logo
বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ০৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

পাঠক-মত

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের কথা বলতে গেলে ভারতকে বাংলাদেশের 'পরমমিত্র' বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। এই পরমমিত্রতার সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যখন পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীরা বাংলাদেশে মেতে উঠেছিল বাংলাদেশিদের নিয়ে রক্তের হোলি খেলায়, তখন ভারতের বাড়িয়ে দেওয়া বন্ধুত্বের হাত বাংলাদেশকে সাগরজল থেকে তুলে এনেছিল। ভারতের সার্বিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ পেয়েছিল চূড়ান্ত স্বাধীনতা। সেই থেকে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কগত পথচলা শুরু। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এক কোটি বাংলাদেশি শরণার্থীদের আশ্রয়, ভরণ-পোষণ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধাস্ত্র প্রদান, সৈন্য সহায়তা, বিশ্বে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে তৎকালীন ভারত সরকার ও জনগণের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরে এসেও অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে ভারত বাংলাদেশের প্রধান বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে সবাই জানে। যদিও গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গিয়েছে, যার মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হলো- বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, স্বৈরাচারী সরকারের উত্থান ও পতন, সেনাশাসন এবং অবশেষে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সুদৃঢ় নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের বাংলাদেশের ক্ষমতায় স্থায়ী হওয়া। বাংলাদেশের ক্ষমতায় কোনো সরকার অধিষ্ঠিত হচ্ছে তার সঙ্গে ভারতের স্বার্থ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে; কারণ বন্ধুত্বের ইতিহাসের পাতায় এমনও কালো লাইন লক্ষ্য করা গিয়েছে যেখানে ভারতবিরোধী বাংলাদেশি সরকার ভারতের স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্যিক পার্টনার ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আরোহণের পরে তত দিন পর্যন্ত মধুর ছিল যত দিন না বাণিজ্য সম্রাট ও বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যবাদী চীন বাংলাদেশে তার বাণিজ্যিক ও সামরিক প্রভাব ব্রদ্ধিতে নজর দিল। বিশ বছর আগে থেকে বাংলাদেশ চীন থেকে সমরাস্ত্র আমদানি বৃদ্ধি করলেও বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বর্তমানের তুলনায় এতটাও বেশি ছিল না। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিং পিংয়ের বাংলাদেশ সফর 'বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক'-এর মোড়ই ঘুরিয়ে দেয় যা ভারত কোনোভাবেই ভালোভাবে নেয়নি। সে বছর চীন বাংলাদেশে ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পপনার কথা ব্যক্ত করে। তাই গত ৫ বছরে বাংলাদেশে হু হু করে বেড়েছে চীনা বিনিয়োগ ও সমরাস্ত্র রপ্তানি। বিশেষ করে চীন থেকে দুটি মিং ক্লাস সাবমেরিন ক্রয় ভারতকে খুবই বিচলিত করে এই ব্যাপারে যে তাদের ঐতিহাসিক মিত্র চীনা বস্নকে চলে যাচ্ছে না তো! এ ছাড়া বাংলাদেশ চীন থেকে প্রতিনিয়ত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ অনেক ভারী সমরাস্ত্র ক্রয় অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি চীনের দৈত্যকায় বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাবের পেছনে ভারতের ব্যর্থতাই যে দায়ী তা ভারতীয় সরকার উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলে মনে হচ্ছে না। ভারতের অর্থনীতি এখনো চীনের চেয়ে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে যেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশই ভারতের মাথাপিছু আয়কে ছাড়িয়ে গিয়েছে। আর তাই ভারতীয় ব্যবসায়ীরা চীনা ব্যবসায়ীদের মতো সমান তালে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আবার বাংলাদেশ স্বল্পমূল্যে চীনাপণ্য মানসম্পন্ন চীনাপণ্যের দিকে ঝোঁকের ফলে বেশি দামি ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের বাজারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। এটিকে আমরা ভারত-বাংলাদেশের বাণিজ্যসম্পর্কগত ঘাটতি বলতে পারি। অন্যদিকে ভারত একটি রপ্তানিমুখী সামরিক শিল্প নির্মাণে ব্যর্থ হয়েছে যেখানে এ শিল্পে ভারতের সামনে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছিল। ভারত তার প্রতিবেশী তুলনামূলক ছোট দেশের কাছে তাদের অস্ত্র রপ্তানি করতে পারত। কিন্তু যেখানে ভারতের নিজেরই অস্ত্র আমদানি করতে হয় সেখানে এ সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। আর ভূরাজনীতির এই যুগে সমরাস্ত্র আমদানির মতো সূক্ষ্ণ ব্যাপারে বাংলাদেশকে তাই চীনের দিকেই অগ্রসর হতে হচ্ছে যেখান থেকে তারা স্বল্পমূল্যে মোটামুটি মানসম্পন্ন অস্ত্র আমদানি করতে পারছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সরকার যখন তাদের নৌবাহিনীর উন্নয়ন পরিকল্পনা ঢেলে সাজালেন, তখন তাদের সামনে স্বল্পমূল্যে চাইনিজ ফ্রিগেট ও সাবমেরিন ক্রয় ছাড়া অন্যকিছু মাথায় আসছিল না। এক্ষেত্রে ভারতের চীন, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানির মতো রপ্তানিমুখী যুদ্ধজাহাজ শিল্প থাকত, তাহলে তারা বাংলাদেশের মতো ক্রমবর্ধমান সামরিক বাজারে অস্ত্র রপ্তানি করে প্রচুর মুনাফা আয় করতে পারত। কিন্তু ২০১৯ সালে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর বাংলাদেশীয় উপকূলে ২০টি নজরদারি রাডার স্থাপনের সমঝোতা স্মারকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর ভারতের একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য যা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের নজরদারি ক্ষমতা আরও বদ্ধি করবে, যখন ভারতীয় সামরিকবাহিনী ইতিমধ্যে মরিশাস, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপে তাদের রাডার স্টেশন স্থাপন করেছে এবং মিয়ানমারের স্থাপনের পরিকল্পনা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে সমরবিদ ও কূটনীতিকরা বলছেন একটু ভিন্ন কথা। তারা বলছেন যে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকায় ভারতের রাডারের মতো একটি কৌশলগত সমরাস্ত্র যা একটি বিরাট অঞ্চলজুড়ে নজরদারিসহ চলাচলকারী শত্রম্নর অনেক 'গেম চেঞ্জার' অস্ত্রের গোপন তথ্য পাওয়া সম্ভব এমন স্টেশন স্থাপন মূলত বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে কঠোর নজরদারির মধ্যে নিয়ে আসার সামিল। ভারত ও বাংলাদেশ সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে মৌলিক সমস্যা হলো- বাংলাদেশের জনসাধারণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভারতবিরোধী মনোভাবের উত্থান; যার প্রধান কারণ হলো সীমান্ত হত্যা ও তিস্তা বাঁধসংক্রান্ত বিরোধ। তিস্তা বাঁধের ক্ষেত্রে ভারতের কিছু প্রদেশের স্বার্থ সরাসরি জড়িত থাকায় এই সমস্যার সমাধান অনেকটাই অনিশ্চিতের পথে। কিন্তু সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রচন্ড ভারতবিরোধিতা সৃষ্টি করেছে। আর এক্ষেত্রে বেশির ভাগ বাংলাদেশি জনগণের মতামত অনেকটা এরকম যে আমাদের দেশের নাগরিকরা যদি সীমান্তে কোনো অপরাধ করেই থাকে তাহলে বিএসএস তাদের আটক না করে গুলি করে হত্যা করে কেন? চরম আলোচিত ফেলানি হত্যা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থানকালে স্কুলছাত্র হত্যা এ দেশের জনমনে যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে তা ভারতের জন্য ভবিষ্যতে মোটেই সুখকর হবে না। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে জোরদার করতে এদিকটি ভারতের বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদি সরকারের আরোপিত নতুন নাগরিকত্ব আইনকে বাংলাদেশ সরকার কোনোভাবেই ভালোভাবে নেয়নি যা কয়েকজন উচ্চপদের কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের ভারত সফর বাতিলের মাধ্যমেই বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিয়েছে। ভারত বারবার এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার এবং বাংলাদেশকে তা নিয়ে চিন্তা করতে না বললেও বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে পর্যুদস্ত বাংলাদেশের ওপর ভারতীয় শরণার্থীদের একটি সম্ভাব্য চাপ পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল দেশের জন্য 'মরার উপর খাঁড়ার ঘা'-এর মতো। তাই সীমান্ত হত্যা বন্ধে এবং বাংলাদেশে ভারতীয় শরণার্থী না আসার নিশ্চয়তা প্রদানের ক্ষেত্রে ভারতের অতিদ্রম্নত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যেটা একটি স্থিতিশীল দক্ষিণ এশিয়া বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশাবাদী। আমরা কেউই সংঘাত ও উত্তেজনাপূর্ণ দক্ষিণ এশিয়া চাই না, যেমন- উত্তেজনা চীন-ভারত সীমান্ত ও ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে ছড়াচ্ছে। আর এই শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশেরই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকা শর্তে ভারতের দায়িত্বই বেশি। কেননা, ভারত অধিকারটাও অন্যান্য সবার চেয়ে বেশি চায়। বিগত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের যতটা সম্পর্ক উন্নয়ন হয়েছে, তা অব্যাহত থাকুক এবং যেসব কারণে বিভিন্ন সময় সম্পর্ক ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তার কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ে এখনই ভাবতে হবে। নচেত ভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনা যে কোনো দানা বাঁধতে পারে। যদিও বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের ভাষ্য, বাংলাদেশ ভারতকে ছাড় দিয়ে চলে। এখন দেখার বিষয়, ভারত বাংলাদেশকে ছাড় দিয়ে কতটা আগলে রাখে। বাণিজ্যিকসম্পর্ক ঘাটতিসহ যাবতীয় কুসম্পর্ক বিনষ্টপূর্বক বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক 'পরমমিত্র' মতোই বহাল থাকুক।

মোহাম্মদ অংকন : তরুণ লেখক, ঢাকা

মো. মাহমুদ হাসান : শিক্ষার্থী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে