বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
'জ্বীন' সিনেমায় পুজা চেরী

নতুন ধারার গল্পে ঢাকাই সিনেমা

মাতিয়ার রাফায়েল
  ৩১ মে ২০২৩, ০০:০০
নতুন ধারার গল্পে ঢাকাই সিনেমা

ঢাকাই সিনেমায় যুক্ত হয়েছে নতুন ধারা। 'সাইকো' এবং 'ভৌতিক' বা 'হরর' ধারার সিনেমা বলতে গেলে এ দেশে একটা নতুন কৌশল নিয়ে আসছে। বাংলাদেশসহ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই এমন নতুন নির্মাতা প্রজন্ম উঠে আসছে, যারা তাদের গল্প, ভাষা ও ভঙ্গি দিয়ে বদলে দিচ্ছে সিনেমার প্রচলিত চেহারা। নতুন ধারার এই সিনেমা অবশ্য ইউরোপসহ হলিউড ও ভারতে অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে। ভূত বা অতিপ্রাকৃত কোনো কিছুতে অনেকের বিশ্বাস নেই। তারপরেও ভৌতিক কাহিনী শুনতে বা ভূতের গল্প পড়তে পছন্দ করা মানুষও কম নেই। সম্প্রতি বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের মধ্যেও কেউ কেউ এই ধারাটির প্রতি আগ্রহী উঠতে দেখা যাচ্ছে।

নতুন এই ধারার মধ্যে 'হরর' (ভৌতিক) ছাড়াও আছে সাইকো (মনস্তাত্ত্বিক), সায়েন্স ফিকশনাল বা কল্পকাহিনীভিত্তিক সিনেমা। সায়েন্স ফিকশনাল সিনেমা একেবারেই ইউরোপীয়। এটা কিছুতেই আমাদের দেশীয় নয়। তবে সাইকো বা হরর (ভৌতিক) জাতীয় গল্প আমাদের দেশেও বহু আগে থেকেই আছে। দক্ষিণারঞ্জন মিত্রের 'ঠাকুর মা'র ঝুলি' থেকে শুরু করে বহু ভৌতিক গল্প হয়েছে আমাদের দেশে। সাইকো বা মনস্তাত্ত্বিক গল্পের ক্ষেত্রে তো কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ক্ষুধিত পাষাণ' একটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে আছে। তবে এ ধারার গল্পের প্রয়োগ আমাদের সিনেমায় যেন একেবারেই দেরিতে দেখা দিচ্ছে।

আশির দশকে প্রথম প্রচেষ্টা থাকলেও সেটা দাঁড়ায়নি। যদিও এসব ছবি নির্মাণে বড় বাজেটের দরকার হয় না। তারপরেও বিগ বাজেটের ভিএফএক্স ছাড়াও ভালো মানের হরর ফিল্ম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তৈরি হয়েছে। 'হ্যালোউইন', 'টুয়েন্টি এইট ডেজ লেটার', 'দ্য এক্সরসিস্ট' 'আনাবেলে'. 'হরর অব স্পাইডার আইল্যান্ড', 'ইট' এবং 'ইট চ্যাপ্টার টু' প্রভৃতি হরর সিনেমার কথা উলেস্নখ করা যায়। বাংলাদেশে হরর ধারার সিনেমায় আগে দর্শক গ্রহণযোগ্যতা না পেলেও এখন নতুন করে এর প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যবসা তেমন না করলেও দর্শক কোনো কোনোটিতে ইতিবাচকভাবেই সাড়া দিয়েছে।

সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে নাদের চৌধুরী পরিচালিত 'জ্বীন' সিনেমা। ছবিটি প্রযোজনা করেছে জাজ মাল্টিমিডিয়া। ছবিটির প্রতি দর্শকের মাঝেও ভালো সাড়া দেখা গেছে। অনেকে এই ছবিটিকে 'হরর' সিনেমা বললেও এর পরিচালক নাদের চৌধুরী অবশ্য এটিকে 'সাইকো' ছবি বলতেই আগ্রহী। পরিচালকের এই বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়, এদেশের মানুষ যেহেতু এই ধারার ছবির সঙ্গে নতুন পরিচিত হচ্ছে তাই এই ধারাটি সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা নেই। যে কারণে এখানে 'সাইকো' সিনেমাকে 'হরর' সিনেমা মনে করছে। এরকম মাঝামাঝি ধারণার মধ্যেই ঢাকাই সিনেমার প্রায় ৬৮ বছরের ইতিহাসে মাত্র ১১টি ভৌতিক সিনেমা হয়েছে।

'হরর' বা 'ভৌতিক' সিনেমা দর্শকের মনে ভয় বা ত্রাস ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপার থাকে। আবার এই ভয়ের মধ্যে বিনোদনও থাকে। 'সাইকো' সিনেমায় এটা হয় না। 'সাইকো' সিনেমায় থাকে মনোবিকলনজনিত সমস্যা। সারা বিশ্বেই ভৌতিক সিনেমার আলাদা কদর রয়েছে। ভূত, সাসপেন্স, ভয় নিয়ে ছবি নির্মাণ হয় অহরহ। এগুলো ব্যবসায়িক সফলতাও পায়। তবে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি ভৌতিক সিনেমা নির্মাণ হয়েছে। আর এগুলোর বেশিরভাগই খুবই জঘন্য মানের।

'জ্বীন' ছবিটিকে যদি সাইকো ঘরানার ছবি ধরি তাহলে বাংলাদেশে সর্বশেষ ভৌতিক সিনেমা হিসেবে মুক্তি পেয়েছে তানিম রহমান অংশুর 'স্বপ্নের ঘর'। এই চলচ্চিত্রে জুটি হিসেবে দেখা গেছে আনিসুর রহমান মিলন ও জাকিয়া বারী মমকে। অবশ্য ছবিটি দর্শকের মাঝে মোটেও সাড়া ফেলতে পারেনি। সিনেমাটিতে দর্শকও তেমন ছিল না। বসুন্ধরা সিনেপেস্নক্সে মোটে ৩ সারির সিটে দর্শক ছিল। তাও পূর্ণ নয়। এর কারণ ছবিটিতে প্রকৃত 'হরর' ধর্ম ধরে রাখতে পারেনি। সিনেমাটিতে রহস্য জমাট বাঁধানোর মতো সাজানো সংলাপও যথেষ্ট ছিল না। রহস্য উন্মোচনের প্রক্রিয়াটিও ছিল একেবারেই কাঁচা। অথচ এখানেই 'হরর' সিনেমার মূল খেলা।

এতে বোঝা যায় 'হরর' সিনেমা নির্মাণে আমাদের নির্মাতাদের আরও অনেক বেশি দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তারপরেও এ সিনেমা নির্মাণের যে একটা চেষ্টা চলছে এটা আগামীতে ঢাকাই সিনেমায় নতুন একটি ট্রেন্ড হিসেবে যুক্ত হতে পারবে।

ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রিতে এ পর্যন্ত যতগুলো হরর জাতীয় সিনেমা হয়েছে তার মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছে- 'রাজবাড়ি' (১৯৮৪), 'রক্তপিপাসু', 'ডাইনী বুড়ি', 'সেদিন বৃষ্টি ছিল', 'আমরা করবো জয়', 'অমি ও আইসক্রিমওয়ালা', 'দ্য স্টোরি অব সামারা', 'মায়াবিনী' এবং 'দেবী' ও 'স্বপ্নের ঘর'। এই সিনেমাগুলোর মধ্যে 'দেবী'ই অনেকটা হরর ধাঁচের ছিল। সিনেমাটি বেশ ভালো ব্যবসাও করেছে।

ঢাকাই সিনেমায় এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধারা উন্নতি করেছে। প্রথমে শুরু হয় ফোক সিনেমা দিয়ে। এরপর পোশাকি, ফ্যান্টাসি, কারাতে-কুংফু নানা ধারার সিনেমা ঢাকাই সিনেমায় যুক্ত হয়েছে। একটি ধারা কিছুদিন স্থায়ী থেকে আবার সেটা চলে গিয়ে নতুন একটি ধারা যুক্ত হয়েছে। সর্বশেষ কুংফু-কারাতে ধারা কিছুদিন স্থায়ী ছিল। এরপর আসে থ্রিলার ধারার সিনেমা। এটাই এখন ঢাকাই সিনেমার প্রাণ হয়ে উঠছে। আর মাঝে এইচ আর হাবিব নিয়ে আসছেন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীভিত্তিক (সায়েন্স ফিকশন) ধারার সিনেমা 'জলকিরণ'। এখন এর মাঝে সাইকো, হরর, সায়েন্স ফিকশন ধারার সিনেমা কতটা সম্ভাবনা জাগাতে পারে সেটা আমাদের নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের উপরই নির্ভর করছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়