ভোজ্যতেলে সক্রিয় সিন্ডিকেট

ভোজ্যতেলে সক্রিয় সিন্ডিকেট

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট কমানোর প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই এবং কাঁচামাল আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার না হওয়ায় ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে সক্রিয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র। এনবিআরের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করতে ব্যর্থ হওয়ায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তারা বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার চেয়েছিল ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীরা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য এনবিআরের কাছে প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তা আমলে নেয়নি সংস্থাটি। এরপরই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে সর্বশেষ প্রতি লিটারে আরও সাত টাকা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে তিন স্তরের পরিবর্তে এক স্তরে ভ্যাট দাবি করে আসছেন। এনবিআর ওই প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় এবার দাম কমাতে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। গত ২০১৮-১৯ বছরে ভোজ্যতেল আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ছিল। এছাড়া উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি ছিল। কিন্তু ২০২০-২১ অর্থবছরে আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ হারে অগ্রিম কর, উৎপাদন ও মূল্য সংযোজনের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট এবং ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূল্য সংযোজনের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট অথবা বিক্রয় মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট ধার্য করা হয়। ব্যবসায়ীরা ভ্যাট এক স্তরে নামিয়ে আনার জন্য প্রস্তাব করেন। ভোজ্যতেল আমদানিকারকরা মনে করেন, ভ্যাটের ওপর শুল্ক আদায়ের পদ্ধতিটিও সঠিক নয়। ইতোমধ্যে দাম কমাতে তিন স্তর ভ্যাট ব্যবস্থা বাদ দিয়ে এক স্তর ভ্যাট চালু করার প্রস্তাব করেছেন ভোজ্যতেল আমদানিকারকরা। আমদানি, উৎপাদন ও বিপণন তিন স্তরে তিন দফায় ভ্যাট নেওয়া হয় ভোজ্যতেলের ওপর। বাজারে ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে এখন উৎপাদকরা বলছেন, ভ্যাট প্রত্যাহার করা হোক। এ দাবি যৌক্তিক মনে করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ জন্যই নতুন করে দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে ফেব্রম্নয়ারি থেকে মধ্য অক্টোবর পর্যন্ত সাতবার ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এ সময়ে বোতলজাত তেলের দাম লিটারপ্রতি ৪৫ টাকা বেড়েছে। অথচ বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার আগে দেশে বিপুল পরিমাণ তেল মজুত ছিল। যার ওপর বাড়তি দামের প্রভাব পড়ার কথা নয়। এ অবস্থায় বাংলাদেশ কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন (ক্যাব) এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের ভাষ্য, বাজারে এখন যে তেল মজুত আছে, তাতে তিন মাস চলার কথা। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে এখনই ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো অযৌক্তিক। আর ব্যবসায়ীরা যুক্তি দেখিয়েছেন, করোনায় তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখন ক্ষতি না পোষালে তারা টিকে থাকতে পারবেন না। ক্যাব সূত্র জানিয়েছে, বাজারে মজুত তেল শেষ হওয়ার পর নতুন আমদানি করা তেলের দাম বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া ব্যবসায়ীরা বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে এখানে পরিশোধন করেন। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও পরিশোধন ব্যয় বাড়েনি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা যায়যায়দিনকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই বলছি, বিশ্ববাজারে সয়াবিনের দাম বাড়ছে। ব্রাজিলে পরিবহণ খরচ বেড়েছে। তেলের উৎপাদন কমছে। টনপ্রতি ৫০০ ডলারের তেল ১৪০০ ডলার এসে ঠেকেছে। গত দেড় বছর ধরে একই অবস্থা চলছে। তারা পাইকারি ব্যবসায়ী। সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পণ্য নিয়ে ১০ পয়সা লাভে বিক্রি করেন। আর তিন মাসের ভোজ্যতেল স্টক আছে কি না, সেটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশন ও মিলমালিকরা জানবে। তবে তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব আছে। তিনি বলেন, বিশ্ববাজার গবেষণা করে তিন থেকে ছয় মাস আগে দাম নির্ধারণ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হলে খুব বেশি কিছু বলার নেই। তবে বাজারে এখন যে তেল মজুত আছে তার দাম বাড়ার কোনো কারণ আছে বলে মনে করেন না তিনি। এখন মূল্যস্ফীতি যদি গড়হারে বাড়ে, কিন্তু আয় যদি না বাড়ে তাহলে জনসাধারণের জীবনযাত্রায় ব্যয় সমন্বয়ে কষ্ট হবে। এজন্য মানুষের আয় বৃদ্ধির বিষয়েও সরকারকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। আমদানিকারকদের দাবি মেনে ভোজ্যতেলের দাম আরেক দফা বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। গত বুধবার থেকে বোতলজাত সয়াবিন কিনতে ভোক্তাকে লিটারপ্রতি সাত টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। এত দিন তারা প্রতি লিটার সয়াবিন কিনেছিলেন ১৫৩ টাকায়, এখন কিনতে হবে ১৬০ টাকায়। পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিনের ক্ষেত্রেও দাম বেড়েছে একই হারে। আগে ৫ লিটারের বোতলজাত তেলের দাম ছিল ৭২৮ টাকা। এখন গুনতে হচ্ছে ৭৬০ টাকা। এদিকে, ব্যবসায়ীরা দফায় দফায় ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়ে করোনার 'ক্ষতি' পুষিয়ে নিতে চাইছেন। করোনায় অধিকাংশ মানুষের আয়-রোজগার কমে গেছে। এর ওপর নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় অসহনীয় অবস্থায় পড়েছেন তারা। সরকার ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু করোনায় রোজগার কমে যাওয়া সীমিত আয়ের মানুষে সমস্যা দেখার যেন কেউ নেই। অন্যদিকে, ব্যবসায়ীরা বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির কথা বললেও বিশ্বব্যাংকের কমিডিটি প্রাইস ডাটার তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম কমছে। সেপ্টেম্বর মাস শেষে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এক হাজার ৩৯৯ ডলারে বেচাকেনা হয়েছে। গত আগস্টে যার প্রতি টনের দাম ছিল এক হাজার ৪৩৪ ডলার। তার আগে জুলাইয়ে প্রতি টন অপরিশোধিত ভোজ্যতেলের দাম ছিল এক হাজার ৪৬৮ ডলার, জুনে এক হাজার ৫১৮ ডলার এবং মে মাসে এক হাজার ৫৭৪ ডলার। চলতি অক্টোবরে দাম আরও কমেছে। এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর লিটারে চার টাকা বাড়িয়ে ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তখন দেশের বাজারে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল সর্বোচ্চ ১২৯ টাকা এবং এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৫৩ টাকা এবং প্রতি পাঁচ লিটার সয়াবিন তেল খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭২৮ টাকা হয়। আর প্রতি লিটার পাম সুপার অয়েল খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১১৬ টাকা দর নির্ধারণ করা হয়। এদিকে, বাজারে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এ কমিটি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এছাড়া জেলা পর্যায়ে করা হবে আলাদা মনিটরিং টিম। সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভোজ্যতেলে ভিটামিন 'এ' নিশ্চিতকরণে গৃহীত একটি কারিগরি প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিল্প মন্ত্রণালয় বলছে, ননফুড গ্রেডেড ড্রামে ভোজ্যতেল বাজারজাত/পরিবহণ আগামী ১৬ মার্চের মধ্যে বন্ধ করে ফুডগ্রেড বোতল বা পস্নাস্টিক ফয়েল বা পাউচপ্যাকে ভোজ্যতেল বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। ইতঃপূর্বে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও অগ্রগতি নেই। গঠিত কমিটি অগ্রগতি ও মোডালিটি নির্ধারণে বৃহৎ রিফাইনারিগুলো এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি সমন্বয়ে দ্রম্নত সভা আহ্বান করতে হবে। এ প্রসঙ্গে শিল্প মন্ত্রণলয়ের অতিরিক্ত সচিব (মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা সহায়তা) শেখ ফয়েজুল আমীন জানিয়েছেন, এটি করা জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই জরুরি। একদিকে ভিটামিন 'এ' সমৃদ্ধ ভোজ্যতেল বাজারজাত করা যতটা জরুরি, অন্যদিকে ফুডগ্রেডেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করাও জরুরি। শিল্প মন্ত্রণালয় বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভিটামিন 'এ' সমৃদ্ধ ভোজ্যতেল ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভিটামিন 'এ' এর ঘাটতি হ্রাস পাবে। এটি অনূর্ধ্ব-১৫ বয়সের শিশুদের মৃতু্যর হার এবং মাতৃমৃতু্য হার কমাতে সহায়তা করবে। এজন্য নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী দেশে শতভাগ পাম, সয়াবিন ও রাইস-ব্রান তেলকে ভিটামিন 'এ' সমৃদ্ধ করা জরুরি। এজন্য বিএসটিআই-এর দক্ষতা উন্নয়ন করাসহ ভিটামিন 'এ' সমৃদ্ধ তেল ব্যবহারে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং ভোক্তাদের সুরক্ষিত ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ড্রাম অয়েল (বাল্ক অয়েল) ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে ২০ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত সরিষা, সূর্যমুখীসহ অন্যান্য তেলবীজ থেকে সোয়া দুই লাখ টন তেল পাওয়া যায়। বাকিটা আমদানি করতে হয়। মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে থেকে এসব তেল আমদানি হয়ে থাকে। হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি পরিশোধিত ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি করে বাজারজাত করছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে