কেমিক্যাল বিক্রিয়ায় চোখ খুলতে পারছেন না দগ্ধরা

বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ১৬, আশঙ্কাজনক ৪ জন
কেমিক্যাল বিক্রিয়ায় চোখ খুলতে পারছেন না দগ্ধরা

চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে বেসরকারি বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিদুর্ঘটনায় দগ্ধ হয়ে মোট ১৯ জন রোগী ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও পস্নাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আসছেন। তাদের মধ্যে তিনজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। একজনের কোভিড পজিটিভ হওয়ায় তাকে করোনা ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। বাকি ১৬ রোগীকে বার্ন ইউনিটে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এই চারজনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। শেখ হাসিনা বার্ন ও পস্নাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রবিউল করিম খান পাপন বলেন, যারা হাসপাতালে ভর্তি আছেন তাদের সবারই কেমিক্যাল নিউমোনাইটিস হয়েছে। কেমিক্যাল চোখের মধ্যে যাওয়ায় প্রত্যেকের চোখে স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রত্যেকের চোখের অবস্থাই সিভিয়ার। পোড়া রোগীরা মূলত চোখ খুলতে পারে না শরীর পুড়ে যাওয়ার কারণে। কিন্তু এই রোগীরা চোখ খুলতে পারছেন না কেমিক্যাল বিক্রিয়ার কারণে। তাদের চোখ নষ্টও হয়ে যেতে পারে। বার্ন ইউনিটে গিয়ে জানা যায়, মাকফারুল ইসলাম, গাউসুল আজম, রবিন ও ফরমানুল ইসলাম এই চারজনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। মাকফারুল ইসলামের (ইনহেলেশন ইনজুরি) শ্বাসনালি পোড়া। তার শরীরের ১২ শতাংশ স্থানে পুড়েছে। তাকে আইসিইউ ১৪ তে রাখা হয়েছে। তিনি খুব ক্রিটিক্যাল অবস্থায় থাকায় হাসপাতালটির রেড ইউনিটে রাখা হয়েছে। গাউসুল আজম একজন ফায়ার ফাইটার। তার শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাকে রাখা হয়েছে ১১ নম্বর আইসিইউতে। সে ভর্তি আছে গ্রিন ইউনিটের অধীনে। তার অবস্থাও খুব আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। রবিনের অবস্থাও খারাপ। তার ৬০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তিনি ১২ নম্বর আইসিইউতে ভর্তি আছেন। বস্নু ইউনিটে রয়েছেন রবিন। আর ফরমানুল ইসলাম পারপেল ইউনিটে। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। এই চার রোগীর বিষয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত চিকিৎসকরা। এই রোগীদের জন্য সর্বক্ষণিক নার্র্স ও টেকনিশিয়ান রাখা হয়েছে আইসিইউতে। চিকিৎসক সবসময়ের জন্য স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে। বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে বিশেষ মেডিকেল টিম। তারা ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছেন বলে জানিয়েছে হাসপাতাল সূত্র। হাসপাতাল সূত্র আরও বলছে, বাকি রোগীদের নিয়ে তেমন কোনো চিন্তা এই মুহূর্তে নেই। তবে ক্রিটিক্যাল অবস্থায় থাকা আরও ৭ রোগীকে নিয়ে চিন্তা বাড়ছে। রোগী পোড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও এর প্রভাব দেখা যায় না। একদিন পর বিভিন্ন পেশি ফুলে যায়। অনেক সময় আরও বেশি সময় নেয়। তাই বাকি রোগীদের নিয়েও চিন্তা বাড়ছে। পেশি ফুলতে শুরু করলেই শ্বাসনালির চারপাশে পেশি ফুলতে থাকে। এতে রোগী ঠিকমতো নিঃশ্বাস গ্রহণ করতে পারে না। এমন ঘটনা ঘটলে তাদের দ্রম্নত আইসিইউতে নেয়ার প্রয়োজন পড়বে। ইতোমধ্যে একজনকে অক্সিজেন থেরাপি দেওয়া হচ্ছে। বার্ন ইনস্টিটিউটের লেভেন্ডার ইউনিটে ভর্তি সীতাকুন্ডের আগুনে দগ্ধ ফারুক। তার ভাই মোহাম্মদ আশরাফুল জানান, দুই ভাইয়ের মধ্যে ফারুক ছোট। বিএম কন্টেইনার ডিপোতে ট্রেলার হেলপার হিসেবে কাজ করতেন। দুই ভাই কোনো রকম রোজগার করে পরিবার চালাতেন। ছোট ভাইয়ের এই অবস্থায় পরিবারের সবাই ভেঙ্গে পড়েছেন। বাবা মাকে কোনোভাবেই বুঝিয়ে রাখা যাচ্ছে না। ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে কি না জানতে চাইলে ফারুক অশ্রম্নসিক্ত নয়নে বলেন, আমার ভাই কথা বলেছে আমার সঙ্গে কিন্তু ওর চোখে অনেক সমস্যা। সে শুধু ব্যথায় কাতরাচ্ছে। চোখ কোনোভাবেই খুলতে পারছে না। এখানের চিকিৎসকরা সবাই খুব আন্তরিক। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী আমাদের কাছে কোনো টাকা চাওয়া হয়নি। সবই আমরা ফ্রি পাচ্ছি। পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড ৩০ এ ভর্তি সীতাকুন্ড অগ্নিকান্ডে আহত বিএম কন্টেইনার ডিপোর ইকুইপমেন্ট সেকশনের অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার মাসুম মিয়া। তার মামা মমতাজ মিয়া যায়যায়দিনকে বলেন, আগুন লাগার সময় কর্মীরা কাজ করছিলেন। আগুনটা এত বড় হয়ে উঠবে তা কেউ ভাবতেই পারেনি। হঠাৎ অনেক জোরে বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর আর কিছুই মনে নেই মাসুমের। মমতাজ মিয়া আরও বলেন, এখানে আসার পর যে চিকিৎসা পাচ্ছি তা প্রাইভেট হাসপাতলেও পাওয়া সম্ভব না। ডাক্তার, নার্স ও কর্মীরা কিছুক্ষণ পর পর এসে খোঁজ নিচ্ছেন। ওষুধ ও অন্যান্য ট্রিটমেন্ট কোনোটাতেই টাকা লাগছে না। ভাগিনা পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম বলেই কাঁদতে শুরু করেন তিনি। শেখ হাসিনা বার্ন ও পস্নাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রবিউল করিম খান পাপন বলেন, আমার অধীনে দুইজন রোগী আছেন। মাসুমের ৬ শতাংশ পুড়েছে। মাথার চুল পুড়ে গিয়েছে। তার শ্বাসনালিতে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। মাথার চুল সব ফেলে দিয়েছি। তাকে আমরা অক্সিজেন থেরাপি দিচ্ছি। ফারুকও আমাদের অধীনেই আছে। তার পোড়া কিছুটা বেশি। ১২ শতাংশ পুড়েছে। তারও শ্বাসনালি পোড়া আছে। এই রোগীটার অবস্থা কিছুটা খারাপ। এই চিকিৎসক বলেন, যারা হাসপাতালে ভর্তি আছেন তাদের সবারই কেমিক্যাল নিউমোনাইটিস হয়েছে। ক্যামিক্যাল চোখের মধ্যে যাওয়ায় প্রত্যেকের চোখে স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রত্যেকের চোখের অবস্থাই সিভিয়ার। পোড়া রোগীরা মূলত চোখ খুলতে পারে না শরীর পুড়ে যাওয়ার কারণে। কিন্তু এই রোগীরা চোখ খুলতে পারছেন না কেমিক্যাল বিক্রিয়ার কারণে। তাদের চোখ নষ্টও হয়ে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট থেকে চিকিৎসক এনে আহতদের দেখানো হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসক, চক্ষু বিজ্ঞানের চিকিৎসক ও আমরা মিলে কমিটি গঠন করে কাজ করছি। যাতে রোগীদের চোখগুলোকে বাঁচানো যায়। রোগীদের মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ জন্য আমাদের কিছু চিকিৎসক কাজ করছে। তিনি বলেন, খালেদুর রহমানসহ তিন রোগীকে ঢামেকে পাঠানো হয়েছে। খালেদুর রহমানের কোভিড পজিটিভ, হাই ডায়াবেটিস, চোখের পেছনে রক্ত জমে গেছে তার শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। এত কিছু নিয়ে রোগীর কোভিড পজিটিভ হওয়া মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তাকে সাধারণ রোগীদের সঙ্গে রাখা যাবে না। তাই ঢামেকের কোভিড ওয়ার্ডে পাঠানো হয়েছে। কোভিড নেগেটিভ হলেই আমরা এখানে নিয়ে আসব। রোগীদের অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও পস্নাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, চট্টগ্রাম থেকে আশা চার রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। এদের নিয়ে আমরা চিন্তিত। দুই জন ইতোমধ্যে লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। পোড়া রোগী নিয়েই চিন্তা বেশি। কারণ এদের সবার ইনহেলেশন ইনজুরি বা শ্বাসনালি পোড়া আছে। তারপরও রোগীদের সুস্থ করে তুলতে আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে তাদের জন্য সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে। মেডিকেল টিম সর্বক্ষণিক তাদের ওপর নজর রাখছে। তিনি আরও বলেন, কেমিক্যাল বার্নের কারণে প্রত্যেকটি রোগীর চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাদের নিয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করি এই সমস্যাগুলোও আমরা সমাধান করতে পারব। কয়েকজন রোগীর বিভিন্নভাবে শরীরে ক্ষত ছিল। সেগুলো আমরা অপারেশন করে ঠিক করেছি। কয়েকজনের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা রয়েছে। সেগুলো শনাক্ত করতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। আমাদের এখানে চট্টগ্রাম থেকে আরও ছয়জন রোগী আশার কথা রয়েছে। তাদেরও আমরা চিকিৎসা দেব। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও পস্নাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম বলেন, রোগীদের সব ধরনের আর্থিক বিষয়টি আমরা দেখছি। তাদের যদি কোনো ধরনের বাইরের ওষুধ লাগে সেটাও আমরা ব্যবস্থা করে দেব। এগুলো নিয়ে রোগীর স্বজনদের কোনো চিন্তা করার দরকার নেই। রোগীদের খাওয়া খরচ পর্যন্ত আমরা নিশ্চিত করেছি। তাদের এটেন্ডেন্ট এত বেশি হাসপাতালে না থাকলেও হবে। তাদের মাধ্যমে জীবাণু ছড়াতে পারে। পোড়া রোগী যতটা মানুষের সংস্পর্শে আসবে ততটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। তাই হাসপাতালের ভেতরে বাইরে থেকে লোক না আসার অনুরোধ করা হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে