বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
অব্যাহত গ্যাস সংকট

জনজীবনে ভোগান্তি, উৎপাদনে ঘাটতি

বিদু্যৎ উৎপাদন ব্যাহত হ পণ্যের দাম বাড়ছে, পরিবহণ খাত চরমভাবে ভুগছে হ ভুল নীতিকে দায়ী করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা
সাখাওয়াত হোসেন
  ০১ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০
দেশে দিনে মোট ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে পেট্রোবাংলা গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে ২৭৫ থেকে ২৮০ কোটি ঘনফুট। অন্য সময় বিদু্যৎ উৎপাদন অথবা সারকারখানায় সরবরাহ কমিয়ে শিল্পে গ্যাসের চাহিদা পূরণ করা হতো। এখন সেই সুযোগ না থাকায় বাসা-বাড়ি ও শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে জনজীবনে ভোগান্তি যেমন বেড়েছে, তেমনি শিল্প কারখানার উৎপাদন উদ্বেগজনক হারে কমেছে। গ্যাস সংকটে পরিবহণ খাত চরমভাবে ভুগছে, বিদু্যৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বাড়ায় আমদানি করা গ্যাস সরবরাহ কমেছে। দেশেও বাড়ছে না গ্যাসের উৎপাদন। অন্যদিকে বিদু্যৎকেন্দ্রের বিকল্প জ্বালানি ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের দাম বেড়ে গেছে। ফলে আবাসিক ও শিল্পকারখানায় সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে গ্যাস দিয়েই বিদু্যৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে। বিশ্ববাজারে সারের দাম চড়া, আমদানিতে বাড়তি খরচ লাগছে। তাই দেশি সারকারখানা চালু রাখতে হচ্ছে। এদিকে শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমায় বেশিরভাগ দেশীয় ভোগ্য পণ্যের দাম হু-হু করে বাড়ছে। যার খেসারত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনগণকেই দিতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদনে ঘাটতিতে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে মূল্যস্ফীতি এখন ডাবল ডিজিট ছুঁইছুঁই করছে। এ পরিস্থিতিতে সংসার খরচ সামলাতে নিম্ন-মধ্যবিত্তদের রীতিমতো নাভিশ্বাস উঠেছে। গ্যাসের এ সংকট কবে নাগাদ কাটবে তা এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, সংকট কাটতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে বাড়তি গ্যাস পাওয়ার চেষ্টা করছে। সেই সঙ্গে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে উৎপাদন অংশীদারি চুক্তির সংশোধনী এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সময় লাগবে ২ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত। অর্থাৎ আপাতত গ্যাস সংকট কাটার কোনো সম্ভাবনাই নেই। অন্যদিকে বর্তমান সংকটে বিশাল সম্ভাবনাময় সমুদ্রসীমায় গ্যাস উত্তোলনকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এজন্য বহুজাতিক তেল গ্যাস কোম্পানি- আইওসি'র হিস্যা ও দাম বাড়ছে মডেল উৎপাদন অংশীদারি চুক্তিতে। স্থলভাগে গ্যাসের উত্তোলন বাড়াতে আগামী তিন বছরে নতুন এবং ওয়াকওভার মিলিয়ে মোট ৪৬টি কূপ খননের পরিকল্পনা আছে পেট্রোবাংলার। যদিও এসব পদক্ষেপ চলমান গ্যাস সংকট দ্রম্নত কাটানোর ক্ষেত্রে অকার্যকর। শিল্পমালিকরা জানান, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও গাজীপুরের কারখানাগুলো সচল রাখতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। গাজীপুরে বিকাল পাঁচটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে দিনের বেলায় গ্যাস পাওয়া যায় না, রাতে উৎপাদন কাজ চালাতে হয়। গ্যাস সংকটের কারণে প্রোডাকশন কমে যাওয়ায় উৎপাদিত পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। তাদেরকেও কাঁচামাল বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। সবমিলিয়ে লাভ কমে প্রায় শূন্যের কোটায় এসে ঠেকেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অনেক শিল্পকারখানা শিগগিরই বন্ধ হয়ে যাবে। বিশেষ করে যেসব কলকারখানা বিশাল অঙ্কের ব্যাংক ঋণ নিয়ে চলছে, তা গুটিয়ে নিতে মালিকরা বাধ্য হবেন। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নারায়ণগঞ্জে সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা, কোনো কোনো দিন রাত ১১টা পর্যন্ত গ্যাসের চাপ শূন্য বা তার কাছাকাছি থাকে। ফলে সে সময় পূর্ণ উৎপাদন সম্ভব হয় না। রাতে গ্যাসের চাপ বাড়লে উৎপাদন করতে হয়। এতে উৎপাদন প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। এদিকে গ্যাস সংকটে আবাসিক গ্রাহকদেরও বেশ কিছু দিন ধরে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গ্যাস না থাকায় অনেকের রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে না। তাই পরিবারের জন্য হোটেল থেকে খাবার কিনে এনে খেতে হচ্ছে। অনেকে চিড়া-মুড়ি-গুড় ও পাউরুটি-কলাসহ বিভিন্ন শুকনা খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। রাজধানীর খিলগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা বিলকিস ফাতিমা বলেন, 'গ্যাসের সমস্যার কারণে তিনি ঠিকমতো রান্না করতে পারছি না। প্রায় সময়ই পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবার বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে। অতিথি এলে চরম বিব্রত হতে হচ্ছে।' গোড়ানের বাসিন্দা ফারহানা ইসলাম জানান, তাদের এলাকায় মধ্য রাতে গ্যাস আসে। রাতেও রান্না করা যাচ্ছে না। ভোর থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না বললেই চলে। মাঝখানে টিমটিম করে জ্বললেও সে আগুনে রান্না করা যায় না। নাখালপাড়ার বাসিন্দা এজাজুল হক জানান, তার পরিবার বেশ কিছু দিন ধরে ছাদে কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করছে। কেউ কেউ তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার কিনে রান্নার কাজ চালাচ্ছেন। এতে তাদের খরচ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। কেননা তাদের এলপিজির দামও দিতে হচ্ছে। আবার সরকারি গ্যাসের বিলও পরিশোধ করতে হচ্ছে। তিতাসের জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষে দায়িত্বরত একজন কর্মকর্তা জানান, সারাদিনই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্যাস সংকটের অভিযোগ আসছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পাইকপাড়া, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, পুরান ঢাকা, কল্যাণপুর ও উত্তরা থেকে আসা অভিযোগ বেশি। তারা এসব অভিযোগ লিপিবদ্ধ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। বিদু্যৎ ব্যবস্থা উন্নত রাখার জন্য বিদু্যৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (পিডিবি) বেসরকারি বিদু্যৎকেন্দ্রগুলোকে বেশি হারে গ্যাস দিতে হচ্ছে। যার প্রভাব পড়েছে আবাসিক গ্যাস সরবরাহে। গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কথা স্বীকার করে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বলেন, সারা বিশ্বেই এখন গ্যাসের সমস্যা। এ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে চিন্তাভাবনা চলছে। দাম সহনীয় হলে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর কথা ভাবতে পারে সরকার। এখন দেশি উৎস থেকে উৎপাদন বাড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এদিকে পরিবহণে গ্যাস সরবরাহকারী সিএনজি স্টেশনগুলো এখন দিনে পাঁচ ঘণ্টা (সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা) করে বন্ধ থাকছে। বাকি সময়েও ঠিকমতো গ্যাস পাচ্ছেন না তারা। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, সাধারণত ১৫ পিএসআই (গ্যাসের চাপ মাপার একক) থাকলে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। ১০ পিএসআই হলেও তা দিয়ে কাজ চালানো যায়। কিন্তু দুই মাস ধরে বেশির ভাগ সময় দিনের বেলা দুই থেকে তিন পিএসআইয়ের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। রাত ১২টার পর চাপ বাড়ে। তখন আর গ্রাহক থাকে না। বিশ্বব্যাপী দাম বাড়ায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না মিলছে না বলে বিদু্যৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া প্রসঙ্গে এ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে ব্যর্থতার কারণে দেশ আমদানি নির্ভর হয়ে পড়ায় এমন পরিস্থিতি হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সামসুল আলম বলেন, গ্যাস সংকট থেকে উত্তরণের পথ একটাই। প্রথমত, সাধারণ খাতে জ্বালানি ও বিদু্যতের ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় খাতে বিদু্যৎ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। দোকানপাটে রাতে পিকআওয়ারে বন্ধ করতে হবে। ওভারঅল সাপস্নাই চেইনে বিদু্যৎ এবং গ্যাসে যত ধরনের অন্যায় ও অযৌক্তিক মিশ্রমূলক মুনাফা-ব্যয় যুক্ত হয়েছে তা মুক্ত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ভোক্তাদের টাকা শতভাগ ব্যবহারে কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করে সেই পরিকল্পনা মাফিক গ্যাস অনুসন্ধান চালাতে হবে। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি, জ্বালানির দাম, জ্বালানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতা, গ্যাসের মজুত ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতা প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, 'যারা জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা করেছেন, এই দায় তাদের। আমাদের আমদানি করা জ্বালানির একটি বড় অংশ যায় বিদু্যৎ উৎপাদনে। আমাদের পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপস্ন্যান-২০১৬, যদি দেখি তাহলে আমরা দেখব বাংলাদেশ যে ভবিষ্যতে পুরোপুরি জ্বালানি আমদানি নির্ভর একটি দেশে পরিণত হবে, তার ইঙ্গিত সেখানে রয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে যে বিদু্যৎ উৎপাদন খাত ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ ভাগ আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৯০ ভাগ আমদানি নির্ভর হবে। মানে আমাদের পরিকল্পনার মধ্যেই এমনটি রয়েছে। অন্যদিকে পেট্রোবাংলা মেনে নিয়েছে যে তাদের উৎপাদন কমে যাবে। উৎপাদন কীভাবে ধরে রাখা যায় বা বাড়ানো যায়, সে ধরনের কোনো পরিকল্পনা তারা নেয়নি। বরং তারা এটা ধরেই নিয়েছে যে গ্যাস আর নেই, গ্যাস শেষ হয়ে যাবে।' তিনি বলেন, পেট্রোবাংলা বলছে, '২০২৩ সালের মধ্যে আমাদের সামগ্রিক গ্যাস উৎপাদন কমে যাবে এবং সেটা পূরণ করা হবে আমদানি করা গ্যাসের মাধ্যমে। অর্থাৎ পেট্রোবাংলা ও পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপস্ন্যানের মধ্যেই জ্বালানিক্ষেত্রে বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতার বিষয়টিকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। অথচ আমরা বারবার বলে আসছি যে আমাদের গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। উচ্চতর প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গ্যাস উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে।'
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে