logo
বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৬

  হাসান আরিফ   ০৬ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

বিডাতেও নেই হিসাব

অবৈধভাবে কত টাকা নিচ্ছেন বিদেশি কর্মীরা!

বিডার কাজ বৈধ কর্মীদের কাজের অনুমোদন দেওয়া। অবৈধ কর্মী খুঁজে বের করা নয়। আর বিডার কাজের আওতায় তা নেইও। এই বিষয়টি দেখার জন্য বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে। তারাই অবৈধ কর্মী খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিচ্ছে

বিদেশ থেকে বাংলাদেশ কত টাকা আয় করছে তার হিসাব আছে। কিন্তু দেশ থেকে কত টাকা বিদেশি কর্মীরা নিয়ে যাচ্ছেন তার কোনো হিসাব নেই কারো কাছে। দেশে বিপুল পরিমাণ বিদেশি কর্মী রয়েছেন। তারা কী পরিমাণ টাকা দেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছেন তা জানে না বাংলাদেশ ব্যাংকসহ কোনো প্রতিষ্ঠান। এমনকি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও কী পরিমাণ টাকা নিয়ে যাচ্ছেন তারও কোনো সঠিক হিসাব নেই। বিষয়টা বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) দেখভাল করার কথা থাকলেও তাদের কাছেও নেই সঠিক পরিসংখ্যান।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ফজলে কবির বলেছিলেন, এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নেই। তবে এটি একটি ভাববার বিষয়। তিনি এই বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির কাছে সম্পদ বিবরণী দিয়েছে ৯ হাজার ৫০০ জন বিদেশি। বিপরীতে আয় দেখানো হয়েছে ৬০৩ কোটি টাকা। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বৈধভাবে প্রেরিত অর্থ ৫৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা। তবে প্রতিবছর বিদেশিরা কী পরিমাণ টাকা বাংলাদেশ থেকে আয় করে নিয়ে যাচ্ছেন তার কোনো হিসাব নেই কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে।

বিডা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে বৈধ বিদেশি কর্মীর সংখ্যা ২৫ থেকে ৩০ হাজার। তবে অবৈধ কর্মীর সংখ্যা কত আছে তা বিডার জানা নেই এবং অবৈধ শ্রমিকদের বিষয়ে বিডার কিছু করারও নেই। বিডা শুধু তাদের কাছে আসা বৈধ নিয়োগ এবং নবায়নের কাজ করে থাকে। বিডার বাইরে অন্যান্য সংস্থাও বিদেশি নিয়োগ ও বিনিয়োগের বিষয়টি দেখভাল করে বলে বিডা সূত্রটি জানিয়েছে।

এই বিষয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, দেশে বিদেশি শ্রমিক কী পরিমাণ আছে তা তার জানা নেই। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্রিকায় ভুল পরিসংখ্যান দেওয়া হয়। তার জানা মতে বর্তমানে দেশে বৈধ বিদেশি কর্মীর সংখ্যা ২৫ থেকে ৩০ হাজার। তবে নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মী যখন কাজের মেয়াদ নবায়ন করেন তখন এই কর্মীকে দুইবার গণনা করা হয়। যার ফলে এই সংখ্যা বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, বিডার কাজ বৈধ কর্মীদের কাজের অনুমোদন দেওয়া। অবৈধ কর্মী খুঁজে বের করা নয়। আর বিডার কাজের আওতায় তা নেইও। এই বিষয়টি দেখার জন্য বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে। তারাই অবৈধ কর্মী খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগ্রহ করা তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে অন্তত ২১টি খাতে প্রায় ৪৪টি দেশের বৈধ ও অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশির সংখ্যা কমপক্ষে আড়াই লাখ। এর বড় অংশই অবৈধ। আবার বিদেশিদের কেউ কেউ বৈধভাবে বাংলাদেশে কাজ করে কোনো কর না দিয়ে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। মূলত বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থায় বৈধ ও অবৈধভাবে কাজ করা বিদেশি নাগরিকদের প্রকৃত বেতন গোপন করার ক্ষেত্রে তাদের নিয়োগকারী সংস্থা সহায়তা করার কারণে রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক গবেষণায় দেখিয়েছে, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিরা প্রতি বছর অবৈধভাবে প্রায় ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে প্রতি বছর সরকারের প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।

দেশীয় আইন অনুযায়ী, দেশ থেকে কোনো বিদেশি নাগরিক তার দেশে টাকা পাঠাতে হলে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, আমাদের দেশে যেসব বিদেশি কর্মী রয়েছেন

তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়াই তো ঠিক না। তাহলে তাদের প্রেরিত টাকার হিসাব রাখা সম্ভব হয় কী করে। তাছাড়া এই ধরনের হিসাব রাখতে হলে প্রতিটা ব্যাংকের সঙ্গে আলাদা আলাদা চুক্তি করতে হয়। আমাদের সেই চুক্তি নেই।

তিনি বলেন, আমরা আমাদের বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের প্রেরিত অর্থের হিসাব রাখতে পারি। কারণ আমরা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমস্ত তথ্য আদানপ্রদান করি। ফলে আমাদের কর্মীরা কী পরিমাণ অর্থ পায় তা আমাদের জানা হয়ে যায়। কিন্তু বিদেশিদের রেমিট্যান্স নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই। ফলে তারা আমাদের কর্মীদের অর্থ সাধারণ ব্যাংক হিসাবের মতোই দেখে। তবে জনশ্রম্নতি আছে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে কয়েক বিলিয়ন টাকা শুধু ভারতেই চলে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সাবেক গভর্নর বলেন, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী প্রতিটা বিদেশি নাগরিকের নিয়োগ বিডার মাধ্যমে হওয়ার কথা। বাস্তবতা হচ্ছে এই দেশে কোনো প্রতিষ্ঠানই আইন মেনে বিদেশিদের নিয়োগ দিচ্ছে না। ফলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। আর যারা আইন মেনে নিয়োগ দিচ্ছেন তাদের সংখ্যা খুবই সামান্য।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর ৮ লাখ বিদেশি পর্যটন ভিসায় বাংলাদেশে আসে। এর মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কাজের উদ্দেশ্যে আসে। হিসাব অনুযায়ী চার লাখ বিদেশি কর্মী থাকার কথা থাকলেও পর্যটন ভিসার মেয়াদ তিন মাস হওয়ায় এ সংখ্যা কম। প্রত্যেক কর্মীকে তিন মাস অন্তর ভিসা নবায়ন করতে হয়। এমন কর্মীর প্রকৃত সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার। এর সঙ্গে বৈধভাবে কর্মরত ৯০ হাজার যোগ করলে এর সংখ্যা দাঁড়ায় আড়াই লাখ। তাদের বেতন কাঠামো ও অবৈধভাবে প্রেরিত অর্থ সম্পর্কে তথ্য নেই সরকারের কোনো সংস্থার কাছে। গত ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত তথ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশে বৈধ বিদেশি কর্মী ৮৫ হাজার ৪৯৬ জন।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক চিফ ইকোনমিস্ট ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, দেশে কী পরিমাণ বিদেশি কর্মী কর্মরত আছেন তারই সঠিক সংখ্যা কারো জানা নেই। ফলে তারা কী পরিমাণ টাকা দেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছেন তার হিসাব থাকে কী করে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, যেসব বিদেশি কর্মী বাংলাদেশে কাজ করছেন তাদের সিংহ ভাগই পর্যটন ভিসায় এসে কাজ করছেন।

তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কী পরিমাণ টাকা নিয়ে যাচ্ছেন তার একটা ধারণা পাওয়া যায় এফডিআইর ইনফ্লো আইটফ্লো থেকে। তবে তা শতভাগ সঠিক তথ্য না। আর বৈধ বিদেশি কর্মীদের অর্থেরও সঠিক হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ তাদের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তা গোপন করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক চিফ ইকোনমিস্ট বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশিরা যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, সেসব প্রতিষ্ঠানের নথিপত্রে বিদেশি কর্মীদের উলেস্নখ থাকে না। আয়কর ফাঁকি দিতে বৈধভাবে কাজ করা বিদেশি কর্মীদের বেতনও প্রকৃত বেতনের চেয়ে অনেক কম দেখানো হয়। এছাড়া প্রকৃত বেতনের একটি অংশ বৈধভাবে দেওয়া হলেও সিংহভাগই অবৈধভাবে নগদ দেওয়া হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে কাজ করা বিদেশি কর্মীদের সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য না থাকলেও সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বিদেশি কর্মী কাজ করেন তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক এনজিও, হোটেল ও রেস্তোরাঁর মতো খাতে বিদেশি কর্মীরা কাজ করে থাকেন।

জানা গেছে, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণে আলাদা কর্তৃপক্ষ রয়েছে। বাংলাদেশে আইন থাকলেও সুনির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে যে যেভাবে ইচ্ছে বিদেশিদের নিয়ে এসে তাদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করাচ্ছেন। তাদের প্রকৃত বেতনও গোপন করা হচ্ছে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে