কমলা উৎপাদন হয়, যার মধ্যে ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোতে সর্বাধিক। কমলা থেকে রস, জুস এবং জ্যাম-জেলি প্রস্তুত করা হয়। বাংলাদেশে সিলেটে বেশ ভালো কমলা উৎপন্ন হয়। ভিটামিন সি'সহ বিভিন্ন ভিটামিনে পূর্ণ কমলার জুস অপেক্ষা পাঁকা কমলাই শ্রেয়।

আনারস

আনারস একটি সুপরিত ফল যা বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের মধুপুর এবং পাহাড়ী অঞ্চলে বেশি পাওয়া যায়। তবে পাহাড়ী আনারসের স্বাদ অতুলনীয়। বাংলাদেশের হাট-বাজারে গ্রীষ্ম-বর্ষায় জনপ্রিয় ফল হিসেবে পরিচিত, অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি মৌসুমী ফলের কদর হিসেবে আভিজাত্য এনে দেয় এটি। গুচ্ছ প্রকৃতির ফল আনারসের ইংরেজি নাম Pineapple এবং বৈজ্ঞানিক নাম Ananas comosus (L.). আনারস একদিকে শরীরে পানির চাহিদা পূরণ করে, অন্যদিকে পুষ্টির অভাব দূর করে। আনারসে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ এবং সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ এবং ফসফরাস। ওজন নিয়ন্ত্রণেও আনারস বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ক্যালসিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজ হাড়ের গঠন, দাঁতের সুরক্ষা এবং মাড়ির প্রদাহকে জীবাণুর সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এছাড়াও বদহজম ও হজমজনিত সমস্যা এবং শরীরে রক্ত প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে হৃৎপিন্ডকে সচল রাখে আনারস।

আমড়া

ভিটামিন সি’সমৃদ্ধ ফলের নাম বলতেই প্রথমে যে ফলটির নাম মাথায় আসে, তার নাম আমড়া। এটি গ্রামীণ মানুষের নিকট গোল্ডেন আপেল হিসেবে সুপরিচিত, যার বৈজ্ঞানিক নাম Stondia Dulcis. বাংলাদেশে দু’প্রজাতির আমড়া পাওয়া যায়। সেগুলো হল দেশি আমড়া ও বিলাতি আমড়া। দেশি আমড়া প্রচন্ড টক স্বাদের হয়, বিলাতি আমড়া টক- মিষ্টি স্বাদযুক্ত। এটি আকারে দেশি আমড়া অপেক্ষা বৃহৎ এবং আঁশযুক্ত। আমড়া থেকে সুস্বাদু আচার, চাটনি এবং জেলি তেরি করা যায়।

প্রতি ১০০ গ্রাম আমড়ায় জলীয় অংশ ৮৩ শতাংশ, খনিজ উপাদান ০.৬ ভাগ, লৌহ ০.৪ ভাগ, আঁশ ০.১ ভাগ, আমিষ ০.১ ভাগ, শর্করা ১৫ ভাগ, এবং ০.৬ ভাগ ক্যালসিয়াম বিদ্যমান। এসব উপাদান শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এতে প্রচীর পরিমাণে ভিটামিন থাকায় স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধ করে। এছাড়াও হজমি শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি নানা ধরণের ইনফেকশন থেকে বাঁচিয়ে দেয়। সর্দি কিশি উপশমে আমড়া খেলে দ্রুত আরোগ্য লাভ হয়।

তরমুজ

পানিসমৃদ্ধ ফলের মধ্যে তরমুজ শীর্ষে। রসালো মিষ্টি স্বাদের তরমুজে ক্যালরি কম থাকে। ওজন নিয়ন্ত্রণে তরমুজ বেশ সহায়ক। পানির অভাব পূরণের জন্য আদর্শ ফল তরমুজের ৯২ শতাংশই পানি। যার ইংরেজী নাম Citrullus এবং বৈজ্ঞানিক নাম Citrullus lanatus.

গ্রীষ্মকালে সতেজ থাকতে তরমুজ অনবদ্য, মৌসুমী এই ফলটির রয়েছূ নানান উপকারিতা। এছাড়াও তরমুজে আছে পর্যাপ্ত ভিটামিন এ, সি, পটাশিয়াম ও আঁশ। ভিটামিন বি'৬ এর অন্যতম উৎস তরমুজ, যা মস্তিষ্ক সচল রাখতে বেশ সহায়ক। ফলে তরমুজকে মাথা ঠান্ডা রাখার ফলও বলা যেতে পারে।

তরমুজে ক্যারোটিনয়েড থাকায় রাতকানা প্রতিরোধসহ, চোখ ও দৃষ্টিশক্তি ভাল রাখতে এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, তরমুজে প্রচুর পরিমাণে সিট্রুলিন থাকায় মানব দেহের ধমনির কার্যক্রম স্বাশভাবিকরাখতে এবং রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে।

পেঁপে

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় দু'চারটি পেঁপে গাছের দেখা মিলবেই। যা শুধু ফল হিসেবে নয়, তরকারি হিসেবেও ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন। এমনকি রোগীর পথ্য খাবার হিসেবে পেঁপের চাহিদা অনেক। পাঁকা পেঁপে খেতে চায় না এমন মানুষের দেখা ভার। সব ধরণের মানুষ সুস্থ কিংবা অসুস্থ সকল অবস্থায় পেঁপে খেতে প্রস্তুত। তাছাড়া কাঁচা পেঁপে ঝালাই বা সালাদ করে খাওয়ার চাহিদাও রয়েছে। পেঁপেতে প্রচুর পরিমাণে পানি, এন্টি-অক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন রয়েছে। এটি ভিটামিনের স্টোর হিসেবেও পরিচিত। পেঁপের ইংরেজি নাম Papaza এবং বৈজ্ঞানিক নাম Carica papaza.

পেঁপেতে প্রচুর পরিমাণে ক্যোরোটিন থাকায় মেদ সমস্যা সমাধানে সহায়ক, এছাড়াও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ ও সি থাকায় চোখের সমস্যা ও সর্দিকাশিতে কাজে লাগে। নিয়মিত পেঁপে খেলে হার্ট এটাক, স্ট্রোক, কোষ্ঠকাঠিন্য, বুক জ্বালাপোড়া, গ্যাস্টিক, পেট ব্যাথা, অজীর্ণ, কৃমি সংক্রমণ, আলসার, আলসার ও কিডনি রোগের ক্ষেত্রে প্রহরী হিসেবে কাজ করে। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা পেঁপেতে ৭.২ গ্রাম শর্করা, ৩২ কিলোক্যিলরি খাদ্যশক্তি, ০.৮ গ্রাম আঁশ. ০.৬ গ্রাম আমিষ, ০.৫ গ্রাম খনিজ লবণ, ৬ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ৭০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম এবং ০.৫ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে। পেঁপে কাচা হোক কিংবা পাঁকা পুষ্টিগুণে ভরপুর ফলটি নিয়মিত খাওয়া উচিত।

আমলকী

ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলের নাম মাথায় আসলে আমলকীর নাম বিশেষভাবে স্বীকৃত। ঐর শুধু পুষ্টিগুণে নয়, ঔষধিগুণেও এর বেশ কদর রয়েছে। এজন্য আমলকীকে অমৃত ফল হিসেবেও অভিহিত করা হয়। এটি একটি শীতকালীন ফল। শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যায় এবং ফল পাঁকে। এর ইংরেজি নাম Eneblic mzrabolance এবং বৈজ্ঞানিক নাম Emblica officinalis.

আমলকীর ফলগুলো ছোট এবং গোলাকৃতির। বেশ মাংসল, রসালো এবং ভেতরে পানির মতো স্বচ্ছ দেখায়। ভেতরে যে শক্ত আঁটি থাকে তাতে ছয়টি করে সুপুষ্ট বীজ থাকে। কিছুটা টক স্বাদযুক্ত এই ফলটির জন্মস্থান কারও মতে ভারত, আবার কেউবা বলেন ভিয়েতনাম। আমলকীর প্রতিটি ফলে প্রায় ৮১% পানি বা জলীয় রস থাকে। এছাড়াও প্রোটিন ০.৫ ভাগ, স্নেহ ০.১ ভাগ, খনিজ ০.৭ ভাগ, ফসফরাস ০.০২ ভাগ এবং লৌহ থাকে ১.২ ভাগ। প্রতি ১০০ গ্রাম আমলকীর শাঁসে ৬০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি রয়েছে।

আতা

স্বল্পজীবি ফলদ উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত আতা একটি অন্যতম ফল। এটি বাড়ির আনাচে-কানাচে, ঝোপঝাঁড়ে অযত্নে অবহেলায় বেড়ে ওঠে। আতা গাছ ৬ - ৮ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। শীতকালে আতা গাছের পাতা ঝরে যায়। শীতের শেষে বসন্ত এসে আতা ফল পাঁকিয়ে দেয় সাধারণত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে। এই আতা গাছে কাঁঠালি চাঁপার মতো বাহারি সুগন্ধি ফুল আসে মে-জুন মাসে। কথিত আছে, নাবিক কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের অনেক আগেই পর্তুগিজরা প্রশান্ত মহাসাগরীয় কোন দ্বীপ থেকে ভারতবর্ষে আতা নিয়ে আসে। তারপর ধীরে ধীরে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে এটি ছড়িয়ে যায়।

চমৎকার স্বাদযুক্ত এই ফলের ভেতরে নরম শাঁস থাকে। এটি বিভিন্ন আকারের হতে পারে। আমাদের দেশে লালচে ও সাদা রঙের ফলগুলোই বেশী দেখা যায়। আতা ফলের ইংরেজি নাম Bullocks heart এবং বৈজ্ঞানিক নাম Anona reticulate. প্রোটিন, স্নেহ, খনিজ লবণ, শর্করা, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং লৌহ সমৃদ্ধ এই ফলটিতে যথেষ্ট ক্যালরি বিদ্যমান।

সফেদা

ছোট বেলায় ছফেদা নামটি শুনলে ভাবতাম এটি ফল নাকি মেয়ে মানুষের নাম! হ্যা, চমৎকার স্বাদযুক্ত এবং পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ এটি একটি ফলের নাম। গাছ মাঝারি আকৃতির এবং ৮-১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। আমাদের দেশের খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও বরিশাল অঞ্চলে প্রচুর ছফেদা উৎপন্ন হয়। সবুজ বর্ণের পাতাগুলো দেখতে ডিম্বাকৃতির। মেটে বর্ণের এই ফলটি সবার কাছেই বেশ জনপ্রিয়।

দক্ষিণ আমেরিকার মেক্সিকো সফেদার জন্মস্থান নামে সমধিক প্রসিদ্ধ। এটি একটি শীতকালীন ফল, তবে ফুল ফোটে গ্রীষ্মকালে যা দেখতে বকুল ফুলের মতো। ছফেদার ইংরেজি নাম Neesberrz এবং বৈজ্ঞানিক নাম Manilkara Zapota.

ছফেদা কাঁচা খাওয়ার উপযোগী নয়। পাঁকা ফলের গায়ের রঙ দেখতে অনেকটা বাদামি বর্ণের এবং শাঁস রসালো ও মিষ্টি। প্রতি ১০০ গ্রাম সফেদায় ০.৭ ভাগ প্রোটিন, ১.১ ভাগ ফ্যাট, ০.৫ ভাগ খনিজ, ২১.৪ ভাগ কার্বোহাইড্রেট, ০.২৮ ভাগ ক্যালসিয়াম। এছাড়াও ফসফরাস, ভিটামিন ও লৌহ পাওয়া যায়। প্রতি কেজি ফল থেকে ৭০০ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়।

লটকন

লটকন গাছটি দক্ষিণ এশিয়ায় বুনোগাছ হিসেবে জন্মালেও বাংলাদেশ, মালেশিয়া ও থাইল্যান্ডে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। টক-মিষ্টি স্বাদযুক্ত এই ফলটির বৈজ্ঞানিক নাম Baccaurea motlezana. এটি বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে পরিচিত। Rambi, Rambai, Mafai - farang, Lamkhae, Ramai প্রভৃতি নাম রয়েছে এর। এটি ১০-১২ মিটার লম্বা হয়ে থাকে। ফলের আকার ছোট এবং থোকায় থোকায় আঙুরের ফলের মতো দেখতে। এর ফুলগুলো সুবাস ছড়ায় আর ফলে পরিণত হলে হলুদ বর্ণেও দেখায়।

লটকন গাছের বাকল থেকে রং সংগ্রহ করা হয় যা রেশম সুতা রাঙানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। আর ফল সরাসরি খাওয়া যায়, তবে জ্যাম জ্যালি তৈরিতে বেশী ব্যহৃত হয়। বাংলাদেশে এক সময় অপ্রচলিত ফলের তালিকায় থাকা এই ফলটি বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। এতে এমাইনো এসিড ও এনজাইম থাকে যা শরীর গঠন ও কোষের সুস্থতার সহায়ক।

বাংলাদেশের নরসিংদীতে লটকনের ফলন সর্বাধিক। বর্তমানে সিলেট, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলায় বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ করা হচ্ছে। সুমিষ্ট এই ফলটির চাষ বৃদ্ধির পাশাপাশি জনপ্রিয়তাও বেড়েছে বেশ।

কৎবেল

কৎবেল একটা দেশীয় ফল। ভারতীয় উপমহাদেশই এর জন্মস্থান অর্থাৎ বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার কৎবেল এর বিস্তৃতি বেশী। ফলটি অনেকটা ক্রিকেট বলের মতোই তবে রঙে ভিন্ন! কাঁচা ফলের রং ধূসর বর্ণের এবং পাঁকা ফল কালচে রঙের হয়।

কৎবেলের গাছ ১৫-১৬ মিটার লম্বা হতে পারে। এর পাতা গাঢ় সবুজ বর্ণের, ঘন, ছায়াযুক্ত এবং বেশ গন্ধযুক্ত। ডালে ছোট ছোট কাটা থাকে এবং শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যায়। সাধারণত মার্চ - এপ্রিল মাসে গাছে ফুল ফোটে। ফুলের রঙ বাহারি লাল সাদা হয়ে থাকে। কাঁচা কিংবা পাঁকা উভয় অবস্থাতেই এই ফল খাওয়া যায়।

কৎবেল পুষ্টিগুণের দিক থেকেও সমৃদ্ধ। এর ইংরেজি নাম Eliphant apple এবং বৈজ্ঞানিক নাম Feronia Linconia. প্রায় ৭০ ভাগ জলীয় রসযুক্ত ফলটিতে ৭.৩ ভাগ প্রোটিন, ০.৬ ভাগ স্নেহ, ১.৮ ভাগ খনিজ লবণ, ১৫.৫ ভাগ শর্করা এবং ৫.২ ভাগ আঁশ বিদ্যমান। এছাড়াও ফসফরাস, ক্যালসিয়াম ও লৌহ রয়েছে। এই ফলের গুরুত্ব অপরিসীম।

ফলের একটি ছড়া আছে:

"আম জামরুল কৎবেল

অতা আম নারিকেল

তাল তরমুজ আমড়া

কামরাঙ্গা বেল পেয়ারা

পেঁপে ডালিম জলপাই

বরই দিলাম আর কি চাই?'

লেখক : গবেষণা কর্মকর্তা, হেলথকেয়ার কেমিক্যালস লিমিটেড।

যাযাদি/ এস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে