logo
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৫ আশ্বিন ১৪২৭

  যাযাদি রিপোর্ট   ১১ আগস্ট ২০২০, ০০:০০  

সংবাদ সম্মেলনে সিনহার মা নাসিমা আক্তার

এটাই যেন শেষ হত্যাকান্ড হয়

সিনহাকে ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে -রাওয়া চেয়ারম্যান জামিনে মুক্ত সিফাত, নিয়ে যাওয়া হয়েছে তদন্তকারীদের কাছে স্পর্শকাতর তথ্য দিয়েছে শিপ্রা -সংবাদ সম্মেলনের্ যাব পুলিশের দায়েরকৃত দুই মামলারও তদন্তের্ যাব

এটাই যেন শেষ হত্যাকান্ড হয়
কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে নিহত সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের উত্তরার বাসায় সোমবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা করেন তার মা নাসিমা আক্তার -ফোকাস বাংলা
'সিনহার মৃতু্যর ঘটনাই যেন শেষ ঘটনা হয়। দেশে যেন এ ধরনের বিচারবহির্ভূত একটিও হত্যাকান্ড না ঘটে। তবে পুলিশের তদন্তে আমরা সন্তুষ্ট'। গতকাল সোমবার দুপুরে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠন রাওয়ার সদস্যরা সিনহার উত্তরার বাসায় গেলে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান তার মা নাসিমা আক্তার। সংবাদ সম্মেলনে এ সময় রাওয়ার প্রেসিডেন্ট মেজর (অব.) খন্দকার নুরুল আফসার বলেন, ঠান্ডা মাথায় সিনহাকে খুন করা হয়েছে।

এদিকে মামলার সর্বশেষ অবস্থা জানাতে বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করের্ যাব সদর দপ্তর। সেখানের্ যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিলস্নাহ জানান, পুলিশের দায়েরকৃত মামলার আসামি এবং সদস্য জামিনে মুক্তি পাওয়া শিপ্রা দেবনাথ চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। সিফাতের সঙ্গেও কথা বলবে তদন্তকারী কর্মকর্তারা। চাঞ্চল্যকর এই মামলার বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার জন্যর্ যাব সদর দপ্তর থেকে একটি বিশেষায়িত টিম কক্সবাজারে যাবে। পাশাপাশি পুলিশের দায়েরকৃত টেকনাফ থানার দুটি মামলাও তদন্ত করবের্ যাব। এছাড়া কারা ফটকে জিজ্ঞাসাবাদে ৪ জনও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। সাবেক ওসি প্রদীপসহ তিনজনকেও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়েছে।

জানা গেছে, গতকাল দুপুরে রাওয়া ক্লাবের সদস্যরা যান পুলিশের গুলিতে নিহত অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহার উত্তরার ১৪নং সেক্টরের বাড়িতে। এ সময় তারা কিছু সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন সিনহার মা নাসিমা আক্তার, বোন শারমিন শাহরিয়া, রাওয়ার প্রেসিডেন্ট মেজর (অব.) খন্দকার নুরুল আফসার ও সেক্রেটারি লে, কর্নেল (অব.) এএম মোশারফ হোসেন।

প্রথমে সংবাদিকদের সাথে কথা বলেন মা নাসিমা আক্তার। এ সময় তিনি বলেন, 'তদন্ত কার্যক্রমে আমি সন্তুষ্ট। প্রধানমন্ত্রী আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। সেনা ও নৌবাহিনী প্রধান খোঁজখবর নিয়েছেন। তারা আশ্বাস দিয়েছেন। এই যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডটি ঘটল। প্রত্যেক মায়ের প্রতিনিধি হয়ে বলব। এটাই যেন শেষ হত্যাকান্ড হয়। সবাই যেন সচেতন থাকেন। আমার ছেলে পজিটিভ ছিল। সব সময় বি পজিটিভ। আমিও বি পজিটিভের পক্ষে আছি। আপনাদের সাংবাদিকদের লেখা আমি পড়েছি। দেশের সুন্দর পরিবেশ আপনারাই আনবেন।'

নাসিমা আক্তার বলেন, 'সিনহা মেজর না কি তা কখনো পরিচয় দিত না। ব্যবহার দিয়েই সবকিছু করার চেষ্টা করত। ওর কাজগুলোকে আমি এপ্রিসিয়েট করি। সিনহা বলত, একটা মানুষের যে মানবিক গুণাবলিগুলো থাকে তা দিয়েই যদি মানুষ মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে এর চেয়ে আর কি বড় হতে পারে। আমার ছেলে দেশকে নিয়ে অনেক ভাবত। ছেলে আমাকে বলত, আমরা যদি দেশে ভালো কিছু রেখে যাই তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেটা অনুসরণ করবে। আমার ছেলের প্রত্যেকটি কাজকর্মে আমার পূর্ণ সমর্থন ছিল। ভেতরে ভেতরে আমি খুবই গর্ববোধ করতাম। ও শুধু কাজ করতেই চাইত। আত্মীয়স্বজন বলত, ও কী কাজ করে ওর কি কোনো টাকাপয়সা আসে না? কিন্তু সিনহা আসলে সবসময় ক্রিয়েটিভ কাজ করতে চাইত, সব সময় সারপ্রাইজ দিতে চাইত কাজের মাধ্যমে। ও বলত, আমি আমার মনের খোরাকের জন্য কাজ করি, যাতে মানুষ উপকৃত হয়। একটা ডকুমেন্টারি করছি এখনো বলার মতো কিছু হয়নি, যখন হবে তখন বলব। সেদিন (৩১ জুলাই) ফোন ধরছিল না ব্যাকও করছিল না। রাত ১২টা আনুমানিক। এক ভদ্রলোক ফোন করলেন। বললেন, সিনহা কী হয়, কী করে। কয় ছেলেমেয়ে। উত্তর দিয়ে জানতে চাইলাম, এত প্রশ্ন করতেছেন আপনি কে? তখন তিনি বলেন, আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছেন কেন? আমি টেকনাফ থানার ওসি। ভাবলাম ছেলে তো স্পিডে গাড়ি চালায়। আবার কী হলো কি না। বললাম আমার ছেলে তো ফোন ধরছে না ওকে একটু দেন। ফোনটা বাজতেছে কিন্তু ধরছে না। ওসি বলে, হঁ্যা একটু দূরেই আছে। দেয়া যাবে। বলেই রেখে দেন। কিন্তু বারবার ফোন দেই আর কেউই ফোন ধরে না।'

সিনহার মা বলেন, 'একসময় দুই মেজরের নম্বর দিয়েছিল সিনহা। ফোন দিলাম মেজর মোহসিনকে। জানতে চাইলাম সিনহার খবর। বললাম, ফোন ধরছে না। পরে জানাল টেনশন কইরেন না। সিনহা ঠিক আছে। পরদিন ১০টা ১১টা বাজে। বাসায় পুলিশ আসে। উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। তারা মেজর সিনহার বাসা কি না জানতে চেয়ে খোঁজখবর নেয়। রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কি না, দেশের বাড়ি কোথায় জানতে চায়। বলি, রাজনীতিতে জড়িত নয় শতভাগ নিশ্চিত। ওরা ভালো ব্যবহার করে চলে যায়। তারাও কিছু জানায়নি। '

সিনহাকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে :রাওয়া চেয়ারম্যান

সিনহার মায়ের কথা শেষ হওয়ার পর কথা বলেন রাওয়ার প্রেসিডেন্ট মেজর (অব.) খন্দকার নুরুল আফসার। এ সময় তিনি বলেন, সিনহা হত্যার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে এ পর্যন্ত আমরা দেখেছি সরকারের মনোভাব পজিটিভ। আমরা আবেদন করব, যাতে সিনহা হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত না হয়। ইতোমধ্যে পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও তথ্য-প্রমাণে প্রতীয়মান যে, সিনহাকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যা যেন আর না হয়। তিনি দাবি উত্থাপন করে বলেন, আমরা চাই মেজর (অব.) সিনহার হত্যাকান্ডের ঘটনায় কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মাসুদ হোসেনকে যেন অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করা হয়। সিনহার ঘটনায় যারা কাস্টডিতে ছিলেন তাদের জামিন হয়েছে। আমরা অত্যন্ত খুশি, আলহামদুলিলস্নাহ। সিনহা হত্যায় যে পুলিশ সদস্যরা জড়িত ছিল তাদের অস্ত্রগুলো যেন জব্দ করা হয়। হয়তো তদন্তের খাতিরে এটা করতেই হবে। যাদের ওপর তদন্তভার অর্পণ করা হয়েছে তারা অত্যন্ত দক্ষ। আমরা আশা করব তারা ট্রান্সপারেন্সি (স্বচ্ছতা) রক্ষা করবেন। কোনো পক্ষাবলম্বন করবেন না। সিনহা হত্যার বিচার যদি দ্রম্নত নিষ্পত্তি হয় তাহলে হয়তো সিনহা বা সিনহার মতো ভুক্তভোগীর আত্মা শান্তি পাবে।

আমি গর্বিত সিনহার মতো একটা ভাই ছিল :শারমিন

রাওয়া প্রেসিডেন্ডের কথা শেষ হওয়ার পর কথা বলে সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া। তিনি বলেন, 'আমি খুবই গর্বিত যে ওর মতো একটা ভাই আমার ছিল। যাকে এত মানুষ ভালোবেসে ছিল, এত মানুষ ভালোবাসে। ভাই সিনহার মৃতু্যর পর তা আমি দেখতে পেয়েছি।' 'আমি ওকে বলতাম, তুমি হচ্ছো মানুষের হৃদয়ের রাজপুত্র। সেটা সে (সিনহা) প্রম্নভড করেছে নিজের ভালোবাসা আর মানবিক গুণাবলি দিয়ে। আমি বিচারের কথা বলতে এখানে আসিনি। যেহেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন, যে বিচারটা হবে।'

শারমিন বলেন, আমাদের একটা আবেদন থাকবে সঠিক তদন্ত করে দ্রম্নতই যেন বিচার পাই। এটা যেন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, অন্যদের যেন মোটিভেট করে যে, আমরা আসলেই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমাদের দেশে আইন আছে। আমাদের দেশে বিচার হয়। এটাই আমরা চাই।

জামিনে মুক্ত সিফাত :মামলার তদন্তর্ যাবে

এদিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সাহেদুর রহমান ওরফে সিফাত। সোমবার দুপুর সোয়া দুটায় তিনি কারা ফটকে পৌঁছলে সাদা পোশাকধারী লোকজন তাকে দ্রম্নত নম্বরবিহীন একটি মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যান। গণমাধ্যমকর্মী ও কারা ফটকে উপস্থিত স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি তিনি। এর আগে বেলা ১১টায় সিফাতের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক তামান্না ফারাহ। রোববার দুপুরে জামিন পান সিনহার দলে থাকা আরেক সদস্য শিপ্রা দেবনাথ। সিফাত ও শিপ্রা স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। গত ৩ জুলাই সিনহার সঙ্গে শিপ্রা, সিফাতসহ তিনজন কক্সবাজার যান ভ্রমণবিষয়ক ভিডিওচিত্র ধারণ করতে। গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের মারিষবুনিয়া পাহাড়ে ভিডিওচিত্র ধারণ করে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকার নীলিমা রিসোর্টে ফেরার পথে শামলাপুর তলস্নাশিচৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা। এ সময় পুলিশ সিনহার সঙ্গে থাকা সিফাতকে আটক করে কারাগারে পাঠায়। সেই থেকে তিনি কক্সবাজার কারাগারে বন্দি আছেন। সোমবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থিত হয়ে সিফাতের জামিন আবেদন করেন কক্সবাজারের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ মোস্তফা। শুনানি শেষে আদালতের বিচারক তামান্না ফারাহ জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে পুলিশের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) পরিবর্তন করের্ যাবের হাতে ন্যস্ত করার আবেদনও মঞ্জুর করেন আদালত।

উলেস্নখ্য, শুক্রবার (৩১ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর সিনহা রাশেদ খান। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন ও নিরাপত্তা বিভাগ। একইভাবে তদন্তের স্বার্থে টেকনাফের বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ লিয়াকত আলিসহ ১৬ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনার পরে ৫ আগস্ট বুধবার কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন মেজর সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। মামলাটির শুনানিতে সন্তুষ্ট হয়ে তা 'ট্রিট ফর এফায়ার' হিসেবে আমলে নিতে টেকনাফ থানাকে আদেশ দেন আদালতের বিচারক। আদালতের নির্দেশে টেকনাফ থানায় মামলাটি রুজু হয়। দন্ডবিধি ৩০২, ২০১ ও ৩৪ জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা নং সিআর :৯৪/২০২০ইং/টেকনাফ। এই মামলায় ৭ জন আত্মসমর্পণ করেন। আদালত তিন দফা শুনানি শেষে তাদের সবাইকে ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আসামিরা হচ্ছেন, টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, গুলিবর্ষণকারী ইন্সপেক্টর লিয়াকত, এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুলস্নাহ আল মামুন ও এএসআই লিটন মিয়া। মামলার অপর দুই আসামি এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মোস্তফার নামে জেলায় কোনো পুলিশের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে