অর্ধ শতাব্দীর কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা

করোনার অভিঘাতে এবার দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকরা। তাদের নগদ অর্থ প্রাপ্তি হ্রাস পেয়েছে। তাতে তারা সামর্থ্য ও উৎসাহ হারিয়েছেন পরবর্তী উৎপাদনের জন্য। এ সমস্যা সমাধানের সহজ উপায় হচ্ছে নগদ সহায়তা প্রদান। কিন্তু এর রেওয়াজ আমাদের দেশে খুবই কম। দেশের অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে, ব্যক্তি উদ্যোক্তা আছে যারা প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করে থাকে। প্রদত্ত সাহায্যের মধ্যে থাকে চাল, ডাল, শুকনো খাবার, পানি ইত্যাদি। নগদ সহায়তার কথা অনেকেরই বিবেচনায় থাকে না। ফলে গরিব ও অসহায় মানুষের চড়া সুদে মহাজনের ঋণ নেওয়া এবং জমি কিংবা ভিটে-মাটি বন্ধক দেওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকে না। এরা যাতে এরূপ ঋণের জালে জড়িয়ে না পড়ে এবং দ্রম্নত পুনর্বাসন কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে তার জন্য নগদ সহায়তা খুবই প্রয়োজন।
অর্ধ শতাব্দীর কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা

বাংলাদেশ এখন মহান স্বাধীনতার ৫০তম বছর অর্থাৎ সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপন করছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে চলমান মুজিবর্ষ উদ্‌যাপনের সঙ্গে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনেক বেশি তাৎপর্য্পূর্র্ণ। আমাদের জাতির জনক গ্রাম থেকে এসেছেন, গ্রামের কৃষকদের সংস্পর্শে থেকে তাদের উন্নয়নের কথা ভেবেছেন। বলেছেন, 'আমি তো গ্রামেরই ছেলে। গ্রামকে আমি ভালোবাসি।' স্বাধীনতার পর ওই গ্রামীণ জীবনের উন্নয়ন এবং কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষি বিপস্নবের ডাক দিয়েছেন। কৃষি ও কৃষকের উন্নতির জন্য তিনি উদার রাষ্ট্রীয় সহায়তা দিয়েছেন। তিনি ছিলেন এদেশের কৃষি ও কৃষকের এক মহান প্রাণ-পুরুষ, পরম বন্ধু। বঙ্গবন্ধু দেশের খাদ্য সংকট নিরসনের জন্য খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে চেয়েছেন। শস্যের বহুধাকরণ চেয়েছেন। ফসলের মৌসুম পরিবর্তন করতে বলেছেন। শীত মৌসুমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থাকে কম। তখন ফসল ফলানোর সুযোগ থাকে বেশি। সেজন্য শীতকালীন ফসলের উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। পানি সেচের সুবিধা সম্প্রসারণ করতে চেয়েছেন। জমির ফসল উৎপাদনের নিবিড়তা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন। আধুনিক কৃষি উপকরণ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতি একর জমির উৎপাদন দ্বিগুণ বৃদ্ধির আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, 'আমার দেশের এক একর জমিতে যে ফসল হয় জাপানের এক একর জমিতে তার তিনগুণ ফসল হয়। কিন্তু আমার জমি দুনিয়ার সেরা জমি। আমি কেন সেই জমিতে দ্বিগুণ ফসল ফলাতে পারব না, তিনগুণ করতে পারব না? আমি যদি দ্বিগুণও করতে পারি তাহলে আমাকে খাদ্য কিনতে হবে না। আমি চাই বাংলাদেশের প্রত্যেক কৃষক ভাইয়ের কাছে যারা সত্যিকার কাজ করে, যারা প্যান্টপরা কাপড়পরা ভদ্রলোক তাদের কাছেও চাই জমিতে যেতে হবে, ডাবল ফসল করুন। প্রতিজ্ঞা করুন, আজ থেকে ওই শহীদদের কথা স্মরণ করে ডাবল ফসল করতে হবে। যদি ডাবল ফসল করতে পারি আমাদের অভাব ইনশালস্নাহ হবে না।' ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের কৃষি উন্নয়নের গতি থমকে যায়। কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি নেমে আসে শূন্যের কোঠায়। কৃষি ভর্তুকি প্রত্যাহার করা হয়। দারিদ্র্য ও মহাজনি ঋণের চাপে নিষ্পেষিত হয় দেশের কৃষক। তবে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পর অবস্থার দ্রম্নত উন্নতি সম্ভব হয়। কৃষি খাতে সরকারি সমর্থন ও সহায়তা বৃদ্ধি পায়। পুনঃপ্রবর্তন করা হয় কৃষি ভর্তুকি। তাতে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। গত ১২ বছর বঙ্গবন্ধু কন্যার লাগাতার সরকার পরিচালনার মধ্যদিয়ে কৃষি খাতে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হয়। ১৯৭০-৭১ সালে দেশে মোট খাদ্য শস্যের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৫৩ লাখ টন। যে কৃষক আগে খাদ্য ঘাটতিতে ছিল সে এখন খাদ্যে উদ্বৃত্ত। যে শ্রমিকের দাবি ছিল তিন কেজি চালের সমান মজুরি, সে এখন কাজ করে ১০ কেজি চালের সমান দৈনিক মজুরিতে। কী কৃষক, কী শ্রমিক- কারোরই আর তেমন খাদ্যের অভাব হয় না। না খেয়ে দিন কাটে না কোনো মানুষেরই। কৃষি খাতে এখন উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। বর্তমানে চাল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়নে বাংলাদেশের স্থান হলো সবার উপরে। তা ছাড়া পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের স্থান দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, চাষকৃত মৎস্য উৎপাদনে দ্বিতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম ও আলু উৎপাদনে অষ্টম বলে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ, গম দুই গুণ, ভুট্টা ১০ গুণ ও সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণ। খাদ্যশস্য, মৎস্য, ডিম ও মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ম্ভর। চিরকালের দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা আর ক্ষুধার দেশে এখন ঈর্ষণীয় উন্নতি হয়েছে খাদ্যোৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে। বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতিগ্রহণের ফলেই এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে কৃষির উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। জমির সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখন সারের জন্য কৃষককে ধরনা দিতে হয় না। কৃষকদের কাছেই পৌঁছে যায় সার। আওয়ামী লীগ সরকার সেই ব্যবস্থা করেছে। তিনি বলেন, খাদ্যের জন্য যেন আর কোনো দিন বাংলাদেশকে কারও কাছে হাত পাততে না হয় সেটা নিশ্চিত করাই তার সরকারের লক্ষ্য। প্রতিবছর এ দেশে মানুষ বাড়ছে ২০ লাখ। কৃষি জমি কমছে ৮ লাখ হেক্টর। তার পরও জনপ্রতি সরবরাহ কমছে না কৃষিপণ্যের বরং বাড়ছে নিরন্তর। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জনপ্রতি আমাদের খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা ছিল ৪৫৬ গ্রাম, ২০০০ সালে তা ৫২২ গ্রাম এবং ২০২০ সালে তা ৬৮৭ গ্রামে বৃদ্ধি পায়। এর কারণ দ্রম্নত অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি। সাম্প্রতিককালে নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে আমাদের কৃষি খাতে। আগের খোরপোশ পর্যায়ের কৃষি এখন পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক কৃষিতে। এক নীরব বিপস্নব সূচিত হয়েছে কৃষির প্রতিটি উপ-খাতে। এর পেছনে প্রধান সহায়ক শক্তি ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃষিবান্ধব নীতি, সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তা। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরকার কৃষি উন্নয়নের যে উদার নীতিমালা গ্রহণ করেছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় সম্ভব হয়েছে আজকের এই বিশাল অর্জন। বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে কৃষি খাতকে। রাসায়নিক সারের দাম দফায় দফায় কমিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে। ২০০৮-০৯ সাল থেকে পাঁচ দফায় কমিয়ে ইউরিয়া সারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ১৬ টাকায়। টিএসপি সারের দাম ৮০ টাকা থেকে কমিয়ে ২২ টাকায়, এমওপি সারের দাম ৭০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৫ টাকা, ডিএপি সারের দাম ৯০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৬ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। গত একযুগে শুধু সারেই ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৭৪ হাজার কোটি টাকা। পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত বিদু্যতের ওপর চালু করা হয়েছে ২০ শতাংশ ভর্তুকি। ৫০ শতাংশ ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে কৃষি যন্ত্রপাতি। মোট বাজেটের প্রায় ২ শতাংশ ব্যয় করা হচ্ছে কৃষি ভর্তুকি খাতে। ফলে দ্রম্নত বৃদ্ধি পেয়েছে খাদ্যশস্যের উৎপাদন। ত্বরান্বিত হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা। খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান শর্ত খাদ্যশস্যের গড় প্রাপ্যতা। সেদিক থেকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত সন্তোষজনক। দ্বিতীয় শর্ত প্রাপ্ত খাদ্যশস্যে সবার অভিগম্যতা। বর্তমান সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় তা অনেকটাই নিশ্চিত করতে পেরেছে। ১০ টাকা কেজি দরে গরিব মানুষের কাছে সময়মতো চাল পৌঁছে দিচ্ছে। তাতে দেশে প্রাপনীয় খাদ্যশস্যে তাদের অভিগম্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তার তৃতীয় শর্ত খাদ্যের পর্যাপ্ততা ও স্থায়িত্বশীলতার দিকে এখন আমাদের দৃষ্টি। নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের কথাও ভাবছেন সবাই। বর্তমান করোনা মহামারির প্রভাবে বিশ্ব এখন টালমাটাল। তাতে খাদ্যশস্যের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে বিশ্বব্যাপী। ফলে আন্তর্জাতিক খাদ্যমূল্য ক্রমেই বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানোর উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, 'আমাদের মাটি উর্বর। তাতে ফলমূল, শাক-শবজি, শস্য লাগান। কোথাও এতটুকু মাটি যেন অনাবাদি না থাকে'। গত ৭ এপ্রিল ২০২০ এক ভিডিও কনফারেন্সে এই নির্দেশনা দেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। এর আগেও তিনি দেশের খাদ্যোৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় সেদিকে দৃষ্টি রেখে এক ইঞ্চি জায়গাও অনাবাদি না রাখার আহ্বান জানান। করোনাকালে দেশের কৃষকদের যাতে কোনো অসুবিধা না হয় তার জন্য তিনি পর্যাপ্ত প্রণোদনা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, 'খাদ্য বলতে শুধু ধান, চাল, আটা, ময়দা আর ভুট্টাকে বুঝায় না, বরং মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাক-সবজি এসবকে বুঝায়। সুতরাং কৃষির উন্নতি করতে হলে এসব খাদ্যশস্যের সমন্বিত উৎপাদনের উন্নতি করতে হবে।' বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশিত সেই সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন এখন দৃশ্যমান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে কৃষির সব উপ-খাতেই বিপুল পরিমাণে উৎপাদন বেড়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভর বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ২০০৭-০৮ সালে এ দেশে মাছের মোট উৎপাদন ছিল ২৫ লাখ টন। ২০১৯-২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪৪ লাখ টনে। মৎস্য খাতে বর্তমান গড় প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৬ শতাংশ। তা ছাড়া পুষ্টির অন্যান্য উপাদান ডিম, দুধ ও মাংসের উৎপাদনে বিপুল পরিমাণে প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশ এখন ডিম ও মাংসের উৎপাদনে স্বয়ম্ভর। দুগ্ধ উৎপাদনে এখনো ঘাটতি আছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। তবে যে হারে উৎপাদন বাড়ছে তাতে এর ঘাটতি মেটানো সম্ভব হবে অচিরেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রামীণ উন্নয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গ্রাম হবে শহর। আমার গ্রাম আমার শহর : প্রতি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধার সম্প্রসারণ- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে তিনি গ্রাম উন্নয়নের পথ নকশাও উপস্থাপন করেছেন। বঙ্গবন্ধু গ্রামীণ বহুমুখী সমবায়ের যে রূপরেখা উপস্থাপন করেছিলেন তার কাছাকাছি অবস্থান করে তিনি গ্রহণ করেছেন 'একটি বাড়ি, একটি খামার' প্রকল্প। বর্তমানে 'আমার গ্রাম আমার শহর' সেস্নাগানের সঙ্গে সংগতি রেখে প্রকল্পটির নামকরণ করা হয়েছে 'আমার বাড়ি, আমার খামার'। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে 'পলস্নী সঞ্চয় ব্যাংক'। যে ব্যাংকের মালিক হচ্ছে যৌথভাবে গ্রামের সমিতিভুক্ত প্রান্তিক আয়ের নারী-পুরুষ ও সরকার। ব্যাংকটি ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য বিশেষায়িত। 'আমার বাড়ি, আমার খামার' এবং 'পলস্নী সঞ্চয় ব্যাংক' প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গ্রামীণ সমবায় ভাবনারই বাস্তব রূপায়ণ। তাতে উপকৃত হচ্ছে গ্রামের গরিব মানুষ, ছোট কৃষক ও ক্ষেত মজুর। সম্ভব হচ্ছে গ্রামীণ আয়ের বহুধাকরণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার এক কালজয়ী ভাষণে দেশের কৃষকদের ইজ্জত দিয়ে কথা বলতে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'আপনি চাকরি করেন, আপনার মায়না দেয় ওই গরিব কৃষক। ওদের সম্মান দিয়ে কথা বলেন, ওদের ইজ্জত করে কথা বলেন, ওরাই মালিক।' বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা পিতার ওই নিদের্শনাকে অন্তরে ধারণ করেছেন, এবং যুগ যুগ ধরে লালন করেছেন। তিনিও পিতার ওই নির্দেশনার অনুকরণে প্রাণের সব মমতা ঢেলে দিয়ে বলেছেন, 'গায়ের ঘাম পায়ে ফেলে ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দিচ্ছে আমাদের কৃষকরা। তারা মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করছে। তাই দেশের কৃষকদের আমাদের মাথায় তুলে রাখা উচিত। এদের সম্মান দেওয়া উচিত।' এ বিষয়টি আমাদের জাতীয় কৃষিনীতিতে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ থাকা দরকার। করোনার অভিঘাতে এবার দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকরা। তাদের নগদ অর্থ প্রাপ্তি হ্রাস পেয়েছে। তাতে তারা সামর্থ্য ও উৎসাহ হারিয়েছেন পরবর্তী উৎপাদনের জন্য। এ সমস্যা সমাধানের সহজ উপায় হচ্ছে নগদ সহায়তা প্রদান। কিন্তু এর রেওয়াজ আমাদের দেশে খুবই কম। দেশের অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে, ব্যক্তি উদ্যোক্তা আছে যারা প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করে থাকে। প্রদত্ত সাহায্যের মধ্যে থাকে চাল, ডাল, শুকনো খাবার, পানি ইত্যাদি। নগদ সহায়তার কথা অনেকেরই বিবেচনায় থাকে না। ফলে গরিব ও অসহায় মানুষের চড়া সুদে মহাজনের ঋণ নেওয়া এবং জমি কিংবা ভিটে-মাটি বন্ধক দেওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকে না। এরা যাতে এরূপ ঋণের জালে জড়িয়ে না পড়ে এবং দ্রম্নত পুনর্বাসন কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে তার জন্য নগদ সহায়তা খুবই প্রয়োজন। এ নাগাদ কৃষকদের জন্য আলাদাভাবে কোনো নগদ সহায়তার ঘোষণা দেওয়া না হলেও উদার কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রণোদনা হিসেবে কৃষকদের ঋণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়ারও ব্যবস্থা করা হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া নিয়মিত কৃষি ঋণের আওতায় আছে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর পরও কৃষকদের অর্থায়নের সমস্যা আছে, থাকবে। কারণ সব কৃষকদের জন্য কৃষি ঋণের শিকে ছেঁড়ে না। এ ঋণ কেউ পায়, কেউ পায় না। এ ক্ষেত্রে কৃষকদের জন্য বড় উপকার হতে পরে নগদ সহায়তা। এর পরিমাণ যদি প্রতি কৃষক ২ হাজার টাকা হয় তাতে মোট টাকা লাগে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। যদি ৪ হাজার টাকা হয় তাহলে ৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার প্রয়োজন পড়ে। এ টাকার পরিমাণ আমাদের মোট বাজেটের তুলনায় খুবই সামান্য। মাত্র ১.১৬ শতাংশ। একজন কৃষকের কোনো উৎপাদন মৌসুমে সার্বিক ক্ষতির কথা বিবেচনা করে তার কিয়দাংশ নগদ সহায়তা হিসাবে কৃষকদের দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। এ ধরনের কোন ঘোষণার পক্ষে যথেষ্ট যৌক্তিকতা আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে