logo
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৫ আশ্বিন ১৪২৭

  হাসান আরিফ   ১১ আগস্ট ২০২০, ০০:০০  

দেশের নিম্নমানের চামড়ার কদর নেই বিশ্ববাজারে!

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ০.৫ শতাংশ এলডবিস্নউজি সনদের জন্য প্রয়োজন ১৩৫৫ নম্বর

দেশের নিম্নমানের চামড়ার কদর নেই বিশ্ববাজারে!
কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করেন ব্যবসায়ীরা -ফাইল ছবি
বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম চামড়া উৎপাদনকারী বাংলাদেশের চামড়া নিম্নমানের হওয়ায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে পারে না। আর ওইসব দেশের নামসর্বস্ব যেসব প্রতিষ্ঠান আমদানি করত করোনার কারণে তারাও তা বন্ধ রেখেছেন। এদিকে দেশের চামড়ার প্রধান ক্রেতা চীনও করোনার কারণে আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ২০২১ সালের মধ্যে চামড়া খাত থেকে ৫০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শংকিত সংশ্লিষ্টরা।

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ভালো মানের কোনো চামড়া রপ্তানি করা যায় না, তার কারণ হচ্ছে- চামড়া বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রম্নপের (এলডবিস্নউজি) অনুমোদনহীন কোনো ট্যানারি থেকে চামড়া কেনে না ওই দেশ দুটির বড় ব্র্যান্ডগুলো। আর বাংলাদেশের চামড়া শিল্পে সংশ্লিষ্টরা সেই অনুমোদন অর্জন করতে পারেনি।

এলডবিস্নউজির অনুমোদন পেতে হলে প্রতিটি ট্যানারির কমপস্নায়েন্সের জন্য এক হাজার ৩৫৫ নম্বর পেতে হবে। এই নম্বরের কম হলে এলডবিস্নউজি কমপস্নায়েন্স অনুমোদন দেয় না। আর কমপস্নায়েন্স না হলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ক্রেতারা তা আমদানি করে না।

অন্যদিকে ট্যানারিগুলোতে ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্যের পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানদন্ডের চেয়ে উলেস্নখযোগ্য হারে বেশি। ফিনিশড চামড়ায় রাসায়নিক দ্রব্যের উপস্থিতির মাত্রা ইউরোপীয় ইউনিয়নের রিচ (রাসায়নিক দ্রব্যাদির নিবন্ধন, মূল্যায়ন, অনুমোদন ও বিধিনিষেধ) মানদন্ডের সঙ্গে একেবারেই সঙ্গতিপূর্ণ না।

সূত্রে জানা গেছে, এক হাজার ৩৫৫ নম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) হাতে রয়েছে ২০০ নম্বর। আর বাকি এক হাজার ১৫৫ নম্বর কারখানা কর্তৃপক্ষের নিয়ম মানার মধ্যে নির্ধারণ করা হয়। এই নম্বর পেতে হলে পানির ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রাসায়নিকের ব্যবহার, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং অন্য বিষয়গুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এক টন চামড়া প্রক্রিয়া করতে ৩০ হাজার টন পানি ব্যবহার করতে হয়। বিপরীতে বাংলাদেশের ট্যানারিগুলোতে একটন চামড়ার জন্য ৭০ হাজার টন পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সাধারণ পানির জন্য ব্যবহার করা ড্রেনেজ এবং রিজার্ভ ট্যাংকি রাসায়নিক বর্জ্যর জন্য ব্যবহার করা যাবে না। এ জন্য আলাদা আলাদা ড্রেনেজ এবং রিজার্ভ ট্যাংক ব্যবহার করতে হবে। আর এসব ট্যাংকে দুদিনের বর্জ্য মজুত রাখার মতো ব্যবস্থা থাকতে হবে, যা অধিকাংশ কারখানার নেই।

বিসিক চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমেদ এনডিসি বলেন, একটি কারখানার কমপস্নায়েন্স পাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের চামড়া প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে মানতে হবে। সঠিকভাবে নিয়ম মানলেই এলডবিস্নউজি কমপস্নায়েন্স অনুমোদন দেয়। আর বিসিকের হাতে থাকা ২০০ নম্বর নিয়ে কোনো সমস্যা হয় না। কারণ বিসিক তার হাতে থাকা নম্বর দিতে কার্পণ্য করে না। তবে সাভার চামড়া শিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) কিছুটা সমস্যা রয়েছে, যা অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। এই সিইটিপি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্ব বৃহত্তম সিইটিপি বলেও তিনি জানান।

এলডবিস্নউজি সনদ না থাকার ফলে এখন ফিনিশড লেদার বা প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানিতে ভরসা একমাত্র চীন। দেশটিতে মোট ফিনিশড লেদারের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ রপ্তানি হয়। এছাড়া ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেন, জাপানেও কিছু রপ্তানি হয়। তবে চামড়াজাত পণ্য ও চামড়ার তৈরি জুতা রপ্তানি হয় ইউরোপ, আমেরিকা, ফ্রান্সসহ প্রায় সব দেশেই।

প্রতিনিয়তই দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ চামড়া রপ্তানি খাত পিছিয়ে পড়েছে। এরপর চীনের কিছুটা বাজার ধরতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ; কিন্তু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে চীনের বাজারেও রপ্তানি কমে আসে। গত জানুয়ারি থেকে চীনে করোনা সংক্রমণের কারণে এই বাজারেও ধস নেমেছে। এখন দেশের দ্বিতীয় রপ্তানি খাত চতুর্থ অবস্থানে এসেছে। করোনা সংক্রমণ কেটে গেলে চীনের বাজারে রপ্তানিতে সুদিন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। আর মানোন্নয়ন করতে পারলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাজার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেন, দেশের প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির প্রধান বাজার হচ্ছে চীন। করোনার কারণে দেশটিতে আমাদের রপ্তানি বন্ধ থাকায় উৎপাদিত পণ্যগুলো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

জানা যায়, ২০২১ সালের মধ্যে চামড়া খাত থেকে ৫০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ২০১৭ সালে চামড়াকে 'প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার' ঘোষণা করেছিল সরকার।

রপ্তানি উন্নয়ন বু্যরো-ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে করোনার কারণে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তুলনায় ৬ দশমিক ০৬ শতাংশ কমে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১০১৯ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই খাত থেকে রপ্তানি আয় কমে যায় ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ কমে ২০১৭-১৮ রপ্তানি হয় ১০৮৫ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ১২৩৪ মিলিয়ন ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়ে ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১১৬০ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন ডলার।

সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরের (জুলাই-মার্চ) আট মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি হয়েছে ৬৩ কোটি ১৮ লাখ ডলারের সমপরিমাণ। আগের অর্থবছরে একই সময়ের চেয়ে যা ৯ শতাংশ কম। আর এই আট মাসের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সাড়ে ১২ শতাংশ কম। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আট মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি হয়েছিল ৬৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। চলতি বছর আট মাসে এ খাতের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭২ কোটি ২২ লাখ ডলার। বর্তমানে বিশ্ব চামড়া বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার মাত্র ০ দশমিক ৫ শতাংশ। যদিও বিশ্বে চামড়া উৎপাদনের দিক থেকে ১১তম বাংলাদেশ।

করোনার কারণে সারা বিশ্বই ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশেরও সব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশের পুরো অর্থনীতি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এতে চামড়া খাত আরও বিপাকে পড়েছে। কারণ এই খাতের সংকট ২০১৭ সালে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকেই শুরু। বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা মতো পরিবেশবান্ধব কারখানার চামড়া দিতে না পারায় ব্যবসা হারাতে হয়েছে। ক্রেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে অন্য দেশে চলে গেছেন। সাভার চামড়া শিল্পনগরী কমপস্নায়েন্স না হওয়ায় গত কয়েক বছর বেশিরভাগ চামড়া অবিক্রীত থাকায় নষ্ট হয়েছে। হঠাৎ করে ট্যানারিগুলোর কাজ বন্ধ থাকায় এবং কমে যাওয়ায় মজুত চামড়ায় রাসায়নিকের কার্যকারিতা হারিয়ে নষ্ট হয়েছে। আর এখন পর্যন্ত নন-কমপস্নায়েন্স থাকার কারণে কারখানাগুলোতে উৎপাদন চালু করেও চামড়া বিক্রি করা যায়নি। এ সময় ইউরোপের বড় বাজার হারাতে হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শিল্পোৎপাদন ও জিডিপিতে খাতটির অবদার যথাক্রমে ২ শতাংশ ও ০ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে সরাসরি নিয়োজিত ছিল ৫ লাখ ৫৮ হাজার জন। এছাড়া আরও ৩ লাখ লোক এ খাত সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে কাজ করে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রপ্তানি আয়ে পোশাক খাতের পরই ছিল চামড়া খাতের অবস্থান।

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন বলেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ খাতের ব্যবসানির্ভর কারছে মাত্র ১৫৫টি ট্যানারির ওপর। এর সঙ্গে কোটি লোকের জীবন ও জীবিকা জড়িয়ে আছে। চামড়া শিল্পনগরীর মূল দায়িত্বে থাকা বিসিক সমস্যা সমাধানে শামুক গতিতে চলছে। এতদিনেও বিসিক শিল্পনগরী কমপস্নায়েন্স করতে পারেনি। দুই মাস আগে চামড়া খাতের টাস্কফোর্সের বৈঠকে সমস্যা সমাধানের বেশকিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে অনেক সমস্যার সমাধান আসবে বলে তিনি মনে করেন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে