এসএসসি পরীক্ষা

প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর সরকার

প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর সরকার

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং যশোর বোর্ডে পরীক্ষার প্রথম দিনেই প্রশ্নের অব্যবস্থপনার ঘটনায় কঠোর অবস্থানে সরকার। দুই-একটি বিষয় নয়, গুনে গুনে ছয়টির বেশি বিষয়ের প্রশ্নফাঁসের খবর নিশ্চিত হয়েছে দিনাজপুর বোর্ড। আর যশোর বোর্ডে বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষায় বাংলা দ্বিতীয় পত্রের বহু নির্বাচনী প্রশ্নপত্র (এমসিকিউ) বিতরণ করা হয়েছে। পৃথক দু'টি শিক্ষা বোর্ডের ঘটনা এখনো তদন্তাধীন। ঘটনা দু'টি নিছক দুর্ঘটনা না কি অন্য কিছু, তা খুঁজে বের করা হচ্ছে।

করোনা মহামারির ধকল কাটিয়ে ওঠে স্বাভাবিক অবস্থায় পাবলিক পরীক্ষার শুরুর দিন থেকেই একের পর এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। একের পর এক এ ধরনের ঘটনার পেছনে অন্য কিছু আছে কি না কিংবা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার কোনো ফন্দি-ফিকির আছে কি না? নাকি ঘটনাগুলো একেবারেই কাকতালিয় তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগদানরত প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে অবহিত করা হচ্ছে। তিনিও বিষয়টির খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং মনিটরিং করছেন।

শিক্ষা সচিব গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, 'পুলিশ তদন্ত করছে, বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে। আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে। বোর্ডও পৃথক তদন্ত করছে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের শিক্ষার্থীদের আগে গুরুত্ব দিতে হবে। এখানে কোনো কম্প্রোমাইজ নয়। দায়ী সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।'

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. কামরুল ইসলাম বলেন, 'তদন্তে যদি দেখা যায়, কোনো কর্মকর্তা জড়িত, তাহলে তাকেও ধরা হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।'

এদিকে ঘটনার সূত্রপাত যশোর বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষা শুরুর দিন বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় নড়াইলের কালিয়া উপজেলার প্যারী শংকর পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে আর উপজেলার বাঐসোনা কামশিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং লোহাগড়া উপজেলার দিঘলিয়া নবগঙ্গা ডিগ্রি কলেজ ও ইতনা স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুলে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের বহুনির্বাচনী প্রশ্নপত্র পাওয়া যায়। এ ঘটনার জেরে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের এমসিকিউ অংশের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

পরের ঘটনাটি ঘটেছে, দিনাজপুর বোর্ডে। ঘটনাটি ধরা পড়ে গত মঙ্গলবার। এরপর গত বুধবার চারটি বিষয়-গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, কৃষিশিক্ষা ও রসায়নের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এখন পর্যন্ত যেসব তদন্ত চলছে এবং তথ্য-উপাত্ত মিলেছে, তাতে ছয়টি বিষয়ের প্রশ্নফাঁস হয়েছে বলে ধরে নিয়ে তদন্ত চলছে, মামলা হয়েছে এবং দুই দফায় ছয় আসামিকে আটক করে জেলে পাঠানো হয়েছে।

যশোর বোর্ডের প্রশ্ন অব্যবস্থাপনার ব্যাপারে বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শককে প্রধান করে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন, বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মাধব চন্দ্র রুদ্র। তদন্ত কমিটি এখনো কাজ করছেন বলে জানিয়ে তিনি বলেন, তদন্ত রিপোর্ট পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দিনাজপুর বোর্ডের অধীনে ভুরুঙ্গামারি উপজেলার একজন কেন্দ্র সচিব প্রশ্নফাঁসের মূল কারিগর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। তার সঙ্গে আরো কয়েকজন জড়িত ছিলেন। তাদের প্রায় সবাইকে পুলিশ আটক করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে একজন ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছেন।

ঘটনাটি ধরা পড়ে গত মঙ্গলবার। এরপর গতকাল বুধবার চারটি বিষয়-গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, কৃষিশিক্ষা ও রসায়নের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। বাকি দুই বিষয় উচ্চতর গণিত ও জীববিদ্যার পরীক্ষা নতুন প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে নির্ধারিত সময়েই নেওয়ার সিদ্ধান্ত বোর্ড কর্তৃপক্ষের। শেষোক্ত দু'টি পরীক্ষা বাতিল করা হয়নি তার কারণ হিসেবে বোর্ড বলেছে, উচ্চতর গণিত ও জীববিজ্ঞানের পরীক্ষা রুটিনের শেষে থাকায় পরিবর্তন করা হয়নি। প্রশ্ন পরিবর্তন করেই সময়মতো হবে সেসব পরীক্ষা।

তবে ধারণা করা হচ্ছে, দিনাজপুর বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত আগের পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নও ফাঁস হতে পারে। এ ব্যাপারে স্থগিত হওয়া প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা জানাজানি হওয়া ঘটনাটি পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার মনে করেন দিনাজপুর বোর্ড সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাটি প্রথমে বোর্ড কর্তৃপক্ষ আমলেই নিতে চায়নি। পরে স্থানীয় প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি অবহিত করলে, বোর্ড সরেজমিনে যাচাই করতে গিয়ে নিশ্চিত হয় যে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। তখনই লাগাতার চারটি পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে।

পাবলিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা অনেকটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল। প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ করা হলেও তখনো বিষয়গুলোকে আমলে নেওয়া হয়নি। তখন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়েছিল, এগুলো ভালো শিক্ষকের সাজেশন। তাই কমন পড়েছে বা কমন পড়তেই পারে, প্রশ্নফাঁস নয়।

অভিযোগ আছে, পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র দেওয়া হতো। শুধু কুড়িগ্রামে নয়, রংপুরেও প্রশ্নপত্র বিক্রি করা হতো। অভিভাবকেরা বলছেন, মায়েদের ডেকে তাদের সন্তানদের জিপিএ-৫ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ২০ হাজার টাকায় প্রশ্নপত্র বিক্রি করা হতো। চক্রটি কয়েক বছর ধরে কাজটি করছিল। কয়েক বছর আগে এই কুড়িগ্রামেই প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। পুলিশ পুরো চক্রটিকে আটকে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু এটি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে স্কুলের শিক্ষকরাও।

বার বার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠার এক পর্যায়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং উচ্চ্ পর্যায়ের তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুসারে বিসিএসের আদলে পরীক্ষা শুরুর আগ মুহূর্তে প্রশ্নপত্রের 'সেট' নির্বাচন এবং সেটি কেন্দ্রে জানিয়ে দেওয়ার বিধান চালু করা হলে, পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়েছিল, 'প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই। গোয়েন্দা পুলিশসহ সবাই সজাগ। পরীক্ষা শুরুর দিন মন্ত্রণালয়ের সচিবও বলেছিলেন, 'প্রশ্ন ফাঁসের প্রশ্নই আসে না। আমরা সবাই অত্যন্ত সজাগ।' বরং আরো বলা হয়েছে, 'কেউ এ ধরনের গুজব ছড়ালেও তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

কিন্তু ঘটনাটি ঘটল, পরীক্ষার শুরুর পঞ্চম দিন বুধবার। এর তিন থেকে চার দিন পর একসঙ্গে ছয়টি বিষয়ের প্রশ্নফাঁস। এটি ঘটাল পরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদেরই একজন। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার জন্য মূলত যাদের অভিযুক্ত করা হয়, সেই কোচিং সেন্টারগুলো নয়। খোদ প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরাই সেটি ফাঁস করলেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবু বকর ছিদ্দীক গত বৃহস্পতিবার শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শুদ্ধাচার শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বলেন, 'কাউকে না কাউকে দিয়ে তো কাজটি করাতে হবে। আমি কার ওপর বিশ্বাস রাখব। কোথায় বিশ্বাস করব? ছাত্ররা কী শিখবে? আজ শুদ্ধাচার নিয়ে কথা বলছি।

শিক্ষা সচিব আরো বলেন, 'আমরা যদি সুশাসন নিশ্চিত করতে চাই, তাহলে নিজেদের আচরণ শুদ্ধ হতে হবে। নিজেদের বিশুদ্ধ হতে হবে। শিক্ষকদের উদ্দেশে সচিব বলেন, যদি বিশুদ্ধ শিক্ষা না দিতে পারি, নিজেদের মনকে বিশুদ্ধ না করতে পারি তাহলে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া যাবে না।'

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে