রিজার্ভ সেনা তলব

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তীব্র হচ্ছে

রাশিয়া তাদের বিমান ও নৌবাহিনীর অতিক্ষুদ্র অংশ ব্যবহার করেছে। কারণ তারা ইউক্রেনকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়নি। একই সঙ্গে ইউক্রেন যেভাবে পাল্টা যুদ্ধ করছে, সেটিও রাশিয়া অনুমান করতে পারেনি। এছাড়া পশ্চিমা দেশগুলো থেকে এত অস্ত্র সাহায্য আসবে, সেটি রাশিয়া ভাবতে পারেনি। যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া দেখেছে, কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্র ইউক্রেনকে ব্যবহার করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অনেকটা সরাসরি যুদ্ধে নেমে গেছে। ফলে দেশকে রক্ষা করতে হলে রাশিয়াকেও আরও প্রস্তুতি নিতে হবে...
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তীব্র হচ্ছে

প্রায় সাত মাস ধরে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়া বিরল এক পদক্ষেপ হিসেবে তিন লাখ রিজার্ভ সেনা সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো রিজার্ভ সেনাদের ফের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভস্নাদিমির পুতিন।

রাশিয়ার কাছ থেকে প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ইউক্রেন পুনরায় দখল করে নেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে মস্কো রিজার্ভ সেনা সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। রিজার্ভ সেনা তলব করার পর রাশিয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় এক হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করেছে। পুতিনের ওই ঘোষণার পর রাশিয়ার অনেক নাগরিক দেশের বাইরে চলে যেতে চাইছে। কারণ এই নাগরিকরা ইউক্রেন যুদ্ধে যোগ দিতে চায় না।

কেন রিজার্ভ সেনা তলব?

দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু বলেছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধের জন্য তিন লাখ রিজার্ভ সেনাকে তলব করা হবে। এই সংখ্যা রাশিয়ার মোট আড়াই কোটি রিজার্ভ সেনার মাত্র এক শতাংশ।

রাশিয়ায় সামরিক প্রশিক্ষণ আছে, এমন সাধারণ মানুষকে রিজার্ভ সেনা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এছাড়া রিজার্ভ তালিকায় সাবেক সেনারাও রয়েছে। ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধে রাশিয়া প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার নিয়মিত সেনা মোতায়েন করেছে বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে এর দ্বিগুণ রিজার্ভ সেনা তলব করা হয়েছে। তবে এই রিজার্ভ সেনাদের কীভাবে মোতায়েন করা হবে; সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।

সমর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিজার্ভ সেনা ডাকার অর্থ হচ্ছে, যুদ্ধে রাশিয়ার অবস্থা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। তুরস্কের ইস্তাম্বুল-ভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক মুরাত আসলান বলেন, একটি যুদ্ধে নিয়মিত সেনাবাহিনী সফল হলে রিজার্ভ সেনা তলব করার দরকার হয় না।

রিজার্ভ সেনা তখনই ডাকা হয়, যখন যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিয়মিত সেনাদের ক্ষতি সাধন হয়। রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে এরই মধ্যে তারা ছয় হাজার সেনা হারিয়েছেন। যদিও পশ্চিমা দেশগুলোর হিসাবে এই সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি হবে। সংখ্যা যাই হোক না কেন, রাশিয়া যে ক্ষতির মুখে পড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভস্নাদিমির পুতিন এরই মধ্যে বলেছেন, রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।

সমর বিশেষজ্ঞ এবং মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মাহমুদ আলি বলেন, রাশিয়া বুঝতে পেরেছে যে, এই যুদ্ধ অতি সহজে এবং সহসা শেষ হবে না। এরই মধ্যে তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে, বিশেষ করে জনবলের। তিনি বলেন, 'যুদ্ধ এখন এমন একটি অবস্থায় আছে, যেখানে দুই পক্ষই পরস্পরের ক্ষতিসাধন করছে।

যুদ্ধের মোড় বদলাবে?

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভস্নাদিমির পুতিন বলেছেন, তিনি কোনো ফাঁকা বুলি আওড়াচ্ছেন না। কিন্তু ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষার জন্য তার দেশ 'সম্ভাব্য সব উপায়' ব্যবহার করবে। পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে পাঁচ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে। এর মধ্যে কিছু অস্ত্র ইউক্রেনের কাছে এসেছে এবং আরও অস্ত্র আসবে।

সৈয়দ মাহমুদ আলি বলেন, সব অস্ত্র যদি ইউক্রেনের হাতে আসে, তাহলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে পারে। এজন্য রিজার্ভ সেনা সমাবেশ করে আগে থেকেই রাশিয়া প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইউক্রেনের যেসব অঞ্চল দখল করেছে রাশিয়া, তার বেশিরভাগ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণেই আছে। এর মধ্যে চারটি অঞ্চলে গণভোটের আয়োজন করেছে মস্কো। এই গণভোটের ফল কী হবে, সেটা সহজেই অনুমান করা যায়।

ইস্তাম্বুল-ভিত্তিক সমর বিশেষজ্ঞ মুরাত আসলান বলেন, গণভোটের মাধ্যমে ইউক্রেনের সেসব অঞ্চলকে রাশিয়া তাদের অংশ করে নেবে। যেমন ২০১৪ সালে ক্রিমিয়ার ক্ষেত্রে হয়েছিল। গণভোটের পর রাশিয়া সেসব অঞ্চলকে তারা রাশিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করবে। রাশিয়া সেসব অঞ্চল ধরে রাখতে চাইবে এবং সেখানে শক্তি বাড়াবে। এজন্য পুতিন মাতৃভূমি রক্ষার কথা বলছেন বলে উলেস্নখ করেন মুরাত।

আরও তীব্র হবে যুদ্ধ?

সৈয়দ মাহমুদ আলীর মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার লক্ষ্য ছিল তিনটি। এক. ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের রুশ ভাষাভাষী অধু্যষিত দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক এলাকায় রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে সেখানে রুশ-ভাষী জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া। দুই. ইউক্রেনে ডি-নাজিফিকেশন অথবা উগ্র-জাতীয়তাবাদ নির্মূল করা। যেটি মারিউপোল এলাকায় সক্ষম হয়েছে রাশিয়া। তিন. ইউক্রেনকে বেসামরিকীকরণ করা।

মাহমুদ আলি মনে করেন, ইউক্রেনকে বেসামরিকীকরণ করার লক্ষ্যে রাশিয়া পৌঁছাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। রাশিয়ার সেনা সংখ্যা ইউক্রেনের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের কৌশল এবং পশ্চিমাদের সরবরাহ করা অত্যাধুনিক অস্ত্র দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে এনেছে।

সমরবিদরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে দুটি টার্নিং পয়েন্ট আছে। প্রথমটি হচ্ছে, কিয়েভের আশপাশ থেকে রাশিয়া যখন সেনা সরিয়ে নিয়েছিল। দ্বিতীয় টার্নিং পয়েন্ট হচ্ছে, দুই সপ্তাহ আগে রাশিয়ার কাছ থেকে ইউক্রেন যখন পুনরায় কিছু ভূমি দখল করে নেয়। ইস্তাম্বুল-ভিত্তিক সমরবিদ মুরাত আসলান বলেন, চারটি অঞ্চলে গণভোট করে সেগুলো রাশিয়া নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর পুতিন হয়তো যুদ্ধবিরতি করতে পারেন। কিন্তু ইউক্রেন সেটি কিছুতেই মানবে না। তারা সেসব অঞ্চল থেকে রাশিয়ার সেনাদের বিতাড়িত করার লড়াই করবে।

মুরাত আসলান বলেন, তখন যদি ইউক্রেন আরও সাফল্য লাভ করে, তাহলে প্রেসিডেন্ট পুতিন দেশের ভেতরে বড় ধরনের চাপে পড়বেন। সেক্ষেত্রে লড়াই আরও তীব্র হতে পারে। সমরবিদদের অনেকে বলছেন, ইউক্রেনে রাশিয়া তাদের সমরশক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেনি।

অধ্যাপক মাহমুদ আলি বলছেন, রাশিয়া তাদের বিমান ও নৌবাহিনীর অতিক্ষুদ্র অংশ ব্যবহার করেছে। কারণ তারা ইউক্রেনকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়নি। একই সঙ্গে ইউক্রেন যেভাবে পাল্টা যুদ্ধ করছে, সেটিও রাশিয়া অনুমান করতে পারেনি বলে মনে করেন তিনি। এছাড়া পশ্চিমা দেশগুলো থেকে এত অস্ত্র সাহায্য আসবে, সেটি রাশিয়া ভাবতে পারেনি। যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া দেখেছে, কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্র ইউক্রেনকে ব্যবহার করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অনেকটা সরাসরি যুদ্ধে নেমে গেছে। ফলে দেশকে রক্ষা করতে হলে রাশিয়াকেও আরও প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য পুতিন রিজার্ভ সেনা সমাবেশের ঘোষণা দিতে পারেন বলে মনে করছেন মাহমুদ আলি। তিনি বলেন, আসন্ন শীতকালে ইউরোপে জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে। ফলে ইউরোপ এবং আমেরিকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সেটি নিয়েও রাশিয়া চিন্তা করছে। সংবাদসূত্র : বিবিসি নিউজ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে