logo
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০ ৭ কার্তিক ১৪২৭

  অধ্যায় মোহাম্মদ নজাবত আলী   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

একুশে ফেব্রম্নয়ারি বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি সোনালি

মাতৃভাষা মাতৃভূমি প্রত্যেকটি মানুষের কাছে অতি পবিত্র। মাটি ও ভাষার অবমাননা কেউ সহ্য করতে পারে না। সহ্য করতে পারেনি বায়ান্ন সালের এ দেশের ভাষাসৈনিকরা, তারা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

দেশ মা মাটি একই সূত্রে গাঁথা। দেশকে ভালোবেসে, ভাষাকে ভালোবেসে অনেক কবি- সাহিত্যিক তাদের বিচিত্র লেখার মাধ্যমে ভালোবাসার প্রতিফলন তুলে ধরেছেন। আজ ২১ ফেব্রম্নয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাঙালি জাতির গর্ব ও আনন্দের দিন। এ আনন্দ ও আত্মগৌরবের ইতিহাস সূচিত হয় বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ইতিহাসের ভীত নির্মাণ করে এ দেশের চির অকুতোভয় গর্বিত ছাত্রসমাজ। ৫২ সালের এ দিনে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষায় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠত করতে এ দেশের ছাত্রসমাজ অকাতরে বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিয়ে বিশ্ব ইতিহাসে সৃষ্টি করেছে। ভাষা আন্দোলনের ৪৭ বছর পর বিশ্ব নেতারা ভাষার প্রশ্নে বাঙালি জাতির সংগ্রামী রক্তের ইতিহাসকে সারা বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই আজ মহান একুশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। গোটা বিশ্বের ১৯৩টি দেশে বাঙালি ভাষা দিবস উদযাপিত হচ্ছে। একুশে ফেব্রম্নয়ারি বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি সোনালি অধ্যায়।

বর্তমানে পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত আছে। এর সংখ্যা নির্ণয় করা কঠিন। তবে আনুমানিক হাজার ভাষা আছে। তন্মধ্যে বাংলা যা আমাদের মাতৃভাষা। যে কোনো জাতির কাছে মাতৃভাষা অতি পবিত্র, মায়ের মতো। একটি জাতির শিক্ষা, সংস্কৃতি তার মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে যুগ যুগ ধরে বাংলা ভাষা বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন বিবর্তনের মধ্যে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। কারণ ভাষার ধর্মই বদলে যাওয়া। একটি জাতির ভাষার বিকাশ ঘটে তার চর্চা ও ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে। তবে বাংলাসাহিত্যের প্রকৃত বিকাশ ঘটে মধ্যে যুগে। যদিও প্রাচীনকালে এর কিছুটা নমুনা পাওয়া যায়। পাল ও সেন আমলে বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা 'চর্যাপদ' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন এটি বাংলাসাহিত্যের আদি নিদর্শন। পাল আমলে সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত রাম চরিত (রামপালের জীবনী) বাংলা ভাষায় লিখিত পাল আমলের সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ। তা ছাড়া সেন আমলেও বাংলা ভাষায় গ্রন্থ রচিত হয়েছে। বিশেষ করে বলস্নাল সেন ও লক্ষণ সেন পিতা পুত্র দু'জনই বড় পন্ডিত ছিলেন ও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এ সময়ের কবি-সাহিত্যিকের মধ্যে ছিলেন ধোয়া, উমা প্রতিধর, জয়দেব, নামকরা কবি ছিলেন। তবে এ কথা ঠিক যে, প্রাচীনকালে বাংলা সাহিত্যের তেমন উন্নতি না হলেও মধ্য যুগে এর ব্যাপক অগ্রযাত্রা শুরু হয়। এ সময় বাংলা ভাষা চর্চা ও সাহিত্যের বিকাশের ক্ষেত্রে মুসলিম সুলতানদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের (১৩৯৩-১৪১১) আমলে শাহ মোহাম্মদ সগীর বিখ্যাত 'ইউসুফ জোলেখা' কাব্য রচনা করেন। আলাউদ্দিন হুসেন শাহের আমলে (১৪৯৩-১৫১১) বহু গ্রন্থ বাংলা ভাষায় রচিত হয়।

যা হোক, পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় এ দেশে উলেস্নখযোগ্যভাবে ভাষার বিকাশ না ঘটলেও আজ সময়ের পরিবর্তনে বহু কবি-সাহিত্যিক মণীষীরা তাদের সৃজনশীল লিখনীর মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে। রাজা রামমোহন রায়কে ভারতের আধুনিক পুরুষ বলা হয়। রাজা রামমোহন উপমহাদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের অগ্রপথিক হলেও তিনি ৩০টির মতো বাংলা ভাষায় গ্রন্থ রচনা করে বাংলা ভাষার ভীত নির্মাণে অনন্য দৃষ্টান্ত রেখেছেন এবং বাঙালি সমাজে সাধারণ মানুষের শিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলা ভাষা বিস্তারের পক্ষে আন্তরিক সমর্থন যুগিয়েছেন। তবে রামমোহর রায় বাঙালিকে আধুনিক মানুষে পরিণত কররার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় মাতৃভাষার গুরুত্বের বিষয়টি ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর স্পষ্ট করে দেখেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি মাতৃভাষা বাংলাকে শিক্ষার বাহন হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, 'বাংলা দেশে শিক্ষার তত্ত্বাবধানের ভার যারা নিয়েছেন তাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাসাহিত্য সৃষ্টি করা।' বিদ্যাসাগর এখানে বাংলাসাহিত্য কথাটি এক বিস্তৃত অর্থে ব্যবহার করে একমাত্র ভাষা যাতে বাঙালি সমাজের শিক্ষার শক্তিশালী বাহন হিসেবে কাজ করতে পারে তার স্বপক্ষেই জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। বস্তুত পক্ষে তিনি বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নিজস্ব ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তা করেছেন। বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় বেশ কয়েকটি পাঠ্য পুস্তকও অনেকগুলো গ্রন্থ রচনা করেছেন।

সতের শতকের মধ্যযুগের অন্যতম বিখ্যাত কবি আব্দুল হাকিম। তার স্বদেশও স্বভাষার প্রতি রয়েছে অটুট ও অপরিসীম প্রেম। তিনি মাতৃভাষার মাধ্যমে কাব্য রচনার পক্ষে জোর যুক্তি প্রদর্শন করেছেন। আব্দুল হাকিমের মাতৃভাষায় প্রেম এত প্রকট- যা যুগ যুগ ধরে বাংলা ভাষাপ্রেমীদের কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সে যুগে এমনকি বর্তমানেও মাতৃভাষার প্রশ্নে এত সাহসী উচ্চারণ কেহ করতে পারেনি। মাতৃভাষা বাংলার গুণকীর্তন করতে গিয়ে তার 'বঙ্গবাণী' কবিতার এক জায়গায় সাহসী উচ্চারণ করেছেন। 'যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।' আমাদের মাতৃভাষা বাংলা ভাষা বাঙালি জাতির জীবনী শক্তি। সবার প্রাণের ভাষা। কিন্তু দুঃখের বিষয়- বাংলাদেশে বসবাস করেও যারা বাংলা ভাষাকে চিনে না মূল্য দেয় না সর্বোপরি ঘৃণা করে এবং বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে কবি কঠোর ভাষায় তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। এমন কি কবি তাদের জন্ম পরিচয় সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। একই কবিতায় আবারো লিখেছেন, 'দেশি ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়/নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়' মাতৃ ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ সাহিত্য রচিত হওয়া উচিত। কিন্তু এটাকে যারা অগৌরব ও অমর্যাদা মনে করেন, কবি তাদের ধিক্কার দিয়ে নেতার আসনে আসীন হয়ে দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন, তারা যেন নিজ দেশ ত্যাগ করে বিদেশে চয়ে যায়। সুতরাং কবি আব্দুল হাকিমের মাতৃভাষার প্রতি এমন গভীর ভালোবাসা নির্দশন ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক কাল জয়ী আদর্শ হয়ে থাকবে। তার বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থ 'নূর নামা।'

রবীন্দ্রনাথ তার চিন্তাচেতনায় শিক্ষার প্রশ্নে মাতৃভাষাকে সবার ওপর স্থান দিয়েছেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করতে না পারাকে তিনি বাংলা ভাষাকে আমাদের শিক্ষা প্রসারের প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখেছেন। এক রবীন্দ্রনাথের হাত দিয়েই বাংলা বিশ্বসাহিত্য দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অসামান্য প্রতিভার অধিকারী। গল্প, নাটক, উপন্যাস প্রভৃতি সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় সমান পারদর্শী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ মাত্র পনেরো বছর বয়সে 'বনফুল' কাব্য গ্রন্থ রচনা করে বাংলাসাহিত্যে চমক সৃষ্টি করেন। তিনি আজীবন অজস্র গল্প, প্রবন্ধ রচনা করে বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটান। ১৯১৩ সালে তার বিখ্যাত 'গীতাঞ্জলী' কাব্যের জন্য এশিয়ার মধ্যে সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার পেয়ে এক দুর্লভ সম্মান অর্জন করেন। রবীন্দ্রনাথ বাংলাসাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। অপর দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জাতিসংঘে প্রথম বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়ে বিশ্বে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। দু'জন বাঙালির গৌরব ও অহংকার। একজন সাহিত্যিক কবি আরেকজন রাজনীতির কবি।

মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় সাহিত্য রচনা করে যে যশ খ্যাতি অর্জন ও বিখ্যাত হওয়া যায় না তা আমরা মাইকেল মধুসূদনের জীবনে প্রত্যক্ষ করি। প্রথম জীবনে মধুসূদন পাশ্চাত্য জীবনযাপনের প্রতি আকৃষ্ট হন। যার ফলে ইংরেজি ভাষার প্রতি তার অনুরাগ জন্মে এবং মাতৃভাষা বাংলাকে বলা যায় ঘৃণা করেন। তার অন্তরে বিশ্বাস ছিল ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা করে বিশ্ব পরিচিতি অর্জনে বিখ্যাত হবেন। তাই তিনি বড় আশা নিয়ে ইংরেজিতে রচনা করে '' গ্রন্থ। কিন্তু আশায় গুড়ে বালি। ওই গ্রন্থ। ইংরেজি সাহিত্যে সাড়া জাগাতে পারেনি। অতঃপর মধুসূদনের চৈতন্যেদয় ঘটে। তিনি নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। এ সময় তিনি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে, মাতৃভাষার মাধ্যমে সাহিত্য রচনা না করে ভুল করেছেন। মধুসূদন অনুশোচনায় দগ্ধ হন। তাই তিনি গেয়েছেন, 'হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিধি রতন; তা সবে, অবহেলা করি, পরধনলোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ, পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।' এতক্ষণে জীবনের অনেক পথ পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তিনি দমিবার পাত্র ছিলেন না। জীবনের শেষ দিকে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে প্রিয় মাতৃভাষা বাংলায় কাব্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। তিনি কঠোর পরিশ্রম করে রচনা করেন মহাকাব্য 'মেঘনাদ বধ' কাব্য। তা ছাড়াও তিনি আরো বাংলা ভাষায় কাব্য নাটক প্রভৃতি লেখে বাংলা ভাষাকে বিকশিত করেন। তিনি ছিলেন আধুনিক কবিতার জনক। মধুসূদন ছাড়াও প্রমথ চৌধুরী, সৈয়দ মুজতবা আলী, কায়কোবাদ, বঙ্কিম প্রমুখ কবিও সাহিত্যিকরা বাংলা ভাষার ভীতকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন।

মাতৃভাষা মাতৃভূমি প্রত্যেকটি মানুষের কাছে অতি পবিত্র। মাটি ও ভাষার অবমাননা কেউ সহ্য করতে পারে না। সহ্য করতে পারেনি বায়ান্ন সালের এ দেশের ভাষাসৈনিকরা, তারা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তাই বিভিন্ন মনীষী, কবি-সাহিত্যিক তাদের চেতনায় মাতৃভাষা বাংলাকে ভালো বেসেছেন। বাংলা ভাষাকে করেছেন সমৃদ্ধ। বাংলা ভাষায় কাব্য সাহিত্য রচনা করে যে সমস্ত কবি, সাহিত্যিক মাতৃভাষা বাংলায় জয়গান গেয়েছেন তারা বাংলাসাহিত্য অঙ্গনে সমাদৃত। তারা আমাদের গৌরব। আসুন আমরা দেশকে ভালোবাসি, ভাষাকে ভালোবাসি। আজকের এ মহান দিনে স্মরণ করি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙলি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যিনি জাতি সংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়ে মাতৃভাষা বাংলাকে গৌরবান্বিত করেন। স্মরণ করি বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়ে বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠা করেন। বাহান্ন থেকে একাত্তর সব শহিদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। জানাই বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে অভিনন্দন।

মোহাম্মদ নজাবত আলী: শিক্ষক ও কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে