মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯
walton1

ব্যাংক খাতে আর কত অনিয়ম-দুর্নীতি কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটবে?

গত এক যুগের প্রধান ঘটনাগুলো তালিকা করলে প্রথমেই আসবে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনা। এরপরই বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, জনতা ও প্রাইম ব্যাংকে বিসমিলস্নাহ গ্রম্নপের অনিয়ম, জনতা ব্যাংকের অ্যানটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রম্নপের ঋণ অনিয়ম। এ ছাড়া আলোচিত ঘটনাগুলোর অন্যতম ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়ম, ইউনিয়ন ব্যাংকের বেনামি ঋণ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ঘটনা। আবার ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ অনিয়মের ঘটনা কয়েক বছর ধরেই আলোচনায়। বড় ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি হওয়ার প্রবণতাও বেশি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়া হচ্ছে জামানত ছাড়া। অনেকেই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হচ্ছেন। একই ব্যক্তি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে খেলাপি হচ্ছেন। দেশে খেলাপি ঋণ বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে।
রেজাউল করিম খোকন
  ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০
এখন আবারও আলোচনায় এসেছে ব্যাংক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি। ইসলামী ব্যাংক থেকে কাগুজে কোম্পানিকে ঋণ দেওয়ার ঘটনা প্রকাশের পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। আগে যেসব অনিয়ম হয়েছে, তার আদায় ও বিচারের কতটা অগ্রগতি হয়েছে, বিষয়টিও সামনে আসছে। অন্য কোনো বিষয়ে নজর না দিয়ে এখানে শুধু কয়েকটি ব্যাংক সাবাড়কারীর বিচারের কথাই বলা যায়। এখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও প্রশ্ন করছেন, তারা কি শুধু দর্শক হয়ে ব্যাংক খাতের লুট করা দেখবেন? বিচারপতিদের ক্ষোভ ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে তিরস্কারের ঘটনাটি ঘটল কমিশনের চেয়ারম্যান 'বিশ্ব রেকর্ড করার মতো রাঘববোয়াল ধরার' দাবি করার পর সপ্তাহ না পেরোতেই। এই কমিশনেরই একজন সাবেক কমিশনার বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক এবং ব্যাংকটির ঋণ কেলেঙ্কারির বিষয়ে সাফাই দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, 'সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে'। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেসিক ব্যাংক লোপাটের ঘটনা নিয়ে তদন্ত কেন শেষ হচ্ছে না, সে বিষয়ে। কিন্তু বেসিক ব্যাংকের আগে এবং পরে আরও যেসব ব্যাংকে কেলেঙ্কারি হয়েছে, সেগুলোতে কি কিছু হয়েছে? সাবেক ফারমার্স ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকরা তো সবাই বহাল তবিয়তে আছেন, রাজনীতি করছেন। বলাবাহুল্য যে, উদ্যোক্তারা ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের প্রথম সারির নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, তার পরিবার, স্বজন ও সহযোগী। শুধু ব্যাংকটিকে নতুন নামে বাঁচানোর চেষ্টা হচ্ছে, যা এখনো সফল হয়েছে বলে কেউ দাবি করতে পারছে না। দেশে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হয়নি বা বন্ধ হয়নি বলে মন্ত্রী বা আমলারা দাবি করেন, তারা যে তথ্যটি আড়াল করেন তা হলো, রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও বিশেষ ব্যবস্থায় এগুলোকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর অনাদায়ী ঋণ অবলোপন ও খেলাপি ঋণের বোঝা সামলাতে দফায় দফায় করদাতাদের টাকা দিয়ে মূলধনের ঘাটতি পূরণ না করলে সেগুলো টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। ওই টিকিয়ে রাখার মূল্য কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষই দিচ্ছে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী ব্যাংকের অবস্থা কোথায় খারাপ, তা জানতে চেয়েছেন। তার পূর্বসূরিও হলমার্ক কেলেঙ্কারির সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকাকে কোনো টাকাই মনে করেননি। লাখ কোটি টাকার বাজেট তৈরির আত্মতৃপ্তিতে তখন তার কাছে হাজার কোটির সংখ্যা গণনাযোগ্য ছিল না। ব্যাংকিং খাত নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই যেসব নতুন নতুন তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে, তাতে আর কত দিন সংকট নেই কথাটা মানুষকে বিশ্বাস করানো যাবে? অর্ধডজনের বেশি ব্যাংক একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকার আর কোনো নজির বিশ্বের কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীটি নানা নামে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। আইন ও নিয়মকানুন মানলে গ্রম্নপটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে পারে ২১৫ কোটি টাকা। এর মানে হচ্ছে যতটা পাওয়ার যোগ্য, তার চেয়ে অন্তত ১৩৯ গুণ বেশি ঋণ তারা আদায় করতে পেরেছে অদৃশ্য ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে। ২০১৭ সালে নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণে নেয় ব্যবসায়ী গ্রম্নপটি। আরেকটি বিষয় হলো ঋণখেলাপিদের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি। পৃথিবীর অনেক দেশে ঋণখেলাপিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে, বিদেশভ্রমণের জন্য তারা বিমানের টিকিটও পান না। কিন্তু আমাদের দেশে ঋণখেলাপিরা সর্বত্র দাপট দেখিয়ে বেড়ান, এক ব্যাংকে খেলাপি ঋণ থাকা সত্ত্বেও অন্য ব্যাংক থেকে তাদের ঋণ নিতে কোনো অসুবিধা হয় না। যে সমাজে ঋণখেলাপিদের নানাভাবে পুরস্কৃত করা হয়, সেই সমাজে খেলাপি ঋণ কমার কোনো কারণ নেই। সরকারের নীতিনির্ধারকরা খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে নানা আওয়াজ তুললেও বাস্তবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয় না। দুদকের বিরুদ্ধে সাধারণ অভিযোগ হলো, সরকার যে মামলাগুলো সচল রাখতে আগ্রহী, তারা কেবল সেগুলোর তদন্ত করে, বাকিগুলো হিমাগারে চলে যায়। গত এক যুগের প্রধান ঘটনাগুলো তালিকা করলে প্রথমেই আসবে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনা। এরপরই বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, জনতা ও প্রাইম ব্যাংকে বিসমিলস্নাহ গ্রম্নপের অনিয়ম, জনতা ব্যাংকের অ্যানটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রম্নপের ঋণ অনিয়ম। এ ছাড়া আলোচিত ঘটনাগুলোর অন্যতম ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়ম, ইউনিয়ন ব্যাংকের বেনামি ঋণ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ঘটনা। আবার ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ অনিয়মের ঘটনা কয়েক বছর ধরেই আলোচনায়। বড় ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি হওয়ার প্রবণতাও বেশি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়া হচ্ছে জামানত ছাড়া। অনেকেই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হচ্ছেন। একই ব্যক্তি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে খেলাপি হচ্ছেন। দেশে খেলাপি ঋণ বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। \হবিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাই এর প্রধান কারণ। দেশে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়েছে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞার। দেওয়া হয়েছে একাধিকবার ঋণ তফসিলের সুবিধা। ইতিহাসে ঋণখেলাপিদের সবচেয়ে বড় সুবিধা দেওয়া হয় ২০১৯ সালে। ১৯৯০ সালেও দেশে খেলাপি ঋণ ছিল ৪ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। সেই খেলাপি ঋণ এখন লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে গত ১৪ বছরে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে তখন খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রতিযোগী এবং তুলনীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হারই সবচেয়ে বেশি। এই খেলাপি ঋণই ব্যাংকিং খাতের বড় সমস্যা। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ বাড়ার প্রধান কারণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। এখানে বছরের পর বছর ধরে খেলাপিদের নানা ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা বদলানো হয়েছে বারবার। আইন সংশোধন করে একাধিকবার ঋণ তফসিলের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আর এসব সুযোগ-সুবিধা নিয়েই বড় বড় ঋণখেলাপি খেলাপির তালিকা থেকে বাইরে থেকে গেছেন। হয়েছেন আরও ক্ষমতাবান। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পরে অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান জাতীয় সংসদে খেলাপি ঋণগ্রহীতার নাম প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৯৬ সালের পরে আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া তালিকা প্রকাশ করে প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের রোষানলে পড়েছিলেন। সেই প্রভাবশালীরাই এখন সরকারের দেওয়া নানা সুযোগ নিয়ে খেলাপির তালিকা থেকে বের হয়ে গেছেন। এমনকি তারাই এখন খেলাপি ঋণের ছাড় কীভাবে দেওয়া হবে, সেই নীতিমালাও তৈরি করে দিচ্ছেন। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হওয়া সংজ্ঞা হচ্ছে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা। দেশে প্রথম খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। তবে পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞাটি ছিল ১৯৯৪ সালের। এর পর থেকে যতগুলো সরকার এসেছে, সবাই এর সংজ্ঞা নিজেদের মতো করে পরিবর্তন করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই খেলাপি হওয়ার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। আবার খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ কতবার পুনঃতফসিল করা যাবে, তারও পরিবর্তন করা হয়েছে বেশ কয়েকবার। খেলাপি ঋণ নিয়ে এবার সত্যিকারের নতুন এক বিপদে পড়েছে ব্যাংকিং খাত। এত দিন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় খেলাপি ঋণ বাড়তে দেওয়া হয়েছে, আর এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ব্যাংক খাতে। এখন দুষ্ট ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অনেক ভালো ব্যবসায়ীও ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন। এতে সামনে খেলাপি ঋণ আরও বেশি বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন অর্থনৈতিক সংকট চলছে বিশ্বব্যাপীই। বিশ্বমন্দার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। ডলারের দামের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। ফলে উৎপাদিত পণ্য সেভাবে বিক্রিও হচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ীদের নগদ টাকার প্রবাহ কমে গেছে। আয় ও ব্যয়ের হিসাবে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ব্যবধান। এতেই ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে তারা। করোনা মহামারির কারণে এর আগে ঋণ পরিশোধে বড় ছাড় দিয়ে রেখেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক- যা চলতি বছরে তুলে নেওয়া হয়। এর ফলে দুই বছর ঋণ পরিশোধ না করেও অনেকেই ভালো গ্রাহকের তালিকায় ছিল। আর এখন ছাড় উঠে যাওয়ার পর অনেকেই ঋণ পরিশোধ করছেন না। আবার যেসব ঋণ ইতোপূর্বে খেলাপি হওয়ার কারণে পুনঃতফসিল করা হয়েছিল, সেই ঋণের কিস্তিও শোধ হচ্ছে না। এতেও বাড়ছে খেলাপি ঋণ। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করছে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও ব্যাংক খাতকে খলনায়ক হিসেবেই মনে করা হয়েছে। সুশাসনের প্রচন্ড দুর্বলতা আর্থিক খাতে বড় বড় কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে। ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের, আমানতের নয়-ছয় হয়েছে। লাভবান হয়েছেন কেবল ঋণখেলাপিরাই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে ঋণখেলাপিদের ব্যাংক ডাকাত বলা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হয়নি কখনোই। ফলে কেবলই বাড়ছে খেলাপি ঋণ। অর্থ আত্মসাৎ, ঋণখেলাপি এবং লুটপাটে সহায়তাকারীদের কঠোর শাস্তি দেয় চীন ও ভিয়েতনাম। ব্যাংক থেকে প্রায় ১১ কোটি ডলার আত্মসাতের জন্য ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে হেংফেং ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান জিয়াং শিউয়ানকে মৃতু্যদন্ডের আদেশ দিয়েছিলেন চীনের আদালত। একইভাবে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে ব্যাংক অব ইনার মঙ্গোলিয়ার সাবেক চেয়ারম্যান ইয়াং চেঙ্গলিন, ২০১০ সালে চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ওয়াং ই এবং ২০০৫ সালে ব্যাংক অব চায়না-হংকংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান লিউ জিনবাওকে অর্থ আত্মসাতের জন্য মৃতু্যদন্ডে দেওয়া হয়েছিল। ভিয়েতনাম ২০১৪ সালে তিনজন ব্যাংকারকে মৃতু্যদন্ড দেয়। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন রাষ্ট্র মালিকানাধীন ভিয়েতনাম ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা। তার কারণে ব্যাংকের ক্ষতি ৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার। চীনে ঋণখেলাপিরা ক্রেডিট কার্ডও ব্যবহার করতে পারেন না, বিমানের টিকিট তাদের কাছে বিক্রি করা হয় না, তারা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীও থাকতে পারেন না। আর বাংলাদেশে ঘটে উল্টো। এখানে খেলাপিদের দেওয়া হয় নানা ধরনের সুবিধা। এ কারণেই প্রয়াত ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ সরকারকে বলতেন 'খেলাপিবান্ধব সরকার'। শুরু থেকেই খেলাপিবান্ধব পরিবেশের কারণে দেশে হয়েছে একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি, বেড়েছে খেলাপি ঋণ। সব মিলিয়ে অর্থ লুটপাটের জন্য রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কোনো শাস্তিই এখানে হয় না। চুনোপুঁটিদের কেবল জেলে থাকতে হয়। অন্যরা থাকেন বহাল তবিয়তে, আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে। ফলে আদালত যা-ই বলুন না কেন, শেখ আবদুল হাইয়ের মতো যারা আছেন, তাদের চিন্তিত হওয়ার আসলে কিছু নেই। অথচ পাবনায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সামান্য টাকার জন্য সাধারণ কৃষককে কারাগারে পাঠানোর ঘটনা অমানবিক। অথচ দেশে রাঘববোয়ালদের কাছ থেকে খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেই, বরং ক্ষেত্রবিশেষে তাঁদের তোয়াজ করে চলা হয়। বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের কাছ থেকে ওই কৃষকেরা ঋণ নিয়েছিলেন। অবশ্য ঋণের টাকা পরিশোধ করার পরও তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে বলে দাবি কৃষকদের। করোনার সময় কৃষকেরা দেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। অথচ ২৫ হাজার টাকার জন্য তাদের কোমরে দড়ি দিয়ে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। যদিও গ্রেপ্তার হওয়া কৃষকের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা ঋণের টাকা পরিশোধ করেছেন। তবে প্রশাসন গরিব কৃষকের কথা আমলে নেয়নি। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পার করে বাংলাদেশ ৫১তম বিজয় দিবস উদযাপন করছে এবার। মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা এবং লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ দেশের লক্ষকোটি মানুষ ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়েছিল, সেই চেতনার বাস্তবায়ন কী হয়েছে এখনো, শোষণমুক্ত সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা কি কায়েম হয়েছে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে? এ প্রশ্নগুলো এখন আমাদের নাড়া দিয়ে যায় বারবার। যখন বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা তথা আর্থিক খাতে নানা কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলো চোখের সামনে একের পর এক আসছে, যখন ব্যাংক খাতে খেলাপি বেড়ে গিয়ে ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লুটপাটের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংককে শোচনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছেন একশ্রেণির প্রভাবশালী অসৎ টাউট-বাটপার চরিত্রের ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সমাজের তথাকথিত হোমরা-চোমরা ব্যক্তিবর্গ। যখন গ্রামের অতি সাধারণ দরিদ্র কৃষক ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে তা যথাসময়ে পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় পুলিশ তাদের কোমরে দড়ি বেঁধে থানায় আটক করে নিয়ে যায়। অথচ বড় বড় খেলাপির হাজার হাজার কোটি টাকা অনাদায়ী থাকার পরও তাদের বিরুদ্ধে তেমন জোরালো কোনো ব্যবস্থা নিতে সংকুচিত বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। বড় বিচিত্র মনে হয় স্বাধীন বাংলাদেশের এই বৈপরীত্যমূলক ব্যবস্থা। এর জন্যই কি ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছিল? এ প্রশ্ন জাগে এ দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে। কে দেবে তার যথাযথ জবাব? নাকি তা নিভৃতে কেঁদে যাবে শুধু। ব্যাংক খাতে আর কত অনিয়ম-দুর্নীতি, কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটবে? রেজাউল করিম খোকন : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে