সমাজে আলো ফেলছে নারী

একবিংশ শতকের বর্তমান সময়ে আরও উজ্জ্বল। বর্তমান সরকার নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী স্পিকার এখন মহিলা। মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নারী রয়েছে। বহু এনজিও, বহু এন্টারপ্রেনিওর এবং বহু ব্যবসায়ী এখন নারী। তারা প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন নারী চেম্বার অব কমার্স। বেশকিছু মহিলা সচিব এবং যুগ্ম সচিব পর্যায়ে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। মহিলা পুলিশ বাহিনীর কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই হাপিত্যেশ করার আগে পাওয়ার খাতাটা অবশ্যই দেখতে হবে। সেখানকার জমাও বিপুল। বলতে হবে সে কথাও
সমাজে আলো ফেলছে নারী

মফস্বল শহরের মানুষ আমি। স্বাধীনতার আগে ঢাকা-শহর ছিল আমার কাছে বিলেত। স্বাধীনতার পরে বাস্তুহারা হয়ে এলাম ঢাকায়। সত্যিকার অর্থে বাস্তুহারা মানুষ যে অভাব-অনটন ও কষ্টের মধ্যে পড়ে, আমিও সেই কষ্টে পড়েছিলাম। একটা চাকরি জোগাড় করলাম মতিঝিলে। মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল যাওয়ার একমাত্র সস্তা উপায় বাস। তখন এমন যানজট ছিল না। রিকশাও যেত মতিঝিল। সেটা বাসের তুলনায় অনেক ব্যয়বহুল। অবাক হয়ে দেখতাম, বহু মেয়ে বাসের যাত্রী হিসেবে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে এসে জমা হতো। তার মধ্যে স্কুল-কলেজের মেয়েই বেশি। ওদের বেশিরভাগই নেমে যেত আজিমপুরের রাস্তায়। আবার উঠত মেয়েরা। তারা মূলত চাকরিজীবী বা অন্য কাজে যাবে কোথাও। কিন্তু প্রত্যেক বাসেই মেয়েদের বসার জায়গা নিয়ে বেশ ধাক্কাধাক্কি হতো। তখন 'বাংলার বাণী' পত্রিকায় কাজ করতাম। কিছু লেখালেখি করেছি এ সমস্যা নিয়ে। বছরখানেকের মধ্যে ঢাকায় প্রথম মহিলা বাস চালু হলো। সে কী উলস্নাস মেয়েদের। বেশ কিছুদিন স্বস্তিতে যাতায়াত করলাম বাসে। তারপর কেন যে মহিলা বাস বন্ধ হলো, তা বলতে পারব না। কষ্ট তো বাড়লই মেয়েদের। কিন্তু বন্ধ হলো না পথচলা।

স্বাধীনতার পর দলে দলে মেয়েরা ঢাকায় এসেছে। আর যারা ঢাকায় ছিল, তারাও জীবন ও জীবিকার জন্য বের হয়েছে পথে। আবারও বলছি তখন সবচেয়ে কষ্ট ছিল যাতায়াতের। বিশেষ করে সাধারণ মহিলাদের। রিকশায় যারা যেতে পারত না, ঠেলাঠেলি করে তাদের উঠতে হতো বাসে। আজ দেখি, শত শত মহিলা পথে দাঁড়িয়ে থাকে বাসের জন্য। নগরীর জনসংখ্যার তুলনায় যানবাহন কম। তার ওপর জীবিকার তাগিদে এখন বহু মহিলা কোনো না কোনো কাজে জড়িত। তাদের জন্য আবার কি মহিলা বাস চালু করা যায় না? হয়তো যায়। কিন্তু কিছু চাইতে সাহস হয় না কারও; সংগ্রামই মেয়েদের শক্ত করেছে। সেটাই ভালো একদিক দিয়ে।

মহিলাদের ঢাকার জীবন বলতে আগে ছিল প্রধানত স্কুল-কলেজে শিক্ষকতা করা। আর কিছু নার্স তথা সেবিকার কাজ করা। কিন্তু স্বাধীনতার পর দ্রম্নত এ চিত্র পাল্টে গেল। ভাঙাচোরা দেশ তখনো। অগণিত ঘর ভাঙা, অবকাঠামো ভাঙা, ঘরে বাইরের অর্থনীতি ভাঙা। সবাই চায় কাজ করে সংসারে সচ্ছল হতে। জীবনের চাকা সচল রাখতে। তাই পেশা নির্বাচনের কথা ভুলে যেতে হলো মেয়েদের। স্বাধীনতার ১০ বছরের মধ্যে পর্যাপ্ত শিক্ষিত মহিলা সব রকম চাকরিতে কাজ শুরু করল। প্রতি বছর বহুসংখ্যক মহিলা কলেজ, ইউনিভার্সিটির শিক্ষা শেষ করে যোগ্যতা অর্জন করে নিঃসংকোচে এগিয়ে এলো কাজে। ক্রমে মেয়েদের রেজাল্ট ভালো হতে লাগল। কখনো কখনো মেধা তালিকায় তারা উঠে এলো শীর্ষে। মনে পড়ে যেত আমাদের কলেজজীবনের কথা। আইএ প্রথমবর্ষে ছয়জন মেয়ে ভর্তি হলে সাড়া পড়ে গেল। তখনকার দিনে প্রতি বর্ষের ক্লাসে একজন-দুজন ছাত্রী থাকত। কোনো বর্ষে থাকতই না। সেখানে সত্তর দশকেই দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য ছাত্রী। উপচে উঠেছে রোকেয়া হল। সবাই লেখাপড়া করতে চায়। স্বাধীনতার পর যেন নারী শিক্ষার সিংহদ্বার খুলে গেল। খুব ভালো লাগত আমার। সবচেয়ে ভালো লাগত শিক্ষামুখী মেয়েদের সাহস ও প্রত্যয় দেখে।

আশির দশকে রাজনীতিতে মেয়েদের অংশগ্রহণ শুরু হলো উলেস্নখযোগ্যহারে। প্রতিষ্ঠিত হলো মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়। শিশু বা সমাজকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত হলেও প্রথম পূর্ণাঙ্গ মহিলা মন্ত্রী পাওয়াটাই ছিল গৌরবের। সংস্কৃতির অঙ্গনে ঝাঁক বেঁধে নেমে পড়ল প্রতিভাধর মেয়েরা। নাচ, গান, নাটক, আবৃত্তি, টিভি-রেডিওর প্রোগ্রামে খবর পাঠ এবং অন্য অনুষ্ঠানে জড়তাহীন-শঙ্কাহীন চিত্তে এগিয়ে এলো মেয়েরা প্রত্যয়ের সঙ্গে। বড় বড় পদে যোগ্য মহিলাদের দায়িত্ব দেওয়া হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য মহিলা শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ল। ভাবতাম, কোথায় ছিলাম আমরা, আর ২০ বছরের মধ্যে কোথায় এলাম? স্বাধীনতা যেন বার্লিনের দেয়াল ভাঙার রূপক। জোয়ারের মতো বেরিয়ে এলাম আমরা দেশকে সেবা দেওয়া এবং দেশ গড়ার কাজে।

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশের প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু হয়েছিল আশির দশকেই। তা বহুগুণ বাড়ল নব্বইয়ের দশকে। প্রযুক্তি এবং কৃষি ক্ষেত্রেও বাদ থাকল না মহিলাদের পদচারণ। কতগুলো পেশার সংস্কারও ভেঙে গেল নব্বইয়ের দশকে। তা হলো কেবিন ক্রু, বিজ্ঞাপন ও মডেলিং। শিক্ষিত পরিবারের মেয়েরা পেশাদারিত্বের দাবি নিয়ে এসে সেখানেও দাঁড়াল। তারা প্রশিক্ষণ নিল, চাকরি নিল, আকাশে উড়ল এবং মডেলিংয়ে প্রশংসা পেল। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়েদের জন্য এ ধরনের কাজ ছিল অসম্ভব সমালোচনা এবং নিন্দার।

স্বাধীন দেশে গ্রামীণ মেয়েরা বিপস্নব আনল পোশাকশিল্পের কাজে। লাখ লাখ গ্রামীণ মেয়ের শ্রমে এখন চলছে পোশাকশিল্পের মতো বিরাট একটা খাত। রপ্তানিমুখী এবং অর্থকরী এ শিল্পে মেয়েদের সংস্কারমুক্ত শ্রমের কথা ২০-২৫ বছর আগেও ভাবা যেত না। এখন তা বাস্তব। প্রকৃত অর্থে সংস্কার ভেঙে অর্থকরী কাজে নিয়োজিত হওয়ার ক্ষেত্রে গ্রামীণ মেয়েদের অবদান অবিশ্বাস্য। ইট ভাঙা, মাটি কাটা, রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া, নির্মাণকাজে জোগানদারি করাকেও তারা পেশা হিসেবে নিয়েছে। শিক্ষার অভাব থাকা সত্ত্বেও সংস্কার তাদের আটকাতে পারেনি। স্বাধীন দেশের নামটাই উদ্বুদ্ধ করেছে নারী জনশক্তিকে। এখন তো নারীশ্রমিক বিদেশেও যাচ্ছে। শ্রমের বিনিময়ে অর্জন করা অর্থকে ওরা সম্মানের চোখে দেখছে। চিরকাল স্থবির সমাজও তাই ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। উপায় কী? ওরা যে স্বাধীনতার কবচ পরেছে গলায়।

একবিংশ শতকের বর্তমান সময়ে আরও উজ্জ্বল। বর্তমান সরকার নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী স্পিকার এখন মহিলা। মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নারী রয়েছে। বহু এনজিও, বহু এন্টারপ্রেনিওর এবং বহু ব্যবসায়ী এখন নারী। তারা প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন নারী চেম্বার অব কমার্স। বেশকিছু মহিলা সচিব এবং যুগ্ম সচিব পর্যায়ে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। মহিলা পুলিশ বাহিনীর কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই হাপিত্যেশ করার আগে পাওয়ার খাতাটা অবশ্যই দেখতে হবে। সেখানকার জমাও বিপুল। বলতে হবে সে কথাও।

স্বাধীনতার পর নারীর অধিকার সম্পর্কিত বেশকিছু আইন প্রণীত হয়েছে। কিন্তু এত অর্জনের পরও দুটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতেই হয়। প্রথম, নারী শিক্ষার হার এখনো আশানুরূপভাবে বাড়েনি। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের অবস্থা বেশ দুঃখজনক। এদিকে নজর দিতেই হবে আমাদের। দ্বিতীয়ত, নারী নির্যাতন হয়ে উঠছে নানামুখী। কখনো যৌতুকজনিত নির্যাতন, কখনো ফতোয়াজনিত নির্যাতন, কখনো সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্যাতন ইত্যাদির মাত্রা কমাতেই হবে। এগুলো বন্ধ করার জন্য আইনও আছে দেশে। শুধু চাই সে আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ। স্বাধীনতার স্বাদ তেঁতো করে দিচ্ছে এ বিষয়গুলো।

সমগ্র জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই নারী। এ নারী ঘর সামলায়, সন্তানের জন্ম দেয় এবং তাদের লালন-পালন করে, বাইরে কাজ করে পুরুষের পাশাপাশি। গ্রামীণ নারীর শ্রমঘণ্টা পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি। ঘরের রান্নাও তো শ্রমের কাজ। তাদের যদি জীবনঘনিষ্ঠ কিছু শিক্ষাসহ নিরাপত্তার আশ্বাস না দেওয়া যায়, তাহলে ঘরে-বাইরে শান্তি নষ্ট হবেই। তা আমরা চাই না। নারী হলো প্রকৃতি। নারী জননী-জায়া-ভগিনী। তাদের অন্যায়-নির্যাতন করে কেউ যেন কোনোমতে ছাড় না পায়।

আমি বিশ্বাস করি, সত্য ও ন্যায়ের পথই অগ্রগতির। অপরাধীর প্রতি আপসমূলক আচরণ হলো অকল্যাণের। আমাদের দেশনেত্রী একজন মহান নারী। তাই সাহস করে কথাগুলো বললাম। কারণ নেত্রী এবং শাসক হলেও তিনি একজন মা। মেয়েদের ভালো-মন্দ তিনি সহজেই বুঝবেন বলে আশা করি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে