শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১

সৈয়দপুরে ট্রেন-ট্রাজেডি দিবস পালিত

সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি
  ১৩ জুন ২০২৪, ১৯:১৩
ছবি-যায়যায়দিন

১৯৭১’ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত ১৩ই জুন সৈয়দপুরের ট্রেন-ট্রাজেডির নৃশংস গণহত্যা দিবস যথাযথ মর্যাদায় বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) নীলফামারীর সৈয়দপুরে পালিত হয়েছে।

দিবসটি উপলক্ষে শহীদ বেদীতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, ১ মিনিট নিরবতা পালনসহ আলোচনা সভা প্রভৃতি কর্মসূচী পালন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচীতে স্থ’ানীয় শহীদ পরিবারের সংগঠন প্রজন্ম’৭১, রক্তঝরা-৭১’ ও বীর মুক্তিযোদ্ধারাসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতি সংগঠনের নেতা-কর্মিরা অংশ নেন।

এ উপলক্ষে সৈয়দপুর শহরের রেলওয়ে জেলা পুলিশ ক্লাবের সামনে শহীদ অম্লাণ চত্বরে মহান মুক্তিযুদ্ধে স্থানীয় শহীদদের সম্মানে নির্মিত শহীদ স্তম্ভে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান, নীলফামারী-৪ আসনের এমপি সিদ্দিকুল আলম সিদ্দিক, শহীদ পরিবারের সদস্য সাবেক সংরক্ষিত মহিলা এমপি’ রাবেয়া আলিম, আ’লীগ সৈয়দপুর উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি প্রকৌশলী একেএম রাশেদুজ্জামান রাশেদ, সাধারন সম্পাদক মোহসিনুল হক, অধ্যাপক সাখাওয়াৎ হোসেন খোকন, সুমিত আগরওয়াল নিক্কি, রঞ্জিত ঘোষ, ইফফাত জামান কলি, প্রকৌশলী মুজিবুল হক প্রমূখ।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ১৩ জুন সকাল ১০টায় সৈয়দপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল এ ট্রেনটি।

কয়েক দিন ধরে সৈয়দপুর শহরে পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষ থেকে মাইকে প্রচার হচ্ছিল-“শহরে যেসব হিন্দু-মাড়োয়ারি আটকা পড়ে আছেন, তাদের নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়া হবে। এ জন্য একটা বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ট্রেনটি সৈয়দপুর রেলস্টেশন থেকে ভারতের শিলিগুড়ির উদ্দেশে ছেড়ে যাবে।”

মাইকে ঘোষণা শুনে যুদ্ধে লুটতরাজের হাত থেকে যা’ কিছু সম্বল বেঁচে গিয়েছিল, তাই গোছাতে শুরু করেন হিন্দু বাঙালী ও মাড়োয়ারিরা। ১৩ জুন সকালে তারা সমবেত হতে থাকেন সৈয়দপুর রেলস্টেশনে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো এই ট্রেনটিতে গাদাগাদি করে উঠে বসেন সবাই।

৫২ বছর পর এ ঘটনার বর্ণনা দেন সেই ট্রেনে চেপে বসা মাড়োয়ারি পরিবারের বেঁচে যাওয়া ক’জন সদস্য। ওইদিন ঠিক সকাল ১০ টার দিকে স্টেশন থেকে ছেড়ে যায় ট্রেনটি। চলছিল ধীরে-ধীরে। শহর থেকে বেরিয়ে রেলওয়ে কারখানা পেরিয়েই হঠাৎ থেমে যায় ট্রেন। জায়গাটা স্টেশন থেকে দুই মাইল দূরে। নাম গোলাহাট।

ট্রেন থামার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেন মাড়োয়ারি পরিবারের সদস্য তপন। বন্ধ জানালা একটু ফাঁক করতেই তিনি শিউরে উঠেন। বাইরে সারি-সারি পাকিস্তানি হানাদার সেনা। সঙ্গে তাদের দোসর বিহারিরা। সেনা সদস্যদের হাতে রাইফেল। আর বিহারিদের হাতে ধারালো রামদা। থেমে থাকা ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে ঢুকেই পাকিস্তানি সেনারা চিৎকার করে উর্দুতে বলতে থাকে, “একজন একজন করে নেমে আসো। তোমাদের মারতে এসেছি আমরা। তবে পাকিস্তানের দামি গুলি খরচ করা হবে না। সকলকে এক কোপে বলি দেওয়া হবে।’

সঙ্গে-সঙ্গে শুরু হয়ে যায় বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞ। ধারালো রামদা দিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছিল গলা, যেন বলি দেওয়া হচ্ছে। ওই হত্যাযজ্ঞে শিশু, বৃদ্ধ, নারীরাও রেহাই পায়নি। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, সেদিন ওই ট্রেন হত্যাযজ্ঞে ৪৪৮ জনকে একে-একে রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওই হত্যাযজ্ঞ থেকে কোনো রকমে আশ্চর্যজনকভাবে সেদিন প্রাণে বেঁচে যান মাত্র ১০ জন যুবক। তারা ট্রেন থেকে নেমে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে দিনাজপুরে যান।

১৩ই জুন, নীলফামারীর কুখ্যাত গোলাহাট গণহত্যা দিবস। যাকে পাকিস্তানি দোসররা নাম দিয়েছিল 'অপারেশন খরচাখাতা' হিসাবে।

যাযাদি/ এম

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে