কৃষ্ণা রানীর গ্রামে ফেরার অপেক্ষায় ফুটবলপ্রেমীরা

কৃষ্ণা রানীর গ্রামে ফেরার অপেক্ষায় ফুটবলপ্রেমীরা

নেপালের দশরথ স্টেডিয়ামে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়ল লাল-সবুজের বাংলাদেশ। দেশের হয়ে তিন গোলের মধ্যে দুটোই করেছেন টাঙ্গাইলের কৃষ্ণা রানী সরকার খেলার ১৩ ও ৪১ মিনিটে গোল করে বাংলাদেশের জয়কে নিশ্চিৎ করেন তিনি।

কৃষ্ণার গোলে একদিকে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিৎ হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বে বাংলাদেশের নতুন একটি ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। এ জয়ের আনন্দে ভাসছে পুরো দেশ।

টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলা শহর থেকে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত একটি গ্রামের নাম উত্তর পাথালিয়া। প্রত্যন্ত এই গ্রামে প্রবেশ করার আগে পশ্চিমে ঝিনাই নদী আর পূর্বে বিস্তীর্ণ ডগাবিল। গ্রাম ভেদ করে চলে যাওয়া মুশুদ্দী-ঝাওয়াইল সড়কের প্রাচীন এক বটবৃক্ষ বাঁয়ে রেখে একশগজ সামনে এগুলেই দারিদ্র্যতার ছাপে জর্জরিত একটি টিনের বাড়ি। অচল পয়সার মতো অবহেলার ছোট এই টিনের বাড়িটি ঘিরেই এখন পাথালিয়া গ্রামের ছোট বড় সকলের পাশাপাশি উপজেলাসহ টাঙ্গাইল জেলাবাসীর গর্ব আর ব্যাপক উচ্ছ্বাস । গর্ব আর উচ্ছ্বাসস হবেই না কেন! কারণ এ বাড়িটিইতো বাংলাদেশের মেয়েদের ফুটবলকে নতুন করে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা বাংলাদেশ জাতীয় দলের অন্যতম বড় ভরসা সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে জোড়া গোলের মালিক কৃষ্ণা রানী সরকারের।

একটি অজপাড়া গায়ে কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা কৃষ্ণার সাফল্যে সারাদেশবাসীর কাছে সত্যিই অনেক প্রশংসনীয় এবং আনন্দের।

এদিকে ফুটবলে কৃষ্ণার হাতেখড়ি ২০১০ সালে উপজেলা পর্যায়ে বঙ্গমাতা ফজিলাতুনেচ্ছা মুজিব আন্তঃপ্রাথমিক ফুটবল টুর্নামেন্টে। কৃষ্ণার নেতৃত্বে তার নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উত্তর পাথালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উপজেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। ওই টুর্নামেন্টে কৃষ্ণা সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়ায় সূতী ভিএম পাইলট মডেল হাইস্কুলের শরীর চর্চা শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপনের নজরে পড়েন এ ফুটবল রাজকন্যা।

ফুটবলে কৃষ্ণার অসাধারণ ক্রীড়া নৈপুণ্য দেখে ওই শরীর চর্চা শিক্ষক অনেকটাই নিজের আগ্রহ নিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে কৃষ্ণার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর কৃষ্ণাকে সূতী ভিএম পাইলট মডেল হাইস্কুলে বিনাবেতনে ভর্তি করানো হয়। আর এ স্কুলে ভর্তি হয়েই ফুটবল চর্চার অবাধ সুযোগও পেয়ে যায় টাঙ্গাইলের এ কৃতী ফুটবল কন্যার।

কৃষ্ণার ফুটবলার হওয়ার পেছনে তার কাকার বেশ অবদান রয়েছে। সকালে ঘুম থেকে তুলে বাড়ি থেকে সাত কিলোমিটার দূরে অনুশীলনে নিয়ে যেতেন তার কাকা। কৃষ্ণার বাবার কাছে তেমন একটা টাকা ছিল না।

তাই আসা-যাওয়ার ভাড়াটাও ওই কাকাই দিতেন। এরপর উপজেলা পরিষদ থেকে সাইকেল দেওয়ার পর অনুশীলনে যেতে তেমন একটা সমস্যা হয়নি।

একসময় দর্জির দোকান ছিল কৃষ্ণার বাবার বাসুদেব সরকারের। টাকার অভাবে অনেক আগেই দোকানটা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলেন দারিদ্র্যকে জয় করা কৃষ্ণার হত দরিদ বাবা। বর্তমানে অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে দিনাতিপাত করছেন তিনি।

পরে গোলপুরের সূতী ভিএম পাইলট মডেল হাইস্কুল কৃষ্ণার ফুটবল নৈপুণ্য আর বিশেষ ভূমিকায় জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ফুটবল প্রতিযোগিতা ২০১১, ২০১২ এবং ২০১৩ সালে পর পর তিনবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৪ বালিকা ফুটবল দল গঠন করা হলে কৃষ্ণাসহ একই স্কুল থেকে আরো দুই কিশোরী ফুটবলার বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৪ বালিকা ফুটবল দলেও জায়গা করে নেন।

২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক ফুটবলে কৃষ্ণার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। পরের বছর একই টুর্নামেন্টেও শিরোপা ঘরে তোলে বাংলাদেশ। তবে সেই দলে বয়সের কারণে ছিলেন না কৃষ্ণা। কিন্তু একই বছর ঢাকায় হওয়া এএফসসি অনূর্ধ্ব ১৬ ফুটবলের বাছাইয়ে গ্রুপ পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়ে চূড়ান্ত পর্বে উত্তীর্ণ হয় বাংলাদেশের মেয়েরা। সেই দলের গর্বিত অধিনায়কও ছিলেন কৃষ্ণা রাণী সরকার। একই সঙ্গে সেই আসরে ৮ গোল করে দলকে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দেন এ ফুটবল বিস্ময় কন্যা। ২০১৭ সালে কৃষ্ণার নেতৃত্বেই থাইল্যান্ডে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের মূল পর্বে খেলার গৌরব অর্জন করেছে লাল-সবুজের দল। ২০১৭ সালের প্রথম দিকে ভারতে হওয়া সাফ ফুটবলে রানার্সআপ হয় বাংলাদেশ। যে দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন কৃষ্ণা।

এদিকে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে কৃষ্ণার অভূতপূর্ব সাফল্যে তার নিজ গ্রাম থেকে শুরু করে পুরো টাঙ্গাইলে চলছে উল্লাস। রানীর গ্রামে ফেরার অপেক্ষায় আছে স্থানীয়রা। সোমবার নেপালের কাঠমুন্ডুতে খেলা চলাকালীন সময়ে কৃষ্ণা রানীর গ্রামের বাড়িতে চলছিল লোডশেডিং। ফলে কৃষ্ণার মা জোড়া গোল উপভোগ করতে পারেননি। তবে বাবা বাসুদেব চন্দ্র সরকার থেমে থাকেননি। দুমাইল বাইসাইকেল চালিয়ে পাশের গ্রামে গিয়ে টিভেতে খেলা দেখেন। গোলের সাথে সাথে টিভির সামনে থাকা দর্শকরা কৃষ্ণার বাবাকে জড়িয়ে ধরে উল্লাস করেন। উল্লাস চলছে পুরো গ্রামে। ভোর থেকে কৃষ্ণার বাড়িতে অসংখ্য মানুষ ভিড় করছে। ঘরে বারান্দায় সাজিয়ে রেখেছেন কৃষ্ণার অর্জিত সব ট্রপি, খেলার ছবি ও সার্টিফিকেট। আনন্দে আত্মহারা কৃষ্ণার বাবা-মা।

উল্লাস হবেই না বা কেন। কারণ কৃষ্ণারাইতো বাংলাদেশকে নতুন করে চেনালেন। প্রমান করেছেন দলের অন্যতম বড় ভরসার নাম কৃষ্ণা রাণী সরকার। মফস্বলের একটি কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা কৃষ্ণার সাফল্যে সারাদেশবাসীর কাছে সত্যিই অনেক প্রশংসনীয় এবং আনন্দের।

কৃষ্ণার মা নমিতা রাণী সরকার বলেন, আমরা খুবই গরিব মানুষ। এক সময় টাকার অভাব ও গ্রামের মানুষের কটূ কথার কারণে মেয়েকে ফুটবল খেলতে বারণ করেছিলাম। তারপরও কৃষ্ণার ইচ্ছা শক্তির কাছে কটূক্তি করা মানুষজন হেরে গেছে। সে এখন দেশের গৌরব। সবাই তার প্রশংসা করছে। তবে অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি হচ্ছে না আমাদের। এক মেয়ের ওপর নির্ভর করে সংসার খরচ ও ছেলের পড়াশোনা। কৃষি কাজ করে তেমন আয় হয় না। সরকার বা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পূর্বের ন্যায় আমার মেয়ে এবং আমাদের দিকে সুনজর দিলে হয়তো অর্থনৈতিকভাবে আমাদের মুক্তি মিলবে। এছাড়া মেয়েটি যেন গাড়ি নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করতে পারে সেজন্য বাড়ির রাস্তাটি পাকা করার দাবি জানাই।

কৃষ্ণার বাবা বসুদেব সরকার বলেন, ছেলে খেলোয়াড়রা অনেক টাকা বেতন পায়। অথচ মেয়েরা সামান্য সম্মানি পায়। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও দেশসেরা হয়েছে। সুতরাং তাদের কেন ন্যায্য বেতনভাতা দেওয়া হবে না। বাফুফের সভাপতি আমাকে বলেছিলেন, ‘মেয়েরা যেভাবে পরিশ্রম করে সেই অনুযায়ী কোনো কিছু দেওয়া হয় না। আমরা বেতন দিতে পারছি না। হাত খরচার জন্য দেওয়া হয়। কোনো একদিন হয়ত মেয়েরাও ছেলেদের মতো বেতন, গাড়ি-বাড়ি পাবে।’ এর আগে খেলাধুলার জন্য প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে কিছু জমি কেনা হয়েছে। এছাড়া থাকার মতো একটা বাড়ি করছি। সেটা টাকার অভাবে শেষ করতে পারছি না। এই খেলায় যে টাকা আসবে, সেই টাকা দিয়ে বাড়ির কাজ শেষ করার ইচ্ছা রয়েছে।

সূতি ভিএম মডেল পাইলট হাইস্কুলের শরীর চর্চা শিক্ষক ও কৃষ্ণার হাতেখড়ি কোচ গোলাম রায়হান বাপন বলেন, কৃষ্ণা খুব দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও কঠোর পরিশ্রম এবং ইচ্ছা শক্তি থাকার ফলে কৃষ্ণা আজ দেশ সেরা ফুটবলার হতে পেরেছে। যা সত্যিই প্রশংসনার দাবী রাখে। তাকে দেখে স্কুল এবং উপজেলার অনেক ক্ষুদে ছেলে মেয়েরা খেলাধূলায় আগ্রহী হচ্ছে। ভবিষ্যতেও কৃষ্ণা এমন সাফল্য ধরে রাখবে এমনটিই প্রত্যাশা গোলাম রায়হানের।

গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পারভেজ মল্লিক বলেন, কৃষ্ণা গোপালপুর তথা পুরো দেশের সুনাম বয়ে এনেছে। আমরা কৃষ্ণাকে নিয়ে গর্ববোধ করি। আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃষ্ণাকে খেলাধুলায় উৎসাহ দিয়েছি। দেশে আসলে বড় ধরনের সংবর্ধনা দেয়া হবে।

যাযাদি/এসএস

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে