রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১

দুই সমুদ্রবন্দরে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত

বিশেষ প্রতিনিধি
  ২৬ মে ২০২৪, ০৯:৩১
আপডেট  : ২৬ মে ২০২৪, ০৯:৪৪
ছবি-সংগৃহিত

দুই সমুদ্রবন্দরে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত । ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’। ইতোমধ্যে তা প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে আজ মধ্যরাত নাগাদ রেমাল আঘাত হানতে পারে। ঘূর্ণিঝড়টি ঘণ্টায় ১২০ থেকে ১২৩ কিলোমিটার বেগে তাণ্ডব চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পুরো ঘূর্ণিঝড়টির আকার ৪০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার হতে পারে। ঘূর্ণিঝড় রেমাল বাংলাদেশে খেপুপাড়া দিয়ে প্রবেশ করবে। এ সময় ৭ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা রয়েছে। ঝড়ের সঙ্গে প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস হতে পারে।

ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা বুঝতে পেরে শনিবার রাত থেকেই মহাবিপৎসংকেত দেখানো হতে পারে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মহিববুর রহমান। শনিবার সন্ধ্যায় সমুদ্রবন্দরগুলো ১০ নম্বর মহাবিপদ সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় লঞ্চসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। উপকূলীয় জেলাগুলোতে ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৪ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে মানুষ ও তাদের গৃহপালিত পশুসহ আশ্রয় নিতে পারবেন। উপকূলের প্রতিটি জেলায় গুদামে পর্যাপ্ত শুকনো খাবারসহ যেসব সামগ্রী দরকার হবে এগুলো মজুত রাখা হয়েছে। রোববার সন্ধ্যায় প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমাল খুলনা থেকে পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার মাঝামাঝি স্থানে আঘাত হানতে পারে। এরই প্রভাবে কিছুটা উত্তাল হয়ে উঠেছে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। এছাড়া সাগর ও নদীতে জোয়ারে পানির উচ্চতা ২ থেকে ৩ ফুট বেড়েছে। পানির স্রোতে মিঠাগঞ্জ, নীলগঞ্জ, ডালবুগঞ্জ, ধানখালী, চম্পাপুর ও লালুয়া ইউনিয়নের কয়েক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভাঙতে শুরু করেছে। ঘূর্ণিঝড় এলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছে উপকূলের মানুষ।

ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় উপকূলীয় জেলাগুলোতে চলছে প্রস্তুতি। সভা করে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। ঝড় মোকাবিলায় কাজ করবে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, রেডক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক বলেন, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা পটুয়াখালী জেলায় ৭০৩টি সাইক্লোন সেন্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যাদের ধারণক্ষমতা তিন লাখ ৫১ হাজার ৫০০ জন মানুষ এবং ৮৭ হাজার ৮৭৫টি গবাদি পশু রাখার সুযোগ রয়েছে।

সাতক্ষীরায় ঘূর্ণিঝড় রেমাল মোকাবিলায় ১৬৯টি আশ্রয়কেন্দ্রসহ ৮৮৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রস্তুত রয়েছেন ছয় হাজার স্বেচ্ছাসেবক। খুলনায় প্রস্তুত রয়েছে ৬০৪টি সাইক্লোন শেল্টার ও ৩টি মুজিব কিল্লা। ঘূর্ণিঝড় রেমাল মোকাবিলায় বরগুনায় সচেতনতামূলক মাইকিং করেছে কোস্টগার্ডের সদস্যরা। মোংলায়ও কোস্টগার্ড মাইকিং করেছে। মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষার জন্য নিকটবর্তী সাইক্লোন সেল্টার স্টেশনে আশ্রয় গ্রহণের প্রস্তুতের জন্য সবাইকে সচেতন করা হচ্ছে।

আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ঝড়ের মডেলগুলো তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ঝড়টি শক্তি সঞ্চয় করে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে। রোববার রাতে এটি উপকূল অতিক্রম করতে পারে। খেপুপাড়া ও পশ্চিমবঙ্গে সাগর আইল্যান্ড ঘেঁষে ঝড়টি স্থলভাগ অতিক্রম করতে পারে। তবে সন্ধ্যা থেকেই ঝড়ের অগ্রভাগের প্রভাব উপকূলীয় এলাকায় দেখা যাবে। ঝড়ের প্রভাবে কোথাও কোথাও অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। উপকূল অতিক্রমের সময় যদি ওই এলাকায় জোয়ার থাকে সে ক্ষেত্রে তিন থেকে চার ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। তবে প্রবল ঘূর্ণিঝড় হলে পাঁচ থেকে সাত ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমাল একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ বালি। এটি ওমানের দেওয়া নাম। তবে, রেমাল নামে আফগানিস্তানে একটি শহর আছে। সেই শহরের নামানুসারেই এটির নামকরণ করা হয়েছে। এই ঘূর্ণিঝড়টি সর্বপ্রথম যেখানে আঘাত হানবে সেখানের বাতাসের গতিবেশ ঘণ্টায় ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে যেই অবস্থান দেখাচ্ছে তাতে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রটি বাংলাদেশের ওপর দিয়েই অতিক্রম করার সম্ভাবনা আছে।

বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকা এবং বরিশালের পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলা জেলায় রেমালের আঘাত হানার সম্ভাবনা বেশি। এটি যদি জোয়ারের সময় আঘাত হানে তাহলে জলোচ্ছ্বাস বেশি হবে। আর যেহেতু এটি ‘সিভিয়ার সাইক্লোন’ আকারে আঘাত করার সম্ভাবনা আছে তাই বৃষ্টির পরিমাণও বেশি থাকবে।

আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, ঝড়টি ভারতের উপকূল ঘেঁষে এলে শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ কম পেত। সাগরের মধ্যভাগ দিয়ে আসায় শক্তি সঞ্চয়ের জন্য চারপাশে উপযোগী পরিবেশ আছে। তিনি বলেন, উপকূলীয় ওই এলাকায় পশুর নদীসহ অন্যান্য যে নদীগুলো আছে সেগুলোতে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভাটা হয়। আবার রাত ১২টা থেকে জোয়ার হয়। যদি জোয়ারের সময় ঝড়টি স্থলভাগ অতিক্রম করে তাহলে ক্ষতির আশঙ্কা বেশি থাকে। গভীর নিম্নচাপটি উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে ৫০০ কিলোমিটার, মোংলা থেকে ৪৭৫ কিলোমিটার, পায়রা থেকে ৪২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর উত্তাল রয়েছে। এখন কেন্দ্রর গতিবেগ ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়।

তিনি আরও জানান, ঘূর্ণিঝড় রেমাল দক্ষিণাঞ্চলের উপকূল খেপুপাড়া এবং ভারতের সাগর দ্বীপের মাঝ দিয়ে যাবে। রোববার সকাল থেকে ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রভাগের প্রভাব পড়বে। তবে মূল ঝড়টি সন্ধ্যা নাগাদ স্থলভাগ অতিক্রম করবে। তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিগন্যাল বাড়বে।

শনিবার দুপুরে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি বাস্তবায়ন বোর্ডের জরুরি সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মহিববুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশের আবহাওয়া অফিস, ভারতের আবহাওয়া অফিস, চীনের আবহাওয়া অফিস, জাপানের আবহাওয়া অফিস এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশের আবহাওয়া অফিসের সঙ্গে সমন্বয় রেখে আমরা যেটা পরিষ্কার বুঝতে পারছি আমাদের ঘূর্ণিঝড়টি আসন্ন। আমরা সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

কয়টি জেলা আক্রান্ত হতে পারে- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখানে সাতক্ষীরা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত পুরো এলাকাটি অ্যাফেক্ট হওয়ার ঝুঁকি আছে। এটা বিপজ্জনক হতে পারে রাত ১২টা-১টা নাগাদ। এটা ১০ নম্বর মহাবিপদে চলে যেতে পারে, এরকম একটা সম্ভাবনা আছে। তিনি বলেন, ‘রোববার ভোর থেকে এটা প্রাথমিক আঘাত হানতে পারে। সন্ধ্যা নাগাদ মূলটা আঘাত হানবে। পূর্বাভাসে আমরা এরকমই বুঝতে পারছি এবং শনিবার রাত ১২টা থেকে ১টা থেকেই এটা ডেঞ্জার পয়েন্টে চলে যেতে পারে।’

এদিকে উত্তাল হয়েছে কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। সৈকতে থাকা পর্যটকদের বার বার মাইকিং করে নিরাপদে থাকার নির্দেশ দিচ্ছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। তবে সবকিছু উপেক্ষা করে আগত পর্যটক মেতেছেন ঢেউয়ের তালে তালে।

প্রসঙ্গত, ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ থাকে প্রতি ঘণ্টায় ৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটার। বাতাসের গতি ৮৯ থেকে ১১৮ কিলোমিটার থাকলে প্রবল, ১১৯ থেকে ২১৯ পর্যন্ত অতি প্রবল এবং বাতাসের গতি প্রতি ঘণ্টায় ২২০ কিলোমিটারের বেশি থাকলে সুপার সাইক্লোন বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

আবহাওয়া অফিস ইতোমধ্যে তাদের পূর্বাভাসে বলেছে যে শনিবার সকাল থেকে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অধিকাংশ এবং ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় দমকা হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গত কয়েকদিন ধরেই ভ্যাপসা গরম পড়েছে। আর এই ভ্যাপসা গরম অনুভূত হওয়ার সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের সম্পর্ক আছে।

আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক জানান, যখন বঙ্গোপসাগরে কোনো ঘূর্ণিঝড় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তখন স্থলভাগের সব মেঘ ঘূর্ণিঝড়ের আশপাশে চলে যায়। যেখানে ভ্যাপসা গরম থাকে, সেখানে ধরে নিতে হবে যে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে গেছে। আর জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমে গেলে সেখানে বায়ুরচাপ কমে যায়।

ঘূর্ণিঝড় রেমালের তথ্য সংগ্রহ এবং বিতরণের জন্য কন্ট্রোল রুম খুলেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। একই সঙ্গে সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় রেমালের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। লাইটার জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে লাইটার জাহাজ ব্যবহৃত হয়। বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) সাধারণত বহির্নোঙরে অবস্থান করে। এগুলো থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য বোঝাই করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

যাযাদি/ এস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
X
Nagad

উপরে