সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯
walton1

শুরুতেই জাতীয় স্বীকৃতি, অতঃপর...

ম মাতিয়ার রাফায়েল
  ০২ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
মুখে যা-ই বলুন, প্রত্যেক চলচ্চিত্র অভিনেতা অভিনেত্রীরই কিন্তু মনের কোণে আকাঙ্ক্ষা থাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের। অনেকেই আছেন সারাজীবন তপস্যা করেও একবারের জন্যও এই পুরস্কার অর্জন করতে পারেননি বা পারেন না। তখন তারা আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন এই বলে, 'যেসব সিনেমায় পুরস্কার পাওয়া যায় সেগুলোর কোনো দর্শক চাহিদা নেই'। 'চার-পাঁচটির বেশি প্রেক্ষাগৃহ পায় না। প্রেক্ষাগৃহের আসনগুলোর আটানব্বই ভাগই খালি থাকে' ইত্যাদি। অথচ জীবনঘনিষ্ঠ বা সৃজনশীল সিনেমার বাইরে মূলধারার সিনেমায় অভিনয় করেও আলমগীর বারবার 'শ্রেষ্ঠ অভিনেতা' হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ছিনিয়ে নিয়েছেন। পেয়েছেন সর্বোচ্চ ৯ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। দেখিয়েছেন অভিনয় জানলে সব ধরনের সিনেমায় এটা অর্জন সম্ভব। ফলে দেখা গেছে, অনেকে আছেন অভিনয়ের শুরুতেই এই পুরস্কার লাভ করলেও পরবর্তীতে তাদের অনেকেই সেভাবে অগ্রসর হতে পারেননি। হারিয়েও গেছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে যারা মূলধারার চলচ্চিত্রের বাইরে অভিনয় করেছেন তাদের বেশিরভাগ অভিনয় শিল্পীই আর অগ্রসর হতে পারেননি। অনেকে চিরতরেই হারিয়ে গেছেন। এদের মধ্যে সবার আগে যে নামটি আসে তিনি আজাদ রহমান শাকিল। যিনি মাস্টার শাকিল নামেই খ্যাত। দুইবার শিশুশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছিলেন ('ডুমুরের ফুল' ও 'ডানপিঠে ছেলে')। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি সেই সুনামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অভিনয়ের সুনাম আর ধরে রাখতে পারেননি। ফলে দর্শক চাহিদা হারিয়ে বসেন। নির্মাতারাও তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। কিছুদিন বিটিভি নাটকে চেষ্টা করেছিলেন। এরপর হারিয়েই গেলেন। এই হারিয়ে যাওয়া অভিনেতার আলোচিত অভিনীত সিনেমা- 'ডুমুরের ফুল', 'দিন যায় কথা থাকে', 'ডানপিঠে ছেলে', 'দেবদাস', 'এখনো অনেক রাত', 'কলমিলতা' প্রভৃতি। আরেকজন সাড়া জাগানো অভিনেত্রী ছিলেন ডলি আনোয়ার। ডক্টর মোহাম্মদ ইব্রাহিম ও ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিমের মেয়ে ডলি আনোয়ার 'সূর্য দীঘল বাড়ী'তে সেই যে অনবদ্য অভিনয় করে প্রত্যাশিত ৫ম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছিলেন এরপর সেভাবে আর জ্বলে উঠতে দেখা যায়নি তাকে। পরবর্তীতে হতাশায় পুড়ে ১৯৯১ সালে বিষপান করে আত্মহত্যা করেন তিনি। তার অন্যান্য দুটি সিনেমা 'দহন' ও 'হুলিয়া'। বরণ্যে অভিনেতা আবুল হায়াতের মেয়ে বিপাশা হায়াত নব্বই দশকের বিটিভির নাটকের অভিনেত্রী হিসেবে ছিলেন সবচেয়ে দর্শকপ্রিয় মুখ। এরপরে তিনি চলচ্চিত্রেও নাম লেখান। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের 'আগুনের পরশমনি' চলচ্চিত্রে অভিনয় করে পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। মাত্র দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন বিপাশা। এখন সিনেমা তো বটেই নাটক থেকেও দূরে সরে গেছেন। আরেক অভিনেত্রী শাবনাজ। চলচ্চিত্রে নাম লিখিয়েই বিপুল সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন। শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে পেয়েছেন ২১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তার সেই সিনেমাটির নাম 'নির্মম'। প্রখ্যাত পরিচালক এহতেশামের হাত ধরে আসা সেই শাবনাজও হারিয়ে গেছেন। আরেক অভিনেত্রী শিমলা। ১৯৯৯ সালে 'ম্যাডাম ফুলি' নামের অভিষেক সিনেমাতেই লাভ করেছিলেন ২৪তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সেই শিমলাও পরবর্তীতে বেশি দূর যেতে পারেননি। একপর্যায়ে তিনিও হারিয়ে গেছেন। মেহবুবা মাহনুর চাঁদনী ২০০১ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবে তানভীর মোকাম্মেলের 'লালসালু' সিনেমায় পেয়েছিলেন ২৬তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। হারিয়ে গেছেন তিনিও। অন্যদিকে এদেশের সবচেয়ে অসংখ্য হিট ছবির পরিচালক কাজী হায়াতের ছেলে কাজী মারুফ ২০০২ সালে 'ইতিহাস' সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে পেয়েছিলেন ২৭তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সেই কাজী মারুফও একেবারে অনিয়মিত হয়ে গেলেন। বর্তমানে তিনি বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। ২০০৪ সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে 'ব্যাচেলর' সিনেমায় ২৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন অপি করিম। সেই তিনিও দেশের সিনেমায় থিতু হলেন না। আসা-যাওয়ার মধ্যে থেকে অনিয়মিত হয়ে গেলেন। ২০০৪ সালে তৌকীর আহমেদের 'জয়যাত্রা' সিনেমায় পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবে ২৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান চাঁদনী। সেই চাঁদনীও অনিয়মিত হয়ে হারিয়েই গেলেন। ২০০৬ সালে নাজনীন হাসান চুমকি 'ঘানি' চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে ৩১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তীতে তারও খোঁজ থাকেনি দেশীয় সিনেমায়। ২০১২ সালে লুসি তৃপ্তি গোমেজ 'উত্তরের সুর' সিনেমায় অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্র অভিনেত্রী হিসেবে ৩৭তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এই অভিনেত্রী মঞ্চনাটকে সচল থাকলেও চলচ্চিত্রে তার সেইভাবে খোঁজই নেই এখন। গাজী রাকায়েত হোসেনের সিনেমা 'মৃত্তিকা মায়া' ২০১৩ সালে জাতীয় রেকর্ড ১৭টি বিভাগে পুরস্কার লাভ করে। এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন তিতাস জিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের প্রভাষক মূলত মঞ্চনাটকের অভিনেতা তারও পরবর্তীতে আর খোঁজ থাকেনি। এই একই সিনেমায় শর্মীমালা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে এবং অপর্ণা ঘোষও শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। অপর্ণা ঘোষ পরবর্তীতে আরও একটি সিনেমা 'গন্ডি'তে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন। এখন তিনি বিদেশে স্বামীর সঙ্গে অবস্থান করেন। অভিনয়ে ফিরবেন কি না নিশ্চিত নয়। মঞ্চ-টিভি অভিনেত্রী শর্মীমালাও সিনেমায় সরব নন। ২০১৬ সালে 'শঙ্খচিল' সিনেমায় শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে ৪১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছিলেন কুসুম শিকদার। একটি ভিডিও কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। 'লালটিপ'খ্যাত এই মডেল ও অভিনেত্রীর কালেভদ্রে দেখা দেন। রুনা খান ২০১৭ সালে ৪২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্র অভিনেত্রী হিসেবে। তিনিও অনিয়মিত। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জনকারীদের মধ্যে সর্বশেষ সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন 'ন ডরাই' সিনেমায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভকারী সুনেরাহ বিনতে কামাল। এখন দেখার অপেক্ষা আরও কতদূর যেতে পারেন তিনি।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে