সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯
walton1
পটুয়াখালীর ৪ আসন

ভাগবাঁটোয়ারায় কপাল পুড়বে হেভিওয়েটদের!

আব্দুস সালাম আরিফ, পটুয়াখালী
  ২৫ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০০
রুহুল আমিন হাওলাদার
আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ অবস্থান পাকাপোক্ত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পটুয়াখালী জেলার চারটি সংসদীয় আসনেও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে জেলার আসনগুলোতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির পাশাপাশি জাতীয় পার্টি, জামায়াত ও গণ-অধিকার পরিষদের প্রার্থীরা আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির আসনে ভাগ বসাতে পারেন। আর এ ক্ষেত্রে জোটের আকার আকৃতির ওপর নির্ভর করে বড় দুই দলের হেভিওয়েট প্রার্থীদের কপাল পুড়বে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা। পটুয়াখালী-১: সদর উপজেলা, দুমকি ও মির্জাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী সংসদীয় আসন-১। এই আসনে বর্তমান আওয়ামী লীগের এমপি অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়া আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এই আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন। তবে বয়সের কারণে শাহজাহান মিয়াকে মনোনয়ন না দিলে তার মেঝো ছেলে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট তারিকুজ্জামান মনি নৌকার মাঝি হতে চান। এছাড়া কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেনেরও স্বপ্ন আছে পটুয়াখালী-১ আসনে এমপি হওয়ার। সাবেক সদর উপজেলা ও পৌরসভা চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতান আহম্মেদ মৃধাও আছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায়। তবে সবার স্বপ্নের গুঁড়েবালি হতে পারে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির জোট কিংবা আসন ভাগাভাগিতে। অতীত অভিজ্ঞতায় জানা যায়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-১ আসনটি আওয়ামী লীগের কাছ থেকে বাগিয়ে নেয় জাতীয় পার্টি। সে সময় জাতীয় পার্টির তৎকালীন মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পটুয়াখালীতে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল হলেও সে সময় আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা রুহুল আমিনের লাঙ্গল প্রতীকের জন্য মাঠে কাজ করেছিলেন। ভোটের মাঠে সেস্নাগান ছিল 'এই আসনে নৌকা নাই, লাঙ্গল হলো নৌকার ভাই।' তবে দ্বাদশ সংসদীয় নির্বাচনেও তেমনটি হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। \হযেহেতু রাজনীতিতে শেষ বলে কোনো কথা নেই, সে হিসেবে যদি জাতীয় পার্টির সাথে বিএনপি'র কোনো ধরনের ঐক্য কিংবা নির্বাচনী সমঝোতা হয় তখনও পটুয়াখালী-১ আসনটি চাইবে জাতীয় পার্টি। সে ক্ষেত্রে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্সাল আলহাজ আলতাফ হোসেন চৌধুরী এই আসন থেকে ছিটকে পড়বেন। তবে বিএনপির থেকে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের দুশ্চিন্তা বেশি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে পটুয়াখালী-১ আসনের এমপি শাহজাহান মিয়ার ছেলে অ্যাডভোকেট মো. তারিকুজ্জামান মনি বলেন, 'পটুয়াখালী-১ আসনটি মূলত নৌকার ঘাঁটি, সুষ্ঠু নির্বাচনে এই আসনটি সব সময় নৌকার ঘরেই গেছে। আমি যেহেতু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, আমার বাবা বর্তমান এমপি। আমার প্রত্যাশা থাকবে আগামী সংসদ নির্বাচনেও এই আসনটি অবশ্যই নৌকার প্রার্থীকেই দেওয়া হবে। নেত্রী যাকে মনোনয়ন দেবেন আমরা তার পক্ষেই কাজ করব।' পটুয়াখালী-২: জেলার বাউফল উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন পটুয়াখালী-২। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় এই আসনটি অধিকাংশ সময় নৌকার দখলেই ছিল। এই আসনে গত সাত দফায় এমপি হয়েছেন সাবেক চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ। তবে আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আসটিতে আওয়ামী লীগের গ্রম্নপিং অনেকটা চাঙ্গা। এ কারণে এই আসনে রয়েছে দলের একাধিক প্রার্থী। আ স ম ফিরোজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হচ্ছেন বাউফলের পৌর মেয়র জিয়াউল হক জুয়েল। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়ন দৌড়ে জোর তদবির চালাচ্ছেন। অপরদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে এই আসনে সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল আলম, কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা মনিরুল ইসলামসহ একাধিক প্রার্থী থাকলেও এই আসনটিতে আছে জামায়াতের হেভিওয়েট প্রার্থী ডা. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের দুশ্চিন্তা না থাকলেও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। রাজনৈতিক সমঝোতা কিংবা জোটের সমীকরণে এই আসনটি জামায়াত তাদের দখলেই রাখতে চায়। সেই লক্ষ্য নিয়ে ডা. শফিকুল ইসলাম মাসুদের পক্ষে গোপনে এবং প্রকাশ্যে বিভিন্ন প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাউফলের পৌর মেয়র ও পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হক জুয়েল বলেন, 'আগামী সংসদ নির্বাচনে আমি দল থেকে মনোনয়ন চাইব। আমি মনে করি তৃণমূলের মূল্যায়ন করলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দেবেন। আর সে লক্ষ্য নিয়েই আমি সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছি।' পটুয়াখালী-৩ : পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন পটুয়াখালী-৩। এই আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও নিয়মিত রাজনৈতিক আসন ভাগ-বাটোয়ারায় সব সময় বেশি হাত বদল হয় এই আসনটি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে নৌকার প্রার্থী হয়েছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি। আর দশম সংসদ নির্বাচনে সাবেক বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসেন আবারও তার হারানো আসন ফিরে পান। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভাগ-বাটোয়ারায় আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসেনকে মনোনয়ন না দিয়ে সাবেক সিইসি কেএম নুরুল হুদার ভাগ্নে এসএম শাহজাদাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। রাজনৈতিক মাঠে কোনো পদ পদবি না থাকলেও মামার আবদারে আসনটি বাগিয়ে নেন শাহজাদা। তবে এবার এই আসনে হয়তো নতুন কোনো মুখের দেখা মিলবে। সে ক্ষেত্রে আলোচনায় এগিয়ে আছেন পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী আলমগীর হোসেন। তৃণমূল থেকে বেড়ে ওঠা এই নেতা জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। দলীয় ভাগ বাটোয়ারায় আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে আসনটি থাকলেও বিএনপির পরিস্থিতি ভিন্ন। পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলায় আছেন গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব ডাকসু'র সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরু। তার বাড়ি গলাচিপায় হওয়ায় ইতোমধ্যে তিনি নেতাকর্মীদের সংগঠিত করছেন। বিএনপি কিংবা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে আসন ভাগাভাগিতে নুরু এই আসন থেকে যেভাবেই হোক হয়তো নির্বাচনে মাঠ দখলের চেষ্টা করবেন। তবে বিএনপি নির্বাচনমুখী হলে ভাগ বাটোয়ারায় এবারো বিএনপির জনপ্রিয় প্রার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য হাসান আল মামুনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সৃষ্টি হবে। কারণ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলে এক সময়ের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি। সে সময়েও হাসান আল মামুনকে মনোনয়ন দিয়েও তা প্রত্যাহার করে নেয় বিএনপি। তবে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গলাচিপা-দশমিনা আসনে ভোটের মাঠে গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব নুরুল হক নুর কতটুকু তার অবস্থান কিংবা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারবেন তা নিয়ে সন্দিহান স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। পটুয়াখালী-৪: পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালী উপজেলা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী সংসদীয় আসন পটুয়াখালী-৪। তবে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের দখলে থাকলেও এটি আওয়ামী লীগ বিএনপির বাহিরে তেমন হেভিওয়েট কোনো প্রার্থী নেই। বর্তমানে এই আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য রয়েছেন মহিব্বুর রহমান মহিব। এর আগে নবম ও দশম সংসদে এখানে এমপি ছিলেন আওয়ামী লীগের মাহবুবুর রহমান তালুকদার। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে এই দুই প্রার্থীর মধ্যে যে কোনো একজন মনোনয়ন পেতে পারেন। তবে গুঞ্জন রয়েছে আসন ভাগাভাগিতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের একাধিক সিনিয়র নেতাকে এই আসনে পুনর্বাসন করা হতে পারে। পটুয়াখালী-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন। তবে পটুয়াখালী জেলায় আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে চারটি সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগ ব্যতীত অন্য কোনো বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের প্রস্তুতি কিংবা প্রচার প্রচারণা দেখা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে জোটের রুপ রেখা নির্ধারিত হলে সম্ভাব্য দলীয় প্রার্থীদের পদচারণা দেখা যাবে বলে মনে করেন জেলার সাধারণ ভোটাররা। তবে নির্বাচনে রাজনৈতিক মেরুকরণ যাই হোক না কেন চারটি আসনের বেশ কয়েকটিতেই আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির কোনো না কোন প্রার্থীকে দলের স্বার্থে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হবে-এটা নিশ্চিত। আগামীকাল পড়ুন : পাবনা-১ আসনের বিস্তারিত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে