logo
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০ ৭ কার্তিক ১৪২৭

  ডা. এস এ মালেক   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

শহিদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আজও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি সক্রিয়। সুযোগ পেলেই আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানতে চায়। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এসব সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী অপশক্তিকে রুখে দিতে হবে। শহিদ স্মৃতি অমর হোক। আন্তর্জাতিকভাবে আজ মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে- যা আমাদের জন্য গর্বেরও বটে। ভাষা শহিদদের এই আত্মত্যাগ কোনো দিনই বৃথা যাবে না। ভাষা শহিদদের এই আত্মত্যাগ সফল হোক সেই প্রত্যাশাই করছি।

শহিদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বাঙালির প্রেরণার উৎস। পৃথিবীতে এমন একটি দেশ নেই যে ভাষার জন্য জনগণ জীবন দিয়েছে। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ ভাষার জন্য জনগণ জীবন উৎসর্গ করেছে। ভাষা বাঙালি জাতিসত্তা বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। ভাষার মাস ফেব্রম্নয়ারি চলছে। আমার লেখার শুরুতেই ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে কিছু লেখার চেষ্টা করছি।

গোটা বছর ফেব্রম্নয়ারি মাসকে স্মরণ করেন এরূপ বাঙালির সংখ্যা খুব বেশি নেই। তবে ফেব্রম্নয়ারি মাস আসার ঠিক পূর্বে অথবা আসার আগে শোকাহত হন না এমন বাঙালির সংখ্যা কম নয়। এ মাসের একুশের প্রতু্যষে লাখ বাঙালি খালি পায়ে হেঁটে শহিদ মিনারে যান শ্রদ্ধা নিবেদন করতে ফুলের তোড়া নিয়ে। শহিদ মিনারে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতিস্তম্ভ। শফিক, সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ আরও অনেকের স্মৃতিবিজড়িত ওই শহিদ মিনার। প্রতীকী স্তম্ভের নেই প্রাণশক্তি, নেই কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা; কিন্তু ওই শহিদ মিনার এতই শক্তিশালী যে, হানাদার বাহিনী ভয়ঙ্কর ট্যাংক দিয়ে ওই স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংস করলেও আবার অমৃত প্রাণশক্তি নিয়ে গড়ে উঠেছে শহিদ মিনার। ইট, পাথর ও সিমেন্ট, রড দিয়ে গড়া ওই স্মৃতিস্তম্ভে বাঙালি নিবেদন করে হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। দেশের এমন কোনো প্রান্ত নেই যেখানে শহিদ মিনার দাঁড়িয়ে নেই। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় সবখানে রয়েছে প্রতীকী স্মৃতিস্তম্ভ। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে জমায়েত হয় প্রভাতফেরিতে সরকার প্রধানসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। নিবেদিত হয় ওই শহিদ বেদিতে হাজার হাজার ফুল ও পাপড়ি। কত রকমের ফুল।

একুশে ফেব্রম্নয়ারি রাত ১২টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এমনকি সকালবেলাও শহিদ মিনারে যদি কেউ দেখতে যান, তাহলে যে বেদিতে একটুও খালি জায়গা নেই। সব ফুলের মালা ও পাপড়িতে ভরপুর। প্রেম, শ্রদ্ধা, ভালোবাসার প্রতীক হচ্ছে পুষ্প। পুষ্পার্ঘ্য আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পবিত্র বস্তু। একবার শহিদ মিনারে দেখি বেশ কিছু অন্ধ লোক বেদিতে ফুল দিচ্ছে। শহিদ স্তম্ভ তাদের দৃষ্টিগোচর নয়। হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসাই তাদের অর্ঘ্য। দেখলাম একটা ছোট্ট মেয়ে তার মায়ের কোলে বসে একটা বড় লাল গোলাপ ছুড়ে দিল বেদিতে। অবুঝ ওই শিশুর ছুড়ে ফেলা গোলাপ ফুলটি ধন্য করল শহিদ বেদিকে। জানিয়ে দিল মায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রম্নয়ারিকে কেউ ভুলতে পারেনি; আগামীতেও নয়। দেখলাম হুইল চেয়ারে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শহিদ মিনারে উপস্থিত। আশি বছরের বৃদ্ধা লাঠি হাতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাতে গোলাপ নিয়ে শ্রদ্ধা জানালেন বেদিতে। কাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এই পুষ্পার্ঘ্য? কী করেছিলেন সেদিন সালাম, বরকত, জব্বাররা? কেন তারা জীবন দিলেন? কেন রঞ্জিত হলো তাদের রক্তে রাজপথ? পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্জন হলে এসে ঘোষণা দিলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তার এই ঘোষণা ছিল পাকিস্তানি শাসকদের গভীর ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল। তখন বাংলার দামাল ছেলেরা বুঝতে ভুল করেনি যে, তারা আমাদের জাতিসত্তাকে ধ্বংস করতে চায়। জাতীয়তাবাদী চেতনাকে বিলীন করতে চায়। এ জন্য ভাষার ওপর আগ্রাসন অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। সুদীর্ঘ সংগ্রামের পর বাঙালিরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। পাকিস্তান নামক স্বাধীন রাষ্ট্রে বাঙালিকে তার মায়ের ভাষায় কথা বলতে দেওয়া হবে না। প্রশ্ন উঠল পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধরন কি? সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, প্রতিক্রিয়াশীলতা যদি হয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি তাহলে সে রাষ্ট্রে বাঙালির অস্তিত্ব কোথায়? তারা তো চেয়েছিল ভাষার ওপর আগ্রাসন চালিয়ে বাঙালিকে চিরদিনের জন্য পিছিয়ে দিতে, চেয়েছিল রাষ্ট্রশক্তির মাধ্যমে একটা জাতিসত্তাকে ধ্বংস করে দেওয়া। বাঙালি কিন্তু বুঝতে ভুল করেনি। বায়ান্ন কেন, আটচলিস্নশে পাকিস্তান পার্লামেন্টে ভাষার প্রশ্ন উঠে।

বাঙালি বুঝতে ভুল করেনি যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলে বাঙালি জাতিসত্তাই বিপন্ন হয়ে পড়বে। তাই জাতিসত্তা ও অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই বাঙালি লড়াকু মনোভাব নিয়েই আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলে। মাতৃভাষার মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করার জন্য মিছিল, মিটিং ও প্রতিবাদ আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন থেকেই প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ভাষার মুক্তির জন্য যে আন্দোলন তখন শুরু হয়, সেই আন্দোলন হচ্ছে আমাদের জাতীয় মুক্তির আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের প্রকৃতি সাংস্কৃতিক হলেও এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় যেসব আন্দোলন গড়ে উঠে - যেমন '৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, '৫৮-এর সামরিক শাসনের প্রতিবাদ, '৬২-এর শিক্ষা কমিশন, '৬৪-তে মৌলিক গণতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন, '৬৬-তে ঐতিহাসিক ৬ দফা, '৬৯-এর গণঅভু্যত্থান এবং '৭০-এর সাধারণ নির্বাচন। এসব আন্দোলনেই বাঙালির অস্তিত্ব ও ঠিকানা ফিরে পাওয়ার পটভূমি রচিত করেছে। একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনে পর্যবসিত হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়। তাই বাঙালি শুধু '৫২-তেই বুকের রক্ত দিয়ে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠা করেনি। এরপর এই আন্দোলনে জয়লাভ করে অসীম মনোবল ও সাহস নিয়ে পরবর্তী আন্দোলন সংগ্রামের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়েছে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করে যে পাকিস্তান বাঙালি জাতিসত্তাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, সেই পাকিস্তানে জাতিসত্তারই সমাধি রচনা করেছে এই স্বাধীন বাংলায়। পরিবর্তন হয়েছে পতাকার, জাতীয় সঙ্গীতের এবং সংবিধানের মন ও মননশীলতার। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এখন দুইটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র। পাকিস্তানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ও বাংলাদেশেও মুসলমান সংখ্যায় বেশি। পার্থক্য এই পাকিস্তান এখনো একটা ধর্মরাষ্ট্র। ধর্ম যে রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি আর স্বাধীন বাংলাদেশ একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যার প্রাণশক্তি ধর্ম নয়। অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি। এই মতাদর্শে যারা বিশ্বাস করে না, তাদের স্বাধীন বাংলাদেশে থাকারই অধিকার রাখে না। মনে পড়ে একবার শহিদ মিনারে দেখলাম বেশ কিছু মাদ্রাসার ছাত্র। শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় স্স্নোগান দিচ্ছে- 'নারায়ে তাকবির আলস্নাহু আকবার'। কেউ কিছু বলছে না। ভাবটা এই রকম যে এই স্স্নোগান দিয়ে তারা গর্ববোধ করছে। হঠাৎ ওই স্স্নোগান শহিদ মিনারে দেওয়া হচ্ছে কেন? এই স্স্নোগান তো ধর্মীয় স্স্নোগান। মসজিদে ওয়াজ মাহফিলে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, মুসলমানরা এই স্স্নোগান দিয়ে থাকে। পরক্ষণেই দেখলাম শহিদ মিনার ছেড়ে যেতে না যেতেই তাদের প্রতিরোধ করেছে, অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ ছাত্রসমাজ। মনে হলো ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করে তারা শহিদ মিনারকে বিতর্কিত করতে চায়। কিন্তু তা সফল হয়নি। তাই বলে কি ধর্মীয় রাজনীতি থেকে গেছে? আজকে বাঘা বাঘা রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিভিন্ন জনসভায় ও আলাপ-আলোচনায় দেখা যায় রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার হীনমন নিয়ে ধর্মকে ব্যবহার করতে। তারা রাষ্ট্রযন্ত্র দখল করে বহুদিন দেশ শাসন করেছে। এরা শহিদ মিনারে, স্মৃতিসৌধ, শহিদ স্মৃতিস্তম্ভে যান, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ ধ্বংস করে নয়। হৃদয় ওদের পাকিস্তান, বাইরে বাংলাদেশ। তাই জাতীয় সংগীত ও পতাকার মর্যাদা দেবে কিভাবে? বলতে ওরা তাই দ্বিধাবোধ করে না ধর্মভিত্তিতে জাতীয় সংগীত ও পতাকা পাল্টে দিতে। বেশ কয়েক বছর শারীরিক অসুস্থতার কারণে শহিদ মিনারে যেতে পারিনি। বাসায় বসে যেসব কথা মনে জাগে তার কিছুটা এখানে প্রকাশ করলাম।

শহিদ স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু যে বোধ চেতনার কারণে ওই শ্রদ্ধা নিবেদন, তাই যদি লালন করা না হয়, তাহলে শহিদ বেদিতে ফুল দিয়ে লাভ কি? লাখ ফুলের সমাবেশ ঘটেছে শহিদ মিনারে। এর কটি প্রকৃত শ্রদ্ধাশীলদের দ্বারা নিবেদিত, আর কতটা ফেক, তা কে জানে। স্মৃতিসৌধে গেলে স্মৃতিস্তম্ভ লজ্জাবোধ করে। এরূপ সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তিদের শহিদ মিনারে যাওয়া কি সমুচিত?

আজও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি সক্রিয়। সুযোগ পেলেই আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানতে চায়। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এসব সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী অপশক্তিকে রুখে দিতে হবে। শহিদ স্মৃতি অমর হোক। আন্তর্জাতিকভাবে আজ মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে- যা আমাদের জন্য গর্বেরও বটে। ভাষা শহিদদের এই আত্মত্যাগ কোনো দিনই বৃথা যাবে না। ভাষা শহিদদের এই আত্মত্যাগ সফল হোক সেই প্রত্যাশাই করছি।

ডা. এস এ মালেক: রাজনীতিক ও কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে