শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
সরেজমিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

ঢামেকের শিশু ওয়ার্ডে তিন গুণের বেশি রোগী

পাঠান সোহাগ
  ০৪ মে ২০২৪, ২১:১৬
ফাইল ছবি

সাত মাস বয়সের শিশু আফিয়া শ্বাসকষ্ট, জ্বর নিয়ে ২১০ নম্বর ওয়ার্ডে ১ নম্বর শয্যায় ভর্তি হয়েছেন। একই শয্যায় আছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের দুই বছর চার মাসের বাচ্চা আব্দুল্লাহ। এ শয্যায় দুই শিশুর দুই মাসহ চারজন অবস্থান করছেন। একই ওয়ার্ডের বেড ১ এক সামনে মেঝেতে তিন জন শিশু চিকিৎসা নিচ্ছিন। এদের একজন শরীয়তপুরের নয় বছরের শিশু মনিরা, ফরিদপুর রাজবাড়ির ১০ বছরের শিশু সাগর, অন্যজন যাত্রাবাড়ির আলেয়া।

প্রত্যেক শিশুর সঙ্গে এক বা দুই জন অভিভাবক আছেন। চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড বয়, আয়া ও আনসার সদস্যসহ প্রায় ২০০ জন মানুষের আনা গোনা। মানুষে গিজজিস করছে এ ওয়ার্ডের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা। উৎকট গন্ধ বেরুচ্ছে ওয়ার্ড থেকে। রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে গরমে চিকিৎসকের কপাল চিপ বেয়ে পানি পড়ছে। এটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের শিশু ইউনিট—৩ এর ২১০ নম্বর ওয়ার্ডেও চিত্র।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এক শয্যায় দুই শিশু। দুই শয্যার মাঝে ফাঁকা জায়গায় শিশু, মেঝেতে, বারান্দায় আছে শিশু রোগী। ১৪ শয্যার এ ওয়ার্ডে ৫২ জন শিশু চিকিৎসা নিচ্ছেন। শুধু ২১০ নম্বর ওয়ার্ডেই নয় এমনকি ২০৭ ও ২০৮ নম্বর ওয়ার্ডে একই অবস্থা।

হাসপাতাল কতৃর্পক্ষ বলেছে, শিশু বিভাগের অন্তঃ বিভাগে জেনারেল পেডিয়াট্রিক্স ওয়ার্ডে ইউনিট আছে ৫টি । এই ৫টি ইউনিট নিয়ে ২০৭, ২০৮, ২১০ নম্বও ওয়ার্ড। এ ওয়ার্ডগুলোতে খাতা পত্রে শয্যা আছে ৫৬টি। কিন্তু শয্যা বসানো আছে ৬০টি। এই শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি থাকে তিন থেকে চার গুণ। পুরো হাসপাতালে ২ হাজার ৬০০ শয্যার মধ্যে রোগী ভর্তি থাকে সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজারের মতো।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২১০ নম্বর ওয়ার্ডে ১৪ শয্যার বিপরীতে ৫২ জন শিশু চিকিৎসা নিচ্ছেন। ২০৭ নম্বর ওয়ার্ডে ১৮ শয্যার বিপরীতে ৮৫ জন শিশু ভর্তি আছেন। পাশাপাশি ২০৮ নম্বর ওয়ার্ডে ২৪ শয্যার মধ্যে ৫৩ জন শিশু ভর্তি আছে। অর্থাৎ এই তিন ওয়ার্ডে রোগী মোট শিশু রোগী ভর্তি আছেন ১৯০ জন। এছাড়া এ হাসপাতালের অন্যান্য ওয়ার্ড গুলোকে একই অবস্থা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. ইফ্ফাত আরা শামসাদ যায়যায়দিনকে বলেন, সাধারন শিশু ওয়ার্ডে ৬০ টার মতো শয্যা আছে। এর মধ্যে ২০০ থেকে ২৫০ রোগী ভর্তি থাকে। আমাদের এখানে শয্যার তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকেন। এই হাসপাতালে সারাদেশ থেকে রেফারেল রোগী রেশি আসে। প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ। এখানে প্রতিদিনই শয্যা সংকট থাকে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু বিভাগের চিকিৎসকরা বলেছেন, গরমে শিশুদের রোগবালাই বাড়ছে। তীব্র গরমে শিশুদের জ্বর, ঠান্ডা, কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গরমের হিটস্ট্রোকের কোনো রোগী আসেনি। আমাদের যে শয্যা রয়েছে তার মধ্যে কোনো শয্যায় কোনো সময় খালি থাকে না। বরং বেশির ভাগ সময় এক সিটে দুই শিশু থাকে। আমাদের তখন সেই ভাবেই চিকিৎসা দিতে হয়।

ডা. ইফ্ফাত আরা শামসাদ জানান, হিটস্ট্রোকের কোনো রোগী এখনো আমাদের ওয়ার্ডে আসেনি। নিউমোনিয়া রোগী বেশি আসছে। নরমাল ডায়রিয়ার রোগী আমরা পাই। সিরিয়াস ডায়রিয়ার রোগী আইসিডিডিআর,বিতে চলে যায়। এ ছাড়া গরমে জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশি নিয়েও শিশু রোগী আসছে।

সরেজমিনে হাসপাতালের ২১০ নম্বর ওয়ার্ডে কথা হয় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের দুই বছর চার মাসের বাচ্চা আব্দুল্লাহর মায়ের সঙ্গে। মা লাভলি বেগম জানান, ফুসফুসের সমস্যা কারনে গমরে ঠাণ্ডা লেগে যায়। কাশতে কাশতে নাক, মুখ বুক ফুলে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে হাসপাতালে নিয়ে আসি।১৩ এপ্রিল হাসপাতালে ভর্তি হয়। গত মঙ্গলবারে একবার ডেসিং করা করে পাইপ লাগিয়ে দেওয়া হয়। গত কাল আবার ডেসিংকরার কথা ছিল হয়। কিন্তু হয়নি। একই শয্যায় শিশু আফিয়ার মা রুমা বেগম বলেন, ১২ দিন আগে ভর্তি হয়েছে। এখনও অবস্থার উন্নতি হয়নি। দুই শিশু এক শয্যায় থাকে আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কবে ছুটি দিবে এখনও কিছুই বলেনি চিকিৎসাকরা। একই ওয়ার্ডের শয্যা ১ এক নিচে তিন জন শিশু মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছিন। এদের একজন শরীয়তপুরের নয় বছরের শিশু মনিরা। মনিরা নানি নাছিমা খাতুন জানান, গত মঙ্গলবারে এ হাসপাতালে জ্বর নিয়ে এসেছি। এখানে পরীক্ষা করে চিকিৎসারা বলেছেন ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। এখন একটু ভালো আছেন।

পাশেই মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন ফরিদপুর রাজবাড়ির ১০ বছরের শিশু সাগর। সগরের মা জানান, গত মঙ্গলবারে এখানে ভর্তি করা হয়ে। ওর কিডনিতে সমস্যা ছিল। গরমের কারনে ঠাণ্ডা জ্বর হলে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে সাগর। দুর্বলতা কারনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না।তাই হাসপাতালে নিয়ে আছি এখন চিকিৎসা চলছে কিন্তু দুর্বলতা কাটেনি।

শিশু রোগীর স্বজনেরা জানিয়েছেন, ঢাকা মেডিকেল একটা আস্তার জায়গায়। এখানে মেঝেতে বা বারান্দা শুয়ে থাকলেও শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে। আমরা এই ভরসায় ঢাকা মেডিকেল নিয়ে আসি।

এ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স কে আজাদ যায়যায়দিনকে জানান, শুক্রবার শনিবার শিশু রোগী একটু কম থাকেন। অন্য দিনগুলোতে বারান্দ, মেঝে, প্রতি শয্যায় দুই তিন জন রোগী ভর্তি থাকেন। তখন প্রতি ওয়ার্ডে ১২০ জনের উপরে রোগীর্ থাকেন। সে সময় আমদের সেবা দিতে খুবই কষ্ট হয়ে যায়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত কোনো রোগীর তথ্য দিতে পারেনি।

যাযাদি/ এস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
X
Nagad

উপরে