logo
রবিবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১২ মাঘ ১৪২৬

  যাযাদি রিপোর্ট   ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

সুন্দরবনের জন্য ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প

সুন্দরবনের জন্য ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন -সংগৃহীত
জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বন ব্যবস্থাপনা, বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি এবং পর্যটনের সম্ভাবনাকে ঘিরে সুন্দরবন সুরক্ষায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে।

আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের জন্য প্রচেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুলস্নাহ আল মোহসীন চৌধুরী।

তিনি বলেন, 'সুন্দরবন সুরক্ষা প্রজেক্ট এখন পস্নানিং কমিশনে রয়েছে; পাস হয়নি। পর্যালোচনা করে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।'

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের এই প্রকল্পে বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য বড় বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানান মোহসীন।

তিনি বলেন, 'আমরা বড় আকারের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরে দিয়েছিলাম। ৩৫০-৪০০-এর মধ্যে একটা ফিগার হবে; এখনো ফাইনাল হয়নি। বনের ক্ষয়ক্ষতি রোধে ব্যবস্থা হবে; যারা বনের ক্ষতি করত, তাদের হাত থেকে অনেকখানি রক্ষা পাবে।'

ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন ঘিরে নানা কর্মকান্ডের জন্য পরিবেশবাদীরা রয়েছেন উদ্বিগ্ন। তবে এই প্রকল্প পাস হলে সুন্দরবন সুরক্ষার কাজ আরও একধাপ এগুবে বলে মনে করেন সচিব মোহসীন।

বন অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. মঈনুদ্দিন খান মনে করেন, বনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় মানুষের বনে প্রবেশ কমানো গেলে সুন্দরবনের ক্ষতি কম হবে।

তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে তো সুন্দরবনকে রক্ষা করা যাবে না। তবে বনের ওপর নির্ভরশীল মাওয়ালী-বাওয়ালী রয়েছে, তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান করতে পারলেই তারা সুন্দরবনে আর আসবে না। এ জন্য প্রকল্পে সেই বন্দোবস্ত থাকছে বলে জানান মঈনুদ্দিন খান।

তিনি বলেন, 'তাদের প্রশিক্ষণ, আবাসন ও অফিস মেরামত, নতুন অবকাঠামো ও পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন বৃদ্ধি; বিকল্প আয়ের ব্যবস্থায় কিছু ঋণের ব্যবস্থা করা- এসব নিয়েই সুরক্ষা প্রকল্প।'

এই বন কর্মকর্তা বলেন, 'সুন্দরবনে যত মানুষ কম ঢুকবে, তখনই ন্যাচারেল ইকু সিস্টেম ডেভেলপ করবে। এ জন্য আমরা চাইছি, সুন্দরবনের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা কমাতে।'

বন কর্মকর্তা বনজীবীদের নিয়ে বেশি চিন্তিত হলেও পরিবেশবাদী অনেকের তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। তারা বলছেন, বনজীবীরা নয়, বরং বনের আশপাশ ঘিরে নেয়া বিভিন্ন বড় প্রকল্পই বনের প্রধান ক্ষতির কারণ।

কী আছে প্রকল্পে

হ সুন্দরবনের ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে পুকুর খনন, টহলফাঁড়ি নির্মাণ, ফাইবার বডি ট্রলার ক্রয়, পন্টুন গ্যাংওয়ে নির্মাণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ আধার এবং স্টাফদের প্রশিক্ষণ প্রদান।

হ সুন্দরবন নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা-নির্বাহ নিশ্চিতকরণে পলস্নী সঞ্চয় ব্যাংকের মাধ্যমে ৫০,০০০ নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ৩০,০০০ সম্পদ সংগ্রহকারীর আইডি কার্ড প্রদান।

হ সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে সুন্দরবন সুরক্ষায় সহায়তা করার লক্ষ্যে কমিউনিটি পেট্রোল গ্রম্নপের সদস্যকে ভাতা প্রদান।

হ সুন্দরবনের অভ্যন্তরে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভরাট হয়ে যাওয়া খাল/নদীসমূহ পুনর্খনন করা।

হ বিজ্ঞানভিত্তিক বন-ব্যবস্থাপনার উদ্দেশে সুন্দরবনের বনজসম্পদ, মৎস্যসম্পদ, বাস্তসংস্থান-সংক্রান্ত সার্ভে ও তথ্য সংগ্রহ করা।

খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার প্রায় ৬,০১,৭০০ হেক্টর নিয়ে বাংলাদেশের সুন্দরবন, যা দেশের আয়তনের ৪.১৩ শতাংশ এবং বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির ৩৮.১২ শতাংশ। সুন্দরবনের তিনটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য নিয়ে গঠিত ১,৩৯,৭০০ হেক্টর বনাঞ্চলকে ইউনেস্কো ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে।

সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, পশুর, বাইন, কাকড়া ইত্যাদি এই প্রাকৃতিক বনের প্রধান বৃক্ষ প্রজাতি। বন্যপ্রাণীর মধ্যে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, বানর, শুকর, কুমির, ডলফিন, গুইসাপ ও অজগর।

বুলবুলে 'তেমন ক্ষতি হয়নি'

বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে থাকা সুন্দরবন বেশ কয়েকটি ঝড়ে উপকূলীয় এলাকার ঢাল হিসেবে কাজ করেছে বলে জানমালের ক্ষতি কম হয়েছে।

দুইদিন আগে আঘাত হানা অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ক্ষেত্রেও একই ভূমিকা রেখেছে সুন্দরবন। এখন ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে বনবিভাগ কাজ করছে। এই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে চাইছে তারা।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহসীন চৌধুরী বলেন, 'এখন অ্যাসেসমেন্ট চলছে। পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে একটু সময় লাগবে। খুব বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে আমরা এখনো খবর পাইনি। কিছু গাছপালা ভাঙছে, ছোটোখাটো অবকাঠামো নষ্ট হওয়ার তথ্য পেয়েছি।'

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মঈনুদ্দিন খান জানান, মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ চলছে। ঝড়ের সময় নিরাপদ স্থানে সরে এসেছিলেন বন কর্মকর্তারা। সোমবার থেকে তারা সংশ্লিষ্ট এলাকায় গেছেন। কয়েকদিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তথ্য আসবে।

তিনি বলেন, 'এ পর্যন্ত তথ্য রয়েছে- স্টাফদের থাকা, জেটি, পন্টুন, কাঠের অবকাঠামো, জরাজীর্ণ ঘর, গোলপাতার ছাউনি- এগুলোর ক্ষতি হয়েছে। মেরামত করতে হবে। গাছপালার বিষয়ে এখনো তথ্য পাইনি।'

'আমরা লাকি। আমাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যে আশঙ্কা করেছিলাম, তার থেকেও অনেক কম হয়েছে,' বলেন মঈনুদ্দিন।

সুন্দরবন বাঁচাতে হবে

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সোমবার এক বিবৃতিতে ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সুন্দরবনের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে এই প্রাকৃতিক বর্ম রক্ষায় আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

টিআইবির পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'অধিকাংশ ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে সুদৃঢ় বর্ম হয়ে এই অঞ্চলকে রক্ষায় সুন্দরবনের অবদান অনস্বীকার্য। এর আগেও প্রলয়ঙ্করী সিডর, আইলাসহ আরও বহু মহাদুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপকতর হতে দেয়নি প্রকৃতির এই অপার সৃষ্টি।

শুধু দুর্যোগ থেকে রক্ষায় নিরাপত্তা বেষ্টনি হিসেবেই নয়, সুন্দরবন এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম রক্ষাকবচ। তাই সুন্দরবন রক্ষায় বাংলাদেশকেই সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতে হবে।'
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে