পাঠক মত

নিরাপদ মাতৃত্বে মাতৃদুগ্ধ নিশ্চিত হোক

নিরাপদ মাতৃত্বে মাতৃদুগ্ধ নিশ্চিত হোক

মা হলো সন্তানের জন্য সবচেয়ে কাছের মানুষ। মাতৃগর্ভে দীর্ঘ দশ মাস দশ দিন অবস্থান করার পর যখন একটি নবজাতক এই পৃথিবীর আলো দেখতে পারে তখন তার প্রাণের স্পন্দনকে নিশ্চিত করার জন্য শিশুকে জন্মের পর প্রথমে তার মায়ের বুকের দুধ পান করানো হয়। একজন নবজাতক শিশুকে জন্মের পর প্রথম যে মাতৃদুগ্ধ পান করানো হয় এটিকে বলে শালদুধ। এই শালদুধ একটি নবজাতক শিশুর জন্য খুবই প্রয়োজনীয় খাদ্য। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত মাতৃদুগ্ধে একটি শিশুর জন্য মূলত সব পুষ্টিগুণ দেওয়া থাকে যার ফলে একজন নবজাতক সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারে। আমাদের দেশে আগে প্রায়ই দেখা যেত, মায়ের সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃতু্যবরণ করতেন। ফলে মায়েদের মৃতু্যতে আত্মীয়দের সেই নবজাতক শিশুকে খাওয়ানোর বিষয়টি নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় কেননা তখন মা প্রদত্ত যেই শালদুধ শিশুকে খাওয়ানো দরকার সেটি তখন আর খাওয়ানো সম্ভব হয় না। ফলে তখন শিশুটির কান্না থামানোর জন্য বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। হয়তো অন্য কোনো মহিলার বা কোনো আত্মীয়ের কাছ থেকে দুধ এনে নবজাতক শিশুকে খাওয়ানো হয় এতে হয়তো শিশুর কান্না সাময়িকভাবে বন্ধ হয় কিন্তু মায়ের শালদুধের পুষ্টিগুণ থেকে নবজাতক শিশু ঠিকই বঞ্চিত থেকে যায়। জন্মের পরে যদি মায়ের দুধ নবজাতক শিশুকে দেওয়া না হয় তাহলে শিশুটি ছোটবেলা থেকেই নানা ধরনের সমস্যায় ভোগে। উপযুক্ত পুষ্টির অভাবে শিশুদের সার্বিক বিকাশও সঠিকভাবে হয় না। শালদুধ শিশুর জন্য অত্যন্ত উপকারী খাবার। এটি একটি নবজাতক শিশুর জন্য প্রথম টিকা হিসেবে কাজ করে থাকে। মাতৃদুগ্ধে ভিটামিন এ আছে যা শিশুকে নানা ধরনের চোখের সমস্যা থেকে রক্ষা করে। মাতৃদুগ্ধের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটির মাধ্যমে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। মায়ের এই শালদুধের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে শিশুর পেট পরিষ্কার থাকে ফলে শিশুর খাবার গ্রহণে কোনো সমস্যা হয় না। আবার মাতৃদুগ্ধ একজন শিশুর জন্ডিস হওয়ার আশঙ্কাও অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। প্রতি বছরই সব মাকে বারবার সচেতন করা হচ্ছে যেন নবজাতক শিশুর জন্মের পরপরই শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করানো হয়। অন্য কোনো খাবার যেন শিশুকে না দেওয়া হয়। জন্মের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে। শিশু জন্মের ৬ মাস সময় পর পর্যন্ত বা ১৮০ দিন পর্যন্ত অবশ্যই নিয়ম করে নবজাতক শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো উচিত। এ সময় পানি বা অন্য পানি জাতীয় কোনো খাবার খাওয়ানোর দরকার নেই। কেননা মায়ের দুধের মধ্যেই আছে শতকরা ৯৫ ভাগ পানি। পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টিগুণ তো আছেই। ছয় মাসের পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি পরিপূরক খাদ্য হিসেবে শিশুকে অন্যান্য খাবার অল্প পরিমাণে খাওয়ানো উচিত। নবজাতক শিশুকে দিনে-রাতে মোট ৮-১২ বার বুকের দুধ খাওয়ানো যেতে পারে। আবার দেখা যায়, অনেকে গ্রামাঞ্চলে মায়ের বুকের দুধ খেতে না দিয়ে এর পরিবর্তে চিনি বা মধুমিশ্রিত পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করে যেটা মোটেও শিশুর জন্য কল্যাণকর নয়। বরং এসব খাবার দিলে পরে শিশুর অন্যান্য খাবারের প্রতি রুচি কমে যায়।

আবার আমাদের দেশের অনেক মায়েরাই জানে না, মায়ের বুকের দুধ শিশুরা খেলে যেমন শিশুদের উপকার হয় ঠিক তেমনিভাবে এতে মায়েদের নিজেদেরও উপকার হয়। মায়ের বুকের দুধ পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত একটি পানীয়। যা গ্রহণের ফলে শিশুর জন্য কোনো ধরনের জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে শিশুরা নিরাপদে থাকে, অনেক অসুখ থেকে মুক্ত থাকতে পারে। যেমন এলার্জিজনিত রোগ, শ্বাসনালির রোগ ইত্যাদি। অনেকে আবার শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে পারে না বলে কৌটার দুধ খাওয়ায় যেটা শিশুদের স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই খারাপ। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু মায়ের বুকের দুধ খেয়ে বড় হয়েছে তাদের বুদ্ধির বিকাশ কৌটার দুধ খেয়ে বড় হওয়া শিশুদের বুদ্ধির বিকাশের তুলনায় অনেক বেশি হয়। মায়ের দুধে যেহেতু রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে তাই যদিও বা কোনো শিশু অসুস্থ হয়ে যায় তাহলে সেই শিশুটি দ্রম্নত আরোগ্য লাভ করে। প্রাথমিক অবস্থায় শিশুরা জটিল খাবার হজম করতে পারে না। তাই সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত মায়ের বুকের দুধ হজমে শিশুর কোনো রকমের কোনো সমস্যা হয় না। তার জন্য বোঝাই যায় মায়ের বুকের দুধ একটি নবজাতক শিশুর জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ খাবার। শুধু মায়ের বুকের দুধ পান করলে শিশুর উপকার হয় এমন কিন্তু নয় এর পাশাপাশি মায়ের নিজেরও কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে অনেক উপকার দেখা যায়। যেমন মায়েরা যদি শিশুকে বুকের দুধ পান করান তাহলে মায়েদের স্তন ও জরায়ু ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে। আবার মায়েদের শারীরিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে যে যদি কোনো মা তার সন্তানকে পূর্ণ পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ পান করান তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এটি জন্ম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে থাকে। আর যদি কোনো মা পূর্ণ দুই বছর পর্যন্ত তার সন্তানকে বুকের দুধ পান করান তাহলে সেটিও একজন মাকে ঘনঘন গর্ভবতী হওয়ার থেকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখে। এছাড়া মাতৃদুগ্ধ পান করার কারণে মা ও নবজাতক শিশুর মধ্যে এক বিশাল আত্মার বন্ধনও তৈরি হয়।

বর্তমানে আমাদের দেশে মাতৃমৃতু্যহার অনেক কমেছে। যার কারণে নবজাতক শিশুর জন্মের পরপরই নিজের মায়ের বুকের দুধ পান করার সুযোগ পাচ্ছে। এটি অনেক বেশি ফলপ্রসূ একটি বিষয় নবজাতক শিশুর জন্য। এটির আসল কারণ হচ্ছে গর্ভবতী অবস্থায় আমাদের দেশের মায়েদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি। বর্তমানে মায়েরা অনেক বেশি সচেতন এ বিষয়টি নিয়ে। নিরাপদ মাতৃত্বের কারণেই মূলত পরিপূর্ণ মাতৃদুগ্ধ নিশ্চিত করা সম্ভব। একজন নবজাতক শিশুর জন্য মাতৃদুগ্ধের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। সঠিক মাতৃদুগ্ধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে অবশ্যই নিরাপদ মাতৃত্বের বিষয়টির প্রতি প্রতিটি পরিবারের সজাগ দৃষ্টি প্রদান করা উচিত।

সানজিদা মাহমুদ মিষ্টি

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে