রোববার, ১৬ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১

যে কারণে বাগান কেটে ফেলছেন তেঁতুলিয়ার চা চাষিরা

তেঁতুলিয়া (পঞ্চগড়) সংবাদদাতা
  ০৪ জুন ২০২৩, ১৪:২৭
যে কারণে বাগান কেটে ফেলছেন তেঁতুলিয়ার চা চাষিরা

দুই দশক ধরে উত্তরের সীমান্তবর্তী উপজেলা তেঁতুলিয়ায় সমতল ভূমিতে নীরব বিপ্লব ঘটেছিল চা শিল্প। চা শিল্পের এমন বিপ্লবে বর্তমানে চা উৎপাদনের রেকর্ড ঘটেছে এ অঞ্চল। চা উৎপাদনকারী দেশের তৃতীয় বৃহত্তম অঞ্চল হিসেবেও স্থান করে নিয়েছে। উৎপাদনের রেকর্ড গড়তে পারলেও চরম হতাশা তৈরি করেছে পাতা উৎপাদনকারী চাষিদের। একশ্রেণি অসাধু ও কারখানা মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে কাচা চা পাতার দাম পাচ্ছেন না তারা।

চাষিদের অভিযোগ, চা বাগান ঘিরে কারখানা বাড়লেও বাড়ছে না চা পাতার দাম। চা শিল্প ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ধরণের সিন্ডিকেট। কয়েক বছর ধরেই পাচ্ছেন না উৎপাদিত কাঁচা চা পাতার ন্যায্য দাম। চলতি মৌসুমে চা পাতা কারখানাগুলো যে দামে কিনছে, তাতে করে তাদের উৎপাদন খরচও উঠছে না। বছরের শুরুতেই টানতে হচ্ছে লোকসানের ঘানি।

চা চাষিরা জানান, আগে কেজি প্রতি চা পাতার দাম পেতেন ৩০-৪০ টাকা। এখন কারখানার মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে সরকারিভাবে নির্ধারিত ১৮ টাকাও পাচ্ছেন না চা পাতার দাম। প্রতি কেজি চা পাতা উৎপাদনে খরচ হয় ১৫ থেকে ১৬ টাকা। আর সেই চা পাতা কারখানায় নিয়ে বিক্রি করে উৎপাদন খরচও আসছে না তাদের। দিনের পর দিন কিছু অসাধু ব্যক্তিদের সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে লোকসান গুনছেন সমতলের ৭ হাজারের বেশি চা চাষী। যারা ঋণ করে চায়ে বিনিয়োগ করেছিলেন লোকসান গুনতে গুনতে নি:স্ব হয়ে যাচ্ছেন। অনেকে ক্ষোভে তাদের স্বপ্নের বাগান কেটে ফেলছেন।

তেঁতুলিয়া উপজেলার দর্জিপাড়া বাসেত ও চিমনজোত গ্রামের চা চাষি কাজিমুদ্দিনকে চা বাগান কেটে ফেলতে দেখা যায়। হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত কেন জানতে চাইলে সাঈদ জানান, লাভবান হতে এক বিঘা জমিতে চা আবাদ করেছিলাম। কিন্তু কয়েক বছর ধরে লোকসান গুনতে গুনতে আর পারছি না। চা পাতার দাম নেই। বাজারে চাল-ডাল বাকি নিতে গেলেও দোকানদাররা বাকি দিতে চান না। চা পাতার বিক্রির পর টাকা দিতে চাইলে বললে, চা পাতার তো দামই নাই, টাকা দিবা কেমনে? এ জন্য তারা বাকিও দেয় না। তাই চা বাগান কেটে ভিন্ন আবাদের কথা ভাবছি।

একই কথা বলেন আরেক চা চাষি সাঈদ তিনি জানান, সরকারিভাবে চা পাতার দাম ১৮ টাকা নির্ধারণ করা হলেও কারখানাগুলো ১৩-১৫ টাকা কেজি দরে পাতা কিনছেন। তার মধ্যে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সেখান থেকে ৩০-৫০% পর্যন্ত পাতা কেটে নিচ্ছেন। ১০০ কেজি পাতা কারখানা নিলে ৫০ কেজি কেটে নিচ্ছে। বাকি ৫০ কেজির দামও পাচ্ছি কম। ঘর থেকে আর কতো লোকসান গুনবো। সার-কীটনাশক, শ্রমিক খরচও উঠছে না। তাই চা আবাদ বাদ দেয়া ছাড়া কোন উপায় দেখছি না। এরকম অভিযোগ চা চাষি সিদ্দিক, বাদশা, ইউসুফ আলী, সোহাগ হোসেন ও বাসেদসহ উপজেলার বিভিন্ন চা চাষিদের। তারা বিভিন্ন সময় ধরে রাজপথে চা পাতার দাম পেতে আন্দোলন করে আসছেন বলে জানান।

চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালে পঞ্চগড়ে বাণিজ্যিকভাবে চা শিল্পের বিপ্লব ঘটে। গত দুই দশকে বদলে যায় প্রেক্ষাপট। এক সময়ের পতিত গো-চারণ ভূমি হয়ে উঠে সবুজ চা বাগান। সবুজ পাতায় জেগে উঠে নতুন অর্থনীতি। চা উৎপাদনে সিলেটের পর দ্বিতীয় অঞ্চল হয়ে উঠেছে এ অঞ্চল। প্রায় ১০ হাজার একর জমিতে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় প্রায় সাড়ে সাত হাজার চা-বাগান। গত বছর এক কোটি ৫২ লাখ কেজি তৈরি চা উৎপাদিত হয়েছে শুধু এ অঞ্চলে। লক্ষাধিক মানুষ জড়িয়ে পড়েছেন চা শিল্পে। বেকারদের একটি বড় অংশ চাকরির আশা ছেড়ে দিয়ে চা চাষে বিনিয়োগ করেছেন। বর্তমানে জেলায় ২৩টি চা প্রক্রিয়াজাত কারখানা চালু রয়েছে।

চা বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরাঞ্চলের উৎপাদিত চায়ের মান খুবই উন্নত, যা দার্জিলিং ভ্যারাইটির মতো। অথচ নিম্নমানের তৈরি চা অকশন মার্কেটে তুলে নিলাম মূল্য অনুযায়ী প্রতিবছর কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলের চাষীরা লাভের পরিবর্তে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

তবে কারখানার মালিকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন চা বাগান থাকলে চা ফ্যাক্টরি চলবে। তাই সিন্ডিকেটের প্রশ্নই আসেনা। তেঁতুলিয়ার বিসমিল্লাহ টি ফ্যাক্টরি লিমিটেডের পরিচালক সাইদুর রহমান মিয়া বলেন, চাষিরা যে সিন্ডিকেটের কথা বলছেন তা ঠিক নয়। মূলত তারা কারখানায় ভালোমানের পাতা দিতে পারছেন না। আর এবারের প্রকৃতি অনুকুল না থাকায় খরার কারণে অনেক কৃষকের চা পাতা নষ্ট হয়ে গেছে। যার কারণে ভালো পাতা পাচ্ছি না। দুটি পাতা একটি কুড়ি অর্থাৎ তিন পাতা থেকে সাড়ে চার পাতা পর্যন্ত আমরা ১৮ টাকার মধ্যে নিতে পারি। কিন্তু চাষিরা বাগান থেকে কাঁচি দিয়ে কেটে ৭-৮ পাতা পর্যন্ত নিয়ে আসছে। এখানে আমরাও নিরুপায়, ভালোপাতা না পেলে ভালো প্রডাকশন কিভাবে করবো, নিলাম বাজারে যদি দাম না পাই তাহলে চাষিদের কিভাবে ভালো দাম দিতে পারি। এক্ষেত্রে চাষিরা যদি তাদের বাগানে কাঁচি দিয়ে নয়, মেশিনের সাহায্যে পাতা তুলতে পারেন তাহলে তারা দাম পাবেন।

ইমপেরিয়াল চা কারখানার ম্যানেজার মিজান জানান, চট্টগ্রামের অকশন মার্কেটে সিলেটের তৈরিকৃত চায়ের তুলনায় আমাদের চায়ের দাম কম। কারণ তারা যে নিয়ম মেনে বাগান থেকে চা উত্তোলন করে, আমরা সেই নিয়মের ধারের কাছেও নেই। আমাদের এখানকার ক্ষুদ্র চা চাষিরা হাতের বদলে কাঁচি দিয়ে আট থেকে ১০ পাতা পর্যন্ত ডালসহ কেটে কারখানায় নিয়ে আসেন। অথচ নির্ধারণ করা আছে চার থেকে সাড়ে চার পাতা পর্যন্ত। এ কারণে আমরাও চায়ের মান ঠিক রাখতে পারছি না। যার কারণে আমাদের চায়ের চাহিদা কমে যায়। চাহিদা কমে গেলে দামও কমে যায়। তাই চা চাষিরা ভালো মানের পাতা সরবরাহ করলে আমরা মূল্য নির্ধারণ কমিটির দর অনুযায়ী কাঁচাপাতা কিনব। সেক্ষেত্রে আমরাও ভালো মানের চা উৎপাদন করতে পারবো এবং অকশন মার্কেটে আমাদের চায়ের চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে।

আওয়ামী কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আব্দুল লতিফ তারিন বলেন, এ জেলার মধ্যে তেঁতুলিয়ার বেশির ভাগ মানুষ চা চাষের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তারা চা পাতার দাম না পেয়ে লোকসান গুনতে গুনতে হতাশ হয়ে উঠেছেন। কারখানা মালিকদের সিন্ডিকেটে পড়ে লোকসান হওয়ায় তাঁরা বাগান ভেঙে ফেলছেন। কারখানা মালিকরা দাম কমার পেছনে বড় পাতাকে দায়ী করছেন। কিন্তু তারা কম দাম ও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ওজন থেকে বাদ দিয়ে ঠিকই বড় পাতা নিয়েই চা বানাচ্ছেন। এ ছাড়া তাঁরা ভালো মানের চা কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজসে প্রতিদিন কালোবাজারে বিক্রি করছেন। আর নিম্নমানের চা নিলাম বাজারে সরবরাহ করে কম দাম পাওয়ার অভিযোগ তুলছেন।। তাই এ বিষয়টি নিয়ে চা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলেছি। একই সাথে এ উত্তরাঞ্চলের চা শিল্পের স্বপ্ন বুনন করেছিলেন মাননীয় প্রধান মন্ত্রী। এখন এ অঞ্চলের চা শিল্প বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিসের উন্নয়ন কর্মকর্তা আমির হোসেন বলেন, বর্তমানে সমস্যাটা দুদিকেই। কারখানা মালিকরা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে খেয়াল-খুশি মতো দরে চা পাতা কিনছেন। আর চাষিরাও পাতা তোলার সময় নিয়ম মানছেন না। তারা ৭-৮ পাতা পর্যন্ত বাগান থেকে পাতা তুলে কারখানা নিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষত আমরা চা শিল্প উন্নয়নে বিগত বছর ধরেই ক্যামেলিয়া নামের খোলা স্কুল খুলে চাষিদের হাতে-কলমে শেখাচ্ছি। আগামী মাসে দেশের তৃতীয় নিলাম কেন্দ্র চালু হচ্ছে এ জেলায়। ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। নিলাম কেন্দ্র চালু হলেও চাষিরা উপকৃত হবেন।

যাযাদি/ এস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
X
Nagad

উপরে