রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১

নিম্নবিত্তের খাবারে পুষ্টি উধাও!

সাখাওয়াত হোসেন
  ১৮ মে ২০২৪, ১০:৩৪
-ফাইল ছবি

খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি, আয় বৃদ্ধি না পাওয়া ও সঞ্চয় ফুরিয়ে যাওয়ায় নিম্নবিত্ত মানুষকে কোনোরকমে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে বেশ আগে থেকেই কঠিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে। এর ওপর সম্প্রতি ডলারের বাড়তি দরের সঙ্গে পালস্না দিয়ে নিত্যখাদ্য পণ্যের দাম আরও একধাপ বাড়ায় গরিবের খাবারের পাত থেকে এবার ফার্মের মুরগি, ডিম, পাঙাশ-তেলাপিয়াসহ প্রোটিন ও ফ্যাট জাতীয় পুষ্টিকর খাবার উধাও হয়ে গেছে। মধ্যম আয়ের বিপুল সংখ্যক মানুষও এখন এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

টিসিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারিভাবে ডলারের দাম বৃদ্ধির ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যেই চাল, ডাল, আটা এবং ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। এ সময় কেজিতে মোটা চাল ১ শতাংশ এবং সরু চালের দাম বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ। প্যাকেটজাত আটার দাম কেজিতে সাড়ে ৪ শতাংশ, খোলা সয়াবিন তেল এবং সুপার পাম ওয়েলের দাম সাড়ে ৯ শতাংশ, নেপালি ডাল প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ বেড়ে গেছে। এছাড়া ডিমের দাম ৩৫ দশমিক ৮০ শতাংশ, তেলাপিয়া-পাঙাশের দাম ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফার্মের মুরগির দাম ১৫ শতাংশ এবং সব ধরনের সবজির দাম গড়ে ১৩ শতাংশ বেড়েছে। ফলে কোনো রকমে পেট ভরতে স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের খাবারের তালিকা থেকে মাছ-ডিম-মুরগিসহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য বাদ দিতে বাধ্য হয়েছেন।

পুষ্টিবিদদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিনের সুষম খাদ্য তালিকায় ২৭০ থেকে ৪৫০ গ্রাম ভাত, ৩০০ থেকে ৬০০ গ্রাম শাকসবজি, ১৫০ থেকে ৩৫০ গ্রাম মাছ অথবা মাংস, ৩০ থেকে ৩৫ গ্রাম তেল এবং ৩০ থেকে ৬০ গ্রাম ডালের প্রয়োজন রয়েছে।

চলতি বাজার দর অনুযায়ী মোটা চাল ৫৫ টাকা কেজি ও সবজি গড়ে ৬০ টাকা কেজি, তেলাপিয়া ও পাঙাশ ৩৮০ টাকা কেজি এবং মসুরের ডাল ১৪০ টাকা কেজি ধরলে একজনের খাওয়ার পেছনে নূ্যনতম খরচ দাঁড়ায় প্রতিদিন ১৬০ থেকে ১৮৫ টাকা। এ হিসাবে চারজনের পরিবারের দৈনিক খাবারের খরচ নূ্যনতম ৬৪০ টাকা। যা মাসে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ২০০ টাকা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই স্বল্প আয়ের মানুষ খাবারের বাজেট কাটছাঁট করতে মাছ-ডিম-মুরগিসহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্যপণ্যে কাঁচি চালিয়েছে।

বাজারের মুদি দোকানি, মাছ-মুরগি ও ডিম বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেও এ তথ্যের সত্যতা মিলেছে। তারা জানান, নিম্নআয়ের যেসব মানুষ কিছুদিন আগেও সপ্তাহে নূ্যনতম দুইবার মাছ-মুরগি-ডিম কিনতেন তাদের একটি বড় অংশের এখন আর আগের মতো দেখা যাচ্ছে না। যারা কিনছেন, তারাও আগের তুলনায় অর্ধেক কিংবা তারও কম কিনছেন। নিম্নআয়ের বেশির ভাগ মানুষ বাজার ঘুরে শুধু স্বল্প দামের সবজি কিনে ঘরে ফিরছেন।

খিলগাঁওয়ের মুরগি বিক্রেতা শাহজাহান মিয়া জানান, কয়েক মাস আগেও যারা সপ্তাহে অন্তত একটি সোনালি মুরগি কিনেছেন, তারা এখন অনেকে গড়ে ১০ দিনে একটি ব্রয়লার মুরগি কিনছেন। আর যারা ৪/৫ দিন পর পর এক দেড় কেজি ওজনের ব্রয়লার মুরগি কিনতেন, তাদের একটি বড় অংশ এখন মুরগি কেনা বাদ দিয়ে গিলা-কলিজা-পা এসব কেনার দিকে ঝুঁকেছেন। শুধু নিম্নবিত্তরাই নয়, মধ্যবিত্তরাও দেশি মুরগি কেনা পুরোপুরি বাদ দিয়েছে বলে জানান তিনি।

এই দোকানে ব্রয়লার মুরগির গিলা-কলিজা কিনতে আসা গার্মেন্টস কর্মী নাফিজা খাতুন বলেন, তাদের মতো গরিব মানুষের এখন পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। আর তারা এখন এসব নিয়ে ভাবছেনও না। ছেলেমেয়েদের নিয়ে শুধু দু'বেলা কী খেয়ে পেট ভরা যায় এ দুশ্চিন্তাতেই তাদের রাতের ঘুম হারাম হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং টুফটস ইউনিভার্সিটি এক রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের ১২ কোটি ৫২ লাখ মানুষ কয়েক বছর আগে থেকেই পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করতে পারছে না। যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশে প্রতি ছয়জনের একজন ভুগছে পুষ্টিহীনতায়। এই সংখ্যা ২০২৪ সালে আরও অনেক বাড়বে।

এদিকে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে খাদ্য নিরাপত্তার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। ধানের বাম্পার ফলন হচ্ছে, অন্যান্য ফসলেরও উৎপাদন বেড়েছে। তবে খাদ্যের সহজলভ্যতার মানে এই নয় যে সবাই খাবার পাচ্ছেন। বিশেষ করে পুষ্টিকর খাবার কতজনের পাতে উঠছে সে প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই শুধু পেট ভরার মতো খাবারের সরবরাহ বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অহমিকা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এছাড়া খাদ্য উৎপাদন ও এর সহজলভ্যতার মধ্যে যে ফারাক রয়েছে তা কমানোর জন্যে যথাযথ ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এদিকে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে গেস্নাবাল নেটওয়ার্ক এগেইনস্ট ফুড ক্রাইসিস (জিএনএএফসি) এর সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের খাদ্য কেনার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। দেশের ৩১ শতাংশ মানুষ উচ্চ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। নিম্নআয়ের মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেতে পারছেন। আর মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ প্রোটিন, ভিটামিন 'এ' এবং উন্নত মানের খাবার গ্রহণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কথা শুধু এ প্রতিবেদনেই নয়; সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরো (বিবিএস) প্রকাশিত বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস (এসভিআরএস) জরিপেও উলেস্নখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২২ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ৭০ শতাংশ মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২২ ও ২০২৩ সালে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার পরও খাবারের দাম বেড়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। যা ১৫ মাসের ব্যবধানে বেড়ে চলতি বছরের এপ্রিলে এসে ১০ দশমিক ২২ শতাংশে উঠেছে। একই সঙ্গে যেভাবে মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে সেভাবে মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামাল দিয়ে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষকে পুষ্টিসম্মত খাবার পাতে রাখার চিন্তা বাদ দিতে হচ্ছে।

এদিকে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে অক্টোবর সময়ে দেশের ১ কোটি ৭৩ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি পেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি)।

আইপিসির প্রতিবেদন বলছে, ২ কোটি ৮৫ লাখ মানুষ এপ্রিল থেকে অক্টোবর সময়ে খাদ্য কেনা নিয়ে চাপে থাকবে, খাদ্য সংকটে পড়বে ১ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ। তীব্র সংকটে পড়বে ৭ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার বাইরে বা নিরাপদ অবস্থানে থাকবে ২ কোটি ৯২ লাখ ৫১ হাজার মানুষ।

এর আগে ফেব্রম্নয়ারি ও মার্চ মাসে খাদ্য নিয়ে চাপে ছিল ২ কোটি ৭৮ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ। খাদ্য সংকটে পড়েছিল ১ কোটি ৪২ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ। ফেব্রম্নয়ারি ও মার্চ মাসে তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েছিল ৩ লাখ ২৮ হাজার মানুষ।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এ কারণে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য মানুষের আয় বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাতে পরিস্থিতি হয়তো সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা জরুরি। রপ্তানি বাড়ানো ও আমদানির ক্ষেত্রে যেসব বাধা আছে তা দূর করতে হবে। উৎপাদনের নেতিবাচক দিকগুলোও দূর করতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান বলেন, উৎপাদন বাংলাদেশের জন্য কোনো সমস্যা নয়। তবে দেশের কৃষি বিপণনে দুর্বলতা আছে। উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে যখন কোনো পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, তখন এর দাম বহুগুণ বেড়ে যায়। সমস্যাটা সবাই জানে। কিন্তু এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তিনি সরবরাহ ও চাহিদার জন্য বাজার নিয়ে দরকারি তথ্যের ঘাটতিকেও দায়ী করে বলেন, উৎপাদন ও বাজারের চাহিদার তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃষি বিপণন বিভাগকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। এতে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা থেকে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি পুষ্টিকর খাদ্যও অনায়াসেই তাদের পাতে উঠবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশের বিপুল সংখ্যক শিশু অধিক মাত্রায় অপুষ্টিতে (সিভিয়ার অ্যাকিউট ম্যালনিউট্রিশন বা এসএএম) ভুগছে। বিশেষ করে গত এক বছরে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির মাত্রার প্রকোপ অনেক বেশি বেড়েছে। সেইসঙ্গে বেড়েছে এতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যাও। আর বর্তমান পরিস্থিতি যে দিকে এগোচ্ছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। এর ওপর খাদ্যপণ্যের অগ্নিমূল্যসহ জীবনযাত্রার প্রায় সব ক্ষেত্রেই খরচ বেড়েছে। এ অবস্থায় নিম্ন-মধ্যবিত্তরা প্রয়োজনীয় পুষ্টির বিষয়টিতে আপস করতে বাধ্য হয়েছেন। অধিকমাত্রায় অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যার উচ্চলাফের চিত্রে এর প্রতিফলন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পুষ্টিহীনতার এ সংকট শিশুর শারীরিক ও মানসিক উন্নতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই কারণে শিশু মৃতু্যর হারও বাড়ছে। পুষ্টিকর খাবার থেকে দূরে থাকা গর্ভবতী মায়ের সংখ্যা দ্রম্নত কমিয়ে আনা না গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে শিশু মৃতু্যর হার হাজারে ১০ জনে নামিয়ে আনার টার্গেট পূরণ করা সরকারের জন্য কঠিন হবে।

এদিকে শুধু শিশুই নয়, দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর পুষ্টিহীনতার চিত্রও রীতিমতো উদ্বেগজনক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, দেশের এক-চতুর্থাংশ প্রবীণ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। আর পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছেন ৬৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবীণ। দেশে বর্তমানে প্রবীণের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। এই হিসাবে সাড়ে ৩৭ লাখ প্রবীণ অপুষ্টিতে ভুগছেন। ঝুঁকিতে থাকা প্রবীণের সংখ্যা ৯৭ লাখ ৯৫ হাজার। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রবীণ পুরুষের তুলনায় প্রবীণ নারীরা বেশি পুষ্টিহীনতায় ভুগেন। পুষ্টিহীনতায় ভোগার কারণে তাদের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দ্রম্নত নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। এর মধ্যে কিডনি ও হৃদরোগ বেশি দেখা দিয়েছে।

যাযাদি/ এসএম

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
X
Nagad

উপরে