সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯
walton1

হাওড়ে আর শোনা যায় না পাখির কিচিরমিচির 

মন্তোষ চক্রবর্তী, অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ) থেকে
  ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৩:২০
আপডেট  : ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৩:২৭
এইভাবেই হাওরে অতিথি পাখি শিকার করে প্রকাশ্যে বাজারে বিক্রি করছে।

শীতের শুরুতেই কিশোরগঞ্জের, অষ্টগ্রাম, ইটনা,মিঠামইন,বাজিতপুর নিকলী,হবিগঞ্জের লাখাই, আজমিরিগঞ্জ, বানিয়াচং, ব্রহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর,সরাইলসহ পাশ্ববর্তী  উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওর গুলোতে ঝাঁক বেঁধে আসতো দেশীয় ও শীতকালীন অতিথি পাখি।পাখিদের কিচিরমিচির শব্দের মুখিরিত হতো হাওর পাড়, মানুষের ঘুম ভাঙতো সেই মধুর সুরে। পাখি দল বেঁধে দাপিয়ে বেড়াতেন এক জলাশয় থেকে অন্য  জলাশয়ে উড়াল দিলেই শুনা যেত সুমধুর  শব্দ। কিন্তু সেই শব্দ বিগত কয়েক বছর ধরে আর শোনা যায় না।

 হাওরের লোকজনের এখন আর ঘুম  ভাঙ্গে না অতিথি পাখি বা দেশীয় প্রজাতির  নানা পাখির কিচিরমিচির মুখরিত ডাকে।
হাওর অধ্যুষিত উপজেলার হাওড়-বাঁওড় গুলোতে শীতের মৌসুমে  এক সময় দেশীয় পাখির রাজ্য বলা হতো কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতিটি হাওরকে। 

কিন্তু উপজেলা পর্যায়ের প্রতিটি গ্রামের ঘরবাড়ি আধুনিকায় কারনে প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে  দেশীয় ও মৌসুমকালীন অতিথি  পাখির আশ্রয়ের ঠিকানা আবার অন্যদিকে কৃষি কাজে চাষাবাদ করতে জমিতে ব্যবহার হচ্ছে  কীটনাশক ফসল  ফলে কিশোরগঞ্জের জেলা ও পাশ্ববর্তী জেলার হাওর গুলোতে কমছে দেশীয় ও শীতকালীন পাখি। 

অন্যদিকে একশ্রেণির লোক রয়েছে শীত মৌসুমে বি়ভিন্ন প্রজাতির পাখি শিকার করে বাজারে বিক্রি করলেও স্থানীয় প্রশাসনের তেমন কোন উদ্যোগ চোখে না পড়ার কারনে এই শিকারীগুলো দিনে দিনে আরোও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে হাওর পাড়ের স্থানীয়দের সাথে আলাপ কালে জানা যায়,গ্রামের লোকজনের প্রয়োজনের তাগিদেই গ্রাম পাড়াসহ হাওরের বিভিন্ন চাষাবাদের ব্যবহার উপযোগী স্থানগুলোতেও তৈরি হচ্ছে ঘরবাড়ি মাটির ঘর থেকে তৈরি দালান হচ্ছে। ফলে পাখিরা বাসস্থান হারিয়ে ছুটছে অন্যত্র। ফলে পাখির কিচিরমিচির ডাকে এখন আর শুনা যায়না।

গ্রামের প্রবীণ ব্যাক্তিরা জানান, আগেও মাঠ-ঘাট,চাষাবাদের ফসলি জমিনে ছিল দেশীয় ও শীতের  মৌসুমে বিভিন্ন অতিথি পাখিদের চোখ, মন এবং  প্রাণ জুড়ানোর বিচরণ ছিল। ঝাঁক বেঁধে খাদ্যের সন্ধানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত পাখিরা। চাষাবাদের ফসলি জমি গুলোতে পাখি বসার দৃশ্য সচরাচর দেখা যেতো বর্তমানে এমন দৃশ্য আর চোখে পড়ে না।ফলে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই চেনে না এসব পাখিদের কে ফলে বর্তমান প্রজন্মের ও শিশু-কিশোরদের কাছে যেন দেশীয় ও শীতকালীন অতিথি পাখিগুলো কেবলই হারিয়ে যাওয়ার গল্পে শুনা  ইতিহাস।

 বিগত কয়েক বছর আগেও বিস্তীর্ন হাওর অঞ্চলের গ্রাম এবং  হাওর গুলোতে  টুনটুনি, চিল,পানকৌড়ি, ডাহোক,বালি হাঁস, কোকিল,বক,শালিক, ঘুঘু, দোয়েল, বাবুই, টর, কাকসহ বিভিন্ন পাখির দেখা মিলতো।  আর তেমন দেখা যায় না। শোনা যায় না এসব পাখির ডাক। গ্রামবাংলার অতি পরিচিত বসন্তের কোকিলের শব্দও এখন প্রায় বিলুপ্তীর পথে।

অভিজ্ঞ মহলের ভাষ্যমতে,হাওরে একদিকে চাষাবাদের জন্য ফসলী জমিনে কীটনাশক ব্যবহার ও হাওড়ে পাখিদের জন্য প্রাকৃতিক খাদ্য সংকট এবং কতিপয় পাখি শিকারীদের কারণেই দেশী ও শীতকালীন মৌসুমী পাখি বিলুপ্তির ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। চাষাবাদের জন্য হাওড়ের বিভিন্ন ফসলে সব সময় কীটনাশক ব্যবহার করেন। এতে পাখির খাদ্য  বিভিন্ন প্রকার কীটপতঙ্গ মারা যায় বা রোগে আক্রান্ত হয়। এছাড়া শিকারিদের নিষ্ঠুরতা তো রয়েছেই। ফলে পাখির বিলুপ্তির কারণে হারিয়ে ফেলছে সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ।

হাওে অধ্যুষিত কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার বড়হাটি গ্রামের রুস্তম আলী জানান, হাওরে আগে পাখিদের  প্রচুর প্রাকৃতিক খাদ্য সামগ্রী পাওয়ার থাকত কিন্ত বর্তমানে হাওরে পাখিদের জন্য প্রাকৃতিক খাদ্য সংকট থাকার কারনেই এখন আর আগের মত পাখির দেখা পাওয়া যায় না। একই উপজেলা আরেক কৃষক মোহসীন মিয়া জানান, আগে প্রচুর পাখিরা ঝাঁক বেঁধে বেঁধে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়ে যেত আর সেই দৃশ্য দেখতো সকলই কিন্তু এখন আর দেখা না, তিনি আরোও বলেন, হাওড়ে এখনো শীতকালীন মৌসুমে অতিথি পাখি আসে সেই পাখিগুলোকেও শিকারীরা শিকার করে বাজারে বিক্রি করে দেয়। 
অষ্টগ্রামের বড় হাওরে কৃষক মানিক মিয়া  বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন প্রচুর পাখি ধরতে পেরেছি আর বর্তমানে সেইসব পাখিগুলো আর চোখেই দেখা যায় না। হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জের বদলপুর ইউনিয়নের পাহাড়পুর গ্রামের বায়োবৃদ্ধ নরেশ দাস বলেন, এই হাওড়ে আগে শীতের সময় প্রচুর পাখি দেখা পাওয়া যেত কিন্ত এখন আর পাখির দেখাও মিলে না।

 লাখাই উপজেলার হযরত আলী নামের আরেক কৃষক জানান, এই হাওরকে এক সময় পাখিদের হাওর বলা হতো বর্তমানের কথা আর কি বলব?  তিনি আরোও বলেন, এক সময় দেশীয় ও শীতকালীন মৌসুমে অতিথি  পাখিদের  কিচিরমিচির মুখরিত শব্দে ঘুম ভাঙত আর  এখন আর সেই পাখি নেই।

বিস্তৃত হাওর অঞ্চলের বিভিন্ন হাওর গুলোতে ঘুরে দেখার সময় একাধিক হাওরের কৃষি ও চাষাবাদ কাজে থাকা কৃষকদের সাথে কথা বললে তারা জানান, আগে হাওরের প্রতিটি ফসলী জমিন করার সময় জমিনে পাখি বসে থাকতো। কিন্তু এখন হাওরের জমিন আবাদ হচ্ছে কিন্ত পাখিদের দেখা পাওয়া খুবই ধূসর। যদিও মাঝে মাঝে এইসব পাখিদের দেখা মিললেও পাখি গুলোকে পড়তে  শিকারীদের নিষ্ঠুরতার কবলে।

 জানা যায়, অতিথি পাখি গুলো সাধারণ  প্রতি বছর নভেম্বর মাস থেকেই  হাওরের বিভিন্ন জলমহাল ও নির্জন মাঠে ঘাটে আসা শুরু করতো এবং প্রতিটি হাওরের দল বেঁধে গাছের ডালে সঙ্গিনী নিয়ে উড়াউড়ি করতো।।কিন্ত বিগত কয়েক বছর ধরে বিস্তৃর্ন এই হাওর অঞ্চলে শীতকালীন মৌসুমে অতিথি এবং দেশিয় পাখিদের খুব একটা চোখে দেখা যায় না। 

এব্যাপারে হাওর অঞ্চলবাসী ঢাকা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশবাদী রোটারিয়ান কামরুল হাসান বাবু, বলেন, হাওরে অতিথি পাখির বিচরনের জন্য অভয়ারণ্যে তৈরি করা যায়নি,পাখির আবাস স্থল ও জীবন রক্ষায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনের অভাব রয়েছে। পাখির পক্ষে আইন প্রয়োগ করার মাধ্যমে মানুষ কে আরোও সচেতন করা গেলেই হাওরে হবে পাখির নিরাপদ আবাস এবং পাখি শিকারিদের কে দমন করতে স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ করতে হবে। 

যাযাদি/সাইফুল

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে