logo
শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

দ্রব্যমূল্য বাড়ার জন্য দায়ী শাসকদলীয় ব্যবসায়ী জোট

বিএনপির সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল: বিদু্যতের দাম বাড়ালে কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা

দ্রব্যমূল্য বাড়ার জন্য দায়ী শাসকদলীয় ব্যবসায়ী জোট
রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পাশে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ড. মঈন খান -যাযাদি
যাযাদি রিপোর্ট

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে শাসকদলীয় 'ব্যবসায়ী জোট'কে দায়ী করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পর এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-শান্তি কেড়ে নিচ্ছে বর্তমান ভোটারবিহীন সরকার। তার মতে, দ্রব্যমূল্যসহ জনজীবনের সব স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে সহনীয় মাত্রায় রাখতে হলে একটি জবাবদিহিতামূলক সরকার গড়ে তুলতে হবে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বোভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রক্ষার জন্য অবিলম্বে এ অবৈধ ভোটারবিহীন তথাকথিত নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনের সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায় শুধু দ্রব্যমূল্যভিত্তিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাই নয়, জাতির গোটা ভবিষ্যৎ জীবন আরও অসহনীয় ও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।

মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব এসব কথা বলেন। মূলত দ্রব্যমূল্যের ঊধ্বগতির বিষয়ে দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিএনপি। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ, সহ-দপ্তর সম্পাদক মুনির হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার একদিকে মুক্তবাজার দর্শনে বিশ্বাসী, অন্যদিকে নিজস্ব দলীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষায় আগ্রহী। সরকারের দুর্নীতি, টাকা পাচার, লুটপাটের মাধ্যমে পাহাড়সম সম্পদ অর্জনের ফলে দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি আকাশচুম্বি হয়েছে। দেশের খেটে খাওয়া মানুষের শ্রম-ঘামে অর্জিত ট্যাক্সের টাকা শতকরা ৩৬ ভাগই পাচারকৃত, বাইরে চলে যাচ্ছে। গত এক বছরে ৪৩৭ ভাগ পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির ঝাঁজে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, দলীয় ব্যবসায়ীদের দ্বারা তৈরি ব্যবসায়ী জোট ভাঙতে না পারলে, টিসিবিকে শক্তিশালী করতে না পারলে, দলীয় লোকজন দ্বারা পরিবহণের চাঁদাবাজি বন্ধ না করতে পারলে এবং মধ্যস্বত্ব ব্যবস্থা বন্ধ করতে না পারলে দ্রব্যমূল্য হ্রাস করা সম্ভব হবে না। বক্তৃতা-বিবৃতি ও লোক দেখানো ভন্ডামি দ্বারা আর যা-ই হোক দ্রব্যমূল্য হ্রাস বা অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ যারা দ্রব্যমূল্য বাড়াচ্ছে তারা সবই তো আওয়ামী লীগের লোক। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের সরবরাহের কোনো ঘাটতি না থাকলেও সরকারের ব্যর্থতার কারণেই মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার ও ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছার ওপরই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য নির্ভরশীল। খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রম্নত ব্যবস্থা নিতে হবে। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে- এটাই জনগণের দাবি।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বর্তমান মিডনাইট সরকারের জনগণের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই। কারণ তাদের সরকার গঠনের জন্য জনগণের ভোটের কোনো দরকার হয়নি এবং আগামী নির্বাচনে তাদের জনগণের ভোটের কোনো দরকার নেই। তারা নির্বাচনের খোলসে দলীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের ঘাড়ে ভর করে গায়ের জোরে আবার সরকার গঠন করতে চায়। জনগণ তাদের এ গণবিরোধী ষড়যন্ত্র আর বরদাশত করবে না।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সর্বশেষ ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর এবং বর্তমান সরকারের আমলে গত ১ ডিসেম্বর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, ২০০৬ সালে মোটা চাল ছিল গড়ে ১৭ টাকা ৫০ পয়সা, এখন (২০১৯ সাল) তা ৩৪-৪০ টাকা, সরু চাল ছিল ২৪ টাকা ৫০ পয়সা, এখন এটা ৪১ থেকে ৬০ টাকা। পেঁয়াজ ছিল ৮-২০ টাকা, এখন এটা হয়েছে ২২০-২৪০ টাকা। সোয়াবিন তেল ছিল ৫৫ টাকা, এখন হয়েছে ৯৪-১১০ টাকা। আটা ছিল ১৭ টাকা, এখন হচ্ছে ২৮-৩২ টাকা। হাঁসের ডিম বিএনপির সময় ছিল ১২ টাকা, এখন হচ্ছে ৭০ টাকা, আলু ছিল ৬ টাকা, এখন ৩০ টাকা, চিনি ছিল ৩৬ টাকা, এখন হচ্ছে ৬০ টাকা। এসব দাম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত ১৩ বছরে জিনিসপত্রের মূল্য গড় হিসাবে বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, অনেক জিনিসের মূল্য বেড়েছে ৩ গুণ। অথচ অ্যাসেনশিয়াল কমোডিটিস অ্যাক্ট অনুযায়ী সরকার ১৭টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। এ সরকারের প্রতিশ্রম্নত ১০ টাকার চাল আমজনতা খেয়েছে ৭০ টাকায়।

ফখরুল ইসলাম বলেন, পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকটকে পুঁজি করে অতি মুনাফালোভী সরকারদলীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, আমদানিকারক, আড়তদার, মজুদদার, খুচরা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করে ভোক্তাদের পকেট থেকে হাতিয়ে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা। চাল, তেল, ডিম, আদা, রসুন, ময়দা, মরিচ, হলুদ, মসলা, চিনিসহ অধিকাংশই নিত্যপণ্যের দাম।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে দেশের জনজীবনের দুর্বিষহ চিত্র তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ কতটা অসহায় তার একটা উদাহরণই তাদের মানবেতন জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা দিতে সক্ষম। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে গ্রাম থেকে আসা এক শিক্ষার্থীর সহজ স্বীকারোক্তি হচ্ছে এ রকম- 'বাজারে সবজির মূল্য বৃদ্ধির ফলে সবজি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ বাজারে এমন কোনো সবজি নেই, যার মূল্য ৮০ থেকে ১০ টাকার নিচে। এমনকি পেঁয়াজ পাতার দামও হচ্ছে কেজিতে ১০০ টাকা। প্রশ্ন ছিল, তাহলে তার খাদ্যতালিকায় কী থাকে। উত্তর ছিল, ডিম এবং যথারীতি এক বাটি পানিসমৃদ্ধ ডাল। তাও একটি ডিম দুজনে ভাগ করে খায়।'

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দ্রব্যমূল্যের এ ভয়াবহ পরিস্থিতিতে এটাই হচ্ছে বাস্তব চিত্র। আর এই হচ্ছে ভোটারবিহীন সরকারের দেশকে মধ্য আয়ে পরিণত করার অসহনীয় ফলাফল। দৈনন্দিন জীবনের এ ভয়াবহ চিত্র রূপায়িত করার জন্য যারা দায়ী তারা হচ্ছেন- বর্তমান ভোটারবিহীন অবৈধ সরকার।

মির্জা ফখরুল বলেন, অবৈধ দখলদার সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে সমাজের সব ক্রিয়াশীল অংশকে বিকল করে রেখেছে। যার ফলে সমাজে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে ঘুষ, দুর্নীতি, টাকা পাচার, লুটপাট, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট বাণিজ্য। ঠুটো জগন্নাথ পার্লামেন্ট কেবলই সরকারের ক্ষমতার একটি লেবাস। ফলে সরকারের কোনো জবাবদিহিতা জনগণের প্রতি নেই, নেই কোনো দায়বদ্ধতাও। এই জবাবদিহিতাবিহীন পরিস্থিতি নিশ্চিত করতেই দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি করে রেখেছে এ সরকার।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, দ্রব্যমূল্যসহ জনজীবনের সব স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে সহনীয় মাত্রায় রাখতে হলে আমাদের গড়ে তুলতে হবে একটি জবাবদিহিতামূলক সরকার। অবিলম্বে এ অবৈধ ভোটারবিহীন তথাকথিত নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করে তার পরিচালনায় সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। অন্যায় শুধু দ্রব্যমূল্যভিত্তিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাই নয়, জাতির গোটা ভবিষ্যৎ জীবন আরও দুর্বিষহ ও অসহনীয় হয়ে উঠবে।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে দলের বড় কোনো কর্মসূচি আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সারাদেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে বিএনপি কর্মসূচি নিয়েছে, কর্মসূচি হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও হবে প্রয়োজনে।

বিদু্যতের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিদু্যতের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে গণশুনানিতে বিএনপির প্রতিনিধি গিয়েছিল, সেখানে দলের বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। বিদু্যতের মূল্য বৃদ্ধির ব্যাপারে অতীতে বিএনপি কর্মসূচি নিয়েছে। আবার যদি মূল্য বৃদ্ধি করা হয় অবশ্যই কর্মসূচি দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, বিদু্যতের দাম শুধু বিএনপিকে অ্যাফেক্ট করে না, পেঁয়াজের দাম শুধু বিএনপিকে অ্যাফেক্ট করে না, জনগণকেও অ্যাফেক্ট করে। এজন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং এগিয়ে এসে এই যে দানব তাদের অপসারণ করতে হবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে