বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১
গ্রামীণ টেলিকমের অর্থ আত্মসাৎ

ডক্টর ইউনূসসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

লভ্যাংশ দেওয়ার রায়ে ৬ মাসের স্থিতাবস্থা, রুল জারি
যাযাদি ডেস্ক
  ৩১ মে ২০২৩, ০০:০০

গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ও শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দায়ের হয়েছে। জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রামীণ টেলিকম থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ইউনূসসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ওই মামলাটি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এদিকে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণ থেকে চাকরিচু্যত ১০৬ শ্রমিককে শ্রম আইন অনুযায়ী কোম্পানির লভ্যাংশ দিতে শ্রম অ্যাপিলেট ট্রাইবু্যনালের রায় কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে শ্রম অ্যাপিলেট ট্রাইবু্যনালের রায়ের কার্যক্রমে আগামী ছয় মাসের জন্য স্থিতাবস্থা দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার দুদকের উপ-পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান বাদী হয়ে সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১ এ মামলাটি করেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২)(৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। ডক্টর ইউনূস ছাড়া মামলার বাকি আসামিরা হলেন- গ্রামীণ টেলিকমের

ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজমুল ইসলাম, পরিচালক মো. আশরাফুল হাসান, পারভীন মাহমুদ, নাজনীন সুলতানা, মো. শাহজাহান, নূরজাহান বেগম, এস. এম হাজ্জাতুল ইসলাম লতিফী, অ্যাডভোকেট মো. ইউসুফ আলী, অ্যাডভোকেট জাফরুল হাসান শরীফ, গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান এবং সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসান ও প্রতিনিধি মো. মাইনুল ইসলাম।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস ও মো. নাজমুল ইসলামসহ গ্রামীণ টেলিকমের বোর্ডের সদস্যদের উপস্থিতিতে ২০২২ সালের ৯ মে গ্রামীণ টেলিকমের ১০৮তম বোর্ডের সিদ্ধান্তে ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের গুলশান শাখায় একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। কিন্তু সিদ্ধান্তের এক দিন আগেই ৮ মে ব্যাংকে হিসাব খোলা হয়। ওই ব্যাংক হিসাব দেখানো আছে সেটেলমেন্ট এগ্রিমেন্টে, যা বাস্তবে অসম্ভব। এ রকম ভুয়া সেটেলমেন্ট এগ্রিমেন্টের শর্ত অনুযায়ী ও বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক গ্রামীণ টেলিকমের ইউনাইটেড বিভিন্ন সময় ব্যাংকটিতে ২৬ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা স্থানান্তর করে। কিন্তু কর্মচারীদের লভ্যাংশ বিতরণের আগেই তাদের প্রাপ্য অর্থ তাদের না জানিয়ে আসামিরা আত্মসাৎ করেন।

গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের পাওনা লভ্যাংশ বিতরণের জন্য গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন এবং গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে সেটেলমেন্ট এগ্রিমেন্ট চুক্তি হয় ২০২২ সালের ২৭ এপ্রিল।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, অ্যাডভোকেট ফি হিসাবে প্রকৃতপক্ষে হস্তান্তরিত হয়েছে মাত্র এক কোটি টাকা। বাকি ২৫ কোটি ২২ লাখ ছয় হাজার ৭৮০ টাকা গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বোর্ড সদস্যদের সহায়তায় গ্রামীণ টেলিকমের সিবিএ নেতা এবং অ্যাডভোকেটসহ সংশ্লিষ্টরা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন।

২০২২ সালের ২৮ জুলাই কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের চার অভিযোগে গ্রামীণ টেলিকমের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। গঠন করা হয় তিন সদস্যের কমিটি। কমিটিতে তদারককারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় দুদকের তৎকালীন পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনকে। কমিটির অন্য সদস্য হলেন- দুদকের উপ-পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান, সহকারী পরিচালক জেসমিন আক্তার ও নূরে আলম সিদ্দিকী। অভিযোগ অনুসন্ধানে গত বছরের আগস্টের বিভিন্ন সময় এমডিসহ ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক।

২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এক প্রশ্নের জবাবে গ্রামীণ টেলিকমের এমডি নাজমুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিং-সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগের সঙ্গে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগতভাবে কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ইউনূসকে জিজ্ঞাসাবাদ না করে মামলা করা হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে দুদকের মহাপরিচালক মো. রেজানুর রহমান বলেন, 'অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা অত্যন্ত দক্ষ। আমাদের আইনবিধিতে যা আছে, সেই অনুসারে যাদের যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার, সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই রিপোর্ট দাখিল করেছি।'

ইউনূসসহ অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'তদন্তকারী কর্মকর্তা পরবর্তী কাজ করবেন। এটা তদন্তকারী কর্মকর্তা নির্ধারণ করবেন উনাকে কী করতে হবে। এটা তার বিষয়, তিনিই নির্ধারণ করবেন।'

অন্যদিকে, মঙ্গলবার গ্রামীণ কল্যাণ থেকে চাকরিচু্যত ১০৬ শ্রমিককে শ্রম আইন অনুযায়ী কোম্পানির লভ্যাংশ দিতে শ্রম অ্যাপিলেট ট্রাইবু্যনালের রায় কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে শ্রম অ্যাপিলেট ট্রাইবু্যনালের রায়ের কার্যক্রমে আগামী ছয় মাসের জন্য স্থিতাবস্থা দিয়েছেন আদালত। বিচারপতি জাফর আহমেদ ও বিচারপতি মো. বশির উলস্নাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

ডক্টর ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুলস্নাহ আল মামুন এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, তার সঙ্গে আদালতে ইউনূসের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এফ হাসান আরিফ। শ্রমিকদের পক্ষে শুনানি করেন- অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান ও অ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানী শরীফ।

শুনানি শেষে গোলাম রব্বানী শরীফ বলেন, 'গত ৩ এপ্রিল ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণ থেকে চাকরিচু্যত ১০৬ শ্রমিককে শ্রম আইন অনুযায়ী কোম্পানির লভ্যাংশ পরিশোধ করতে রায় দেন শ্রম অ্যাপিলেট ট্রাইবু্যনাল। এই রায় চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন ডক্টর ইউনূস।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ১০৬ কর্মকর্তা ও কর্মচারী ২০০৬ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ কল্যাণে কর্মরত ছিলেন। ২০০৬-২০১৩ অর্থবছরে কোম্পানির লভ্যাংশ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়। শ্রম আইনে বলা আছে, শ্রম আইন কার্যকর হওয়ার দিন থেকে কোম্পানির লভ্যাংশের ৫ শতাংশ শ্রমিকদের কল্যাণ ও অংশগ্রহণ তহবিল দিতে হবে। কিন্তু এই লভ্যাংশ না পাওয়ার কারণে প্রথমে শ্রমিকরা গ্রামীণ কল্যাণকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। কিন্তু এতে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় শ্রম আদালতে মামলা করেন তারা।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে