logo
বুধবার ১৭ জুলাই, ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬

  ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ   ২২ জুন ২০১৯, ০০:০০  

মাদকবিরোধী অভিযান

শুধু বন্দুকযুদ্ধ ও কঠোর আইন দিয়ে মাদক প্রতিরোধ সম্ভব নয়। তদুপরি মাদক কারবারের সঙ্গে কোনো কোনো এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততারও প্রমাণ মিলছে। একটি বিদেশি মিডিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সাবেক কারা মহাপরিদর্শক জানান, কারা অধিদপ্তরের কিছু কর্মচারীও মাদকের সঙ্গে জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে। মাদক কারবারের সঙ্গে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টিও প্রমাণিত। কাজেই বন্দুকযুদ্ধে সাময়িক স্বস্তি মিললেও মাদক সমস্যার টেকসই সমাধান মিলবে বলে প্রতীয়মান হয় না।

মাদকাসক্তি এক নীরব ঘাতক ব্যাধি। যে দ্রব্য গ্রহণে আসক্তি জন্মে তার নাম মাদকদ্রব্য। মাদকদ্রব্য গ্রহণ একটি বদঅভ্যাস, একটি আচরণগত সমস্যা, মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে মাদকাসক্তের স্বাস্থ্যহানি হয় জীবনীশক্তি কমতে থাকে, শরীরের ইন্দ্রিয়গুলো নিস্তেজ হয়ে যায়, আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়, মানসিক ভারসাম্য লোপ পায়, কর্মদক্ষতা ও ক্ষমতা হ্রাস পায়, হতাশা এবং অবসাদ তাকে ঠেলে দেয় এক অন্ধকার জীবনে। সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলে। কোনো ব্যক্তি মাদকাসক্ত হলে তার মধ্যে নানান রকম পরিবর্তন দেখা দেয়। এসব পরিবর্তনকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-দৈহিক পরিবর্তন, আচরণগত পরিবর্তন, মানসিক পরিবর্তন, বোধশক্তিতে পরিবর্তন, কাজে-কর্মে পরিবর্তন ইত্যাদি। মাদকসক্তি অপরাধ নয়, রোগ। মাদকাসক্ত ব্যক্তি তাই কোনো অপরাধী নয়, একজন রোগী। মাদকাসক্তি একটি মারাত্মক বয়সের অসুস্থতা। এইডস, ক্যান্সার ও হৃদরোগের মতো এটি একটি ভয়াবহ রোগ। এ রোগটি নিরাময়ের অযোগ্য হলেও মাদকাসক্ত ব্যক্তি যদি সুস্থতার জন্য আগ্রহী হন চিকিৎসা ও চিকিৎসা পরবর্তী পরিচর্যার মাধ্যমে অসুস্থ মনোভাব ও জীবনধারা পরিবর্তন করেন, জীবনকে সুশৃঙ্খল পুনর্ভাবে পরিচালনা করার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন তাহলে তিনিও মাদকমুক্ত থেকে সুন্দরতম জীবন উপভোগ করতে পারেন।

মাদকাসক্তির অভিশাপে নিমজ্জিত এখন গোটা পৃথিবী। মাদকদ্রব্যের ভয়াবহতা আজ কোনো দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সমগ্র বিশ্ব এ সমস্যার সম্মুখীন। পৃথিবীর অন্যতম উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই সমস্যায় জর্জরিত। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ মাদক পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। জাতি আজ বেশি উদ্বিগ্ন কারণ বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে ধারণা করা হয় যে, বাংলাদেশে মাদকাসক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের প্রায় দ্বিগুণ। এ দেশের মাদকাসক্তদের অধিকাংশই তরুণ এবং শতকরা ৮৫ ভাগ মাদকাসক্তের বয়স ১৫ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। আমাদের দেশে বহুবিধ মাদকদ্রব্যের মধ্যে এখন 'ইয়াবা' হলো সবার প্রিয়। এই মাদকদ্রব্য বর্তমানে বাজারের আলু-পটলের মতো সবখানেই পাওয়া যায়। কারণ, এটি সহজলভ্য, ঝটপট নেশা, সেবনে মনে জাগায় আনন্দ। তাই যুব সমাজের কাছে বর্তমানে নেশার জগতে ইয়াবাই সেরা। দেশে ইয়াবা সেবনকারী দিন-দিন বেড়েই চলছে। সেই সঙ্গে জায়গায় জায়গায় খুন, ছিনতাইসহ বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। পারিবারিক দিক দিয়েও বেড়ে যাচ্ছে অশান্তি। জানা যায়, দুই-তিনদিন একনাগাড়ে 'ইয়াবা' সেবনের ফলে 'ইয়াবায় আসক্তি হয়ে পড়ে। তখন তাকে আর এই বদ নেশা থেকে ফেরানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই নেশার সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের খেয়াল রাখা উচিত। যাতে আমাদের সন্তানরা নেশার জগতে পা বাড়াতে না পারে। সন্তানের প্রতি একটু মনোযোগী হলেই নেশা থেকে তাকে দূরে রাখা সম্ভব।

মাদকাসক্তি কারণ বহুবিধ। উঠতি বয়সীর তরুণরা নেশা করে কৌতূহলবশত, বন্ধুদের প্ররোচনায় অনেকে মাদকাসক্ত হয়ে ওঠে, বাবা-মায়ের অসুখী দাম্পত্য জীবনের কারণে অনেক হতাশাগ্রস্ত তরুণ নেশা করে থাকে, পাড়া-মহলস্নার ক্লাবের আড্ডা থেকেও মাদকাসক্তির বিস্তৃতি ঘটে, কর্ম বিমুখতা ও ভ্রান্ত জীবনদর্শন, অপসংস্কৃতি ও অসৎ সঙ্গের প্রভাব, মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা, ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক দৃঢ়তার অভাব, মাদকাসক্তির কুফল সম্পর্কে অজ্ঞতা, হতাশা (প্রধানত বেকারত্বজনিত), অত্যাধুনিক সাজগোজের প্রবণতা ও স্মার্ট হওয়া সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লাভের অদম্য আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি মাদকাসক্তির কারণ।

মাদকের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। জিরো টলারেন্স বলতে কী বোঝায়? প্রশাসনিক, আইনগত, বিচারিক ও সামাজিকভাবে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধকে জিরো টলারেন্স বলে। দৃশ্যমান প্রশাসনিক জিরো টলারেন্স কৌশল হিসেবে বন্দুকযুদ্ধকে বেছে নিয়েছে সরকার। সঙ্গে চলছে গ্রেপ্তারও। গত বছরের ২৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদে মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন পাস হয়েছে। ইয়াবা, কোকেন, হেরোইন পরিবহন, কেনাবেচা, কারবার, সংরক্ষণ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তান্তর, সরবরাহ ইত্যাদি অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃতু্যদন্ড বা যাবজ্জীবনের বিধান রয়েছে। মাদক বহনের পরিমাণ অনুযায়ী সাজা কমবেশির বিধান রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই আইনের অধীন অপরাধ সংঘটনে অর্থ বিনিয়োগ, সরবরাহ, মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতা দিলেও একই ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এই প্রথম মাদকসেবী ও মাদক কারবারির পাশাপাশি মাদক কারবারে পৃষ্ঠপোষক বা অর্থলগ্নিকারী, মদদদাতাদেরও কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হয়েছে নতুন আইনে। তবে বিচারের চিত্রটি আশাপ্রদ নয়। অন্যদিকে জিরো টলারেন্সের আওতায় মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন এখনো তেমন দৃশ্যমান নয়।

শুধু বন্দুকযুদ্ধ ও কঠোর আইন দিয়ে মাদক প্রতিরোধ সম্ভব নয়। তদুপরি মাদক কারবারের সঙ্গে কোনো কোনো এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততারও প্রমাণ মিলছে। একটি বিদেশি মিডিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সাবেক কারা মহাপরিদর্শক জানান, কারা অধিদপ্তরের কিছু কর্মচারীও মাদকের সঙ্গে জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে। মাদক কারবারের সঙ্গে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টিও প্রমাণিত। কাজেই বন্দুকযুদ্ধে সাময়িক স্বস্তি মিললেও মাদক সমস্যার টেকসই সমাধান মিলবে বলে প্রতীয়মান হয় না।

মাদকের ভয়াবহ অভিশাপ থেকে পরিত্রাণ পেতে কয়েক দফা প্রস্তাব যেমন-মাদকদ্রব্যের জোগান তথা অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সীমান্তের স্পর্শকাতর এলাকায় স্থাপিত স্মার্ট ডিজিটাল বর্ডার সার্ভেইল্যান্স অ্যান্ড টেকটিক্যাল রেসপন্স সিস্টেমের সহায়তা নেয়া আবশ্যক। সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম স্থাপনের ফলে সীমান্তে যে কোনো ধরনের মুভমেন্ট সম্পর্কিত ছবি ও ভিডিও সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মনিটরে দেখা যায়। মাদকবিরোধী কঠোর আইনে বিচার বিলম্বিত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কর্মরত অতিরিক্ত জেলা জজ কিংবা দায়রা জজদের নিয়ে মাদকদ্রব্য অপরাধ ট্রাইবু্যনাল গঠনের কথা বলা হয়েছে। ৩১ মার্চ ২০১৮ তারিখে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী অধস্তন আদালতে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৮ লাখ ৯২ হাজার ১৩৭। মামলার ভারে জর্জরিত বিচারকরা মাদক মামলার দ্রম্নত নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হবেন না, এটিই বাস্তবতা। দ্রম্নত বিচার নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আদালতে সুষ্ঠু পরিকল্পনাভিত্তিক বিচারব্যবস্থার বিন্যাস আবশ্যক।

মাদকাসক্তি প্রতিকার ব্যবস্থাকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে উদ্বুদ্ধকরণ, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, আত্মকর্মসংস্থান ও মাদকবিরোধী বিভিন্নর্ যালি/ সমাবেশের আয়োজন করতে হবে এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ ছাড়া মাদক সমস্যার সমাধানকল্পে কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারের জন্য বর্তমান সরকারকে কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এই প্রসঙ্গে কারিগরি প্রশিক্ষণের ওপরও জোর দিতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রচার ও প্রসারের জন্য মসজিদভিত্তিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইমামরা ও ধর্মীয় শিক্ষকরা পারিবারিক সম্পর্ক সুদৃঢ়করণ বিষয়ও বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। এই লক্ষ্যে সাধারণ জনগণের জীবনের প্রতি আস্থা বাড়ানোর প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদানের জন্য বিভিন্ন পরামর্শ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করতে হবে।

মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই জাতিকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়া যায় না। তরুণ প্রজন্মকে মাদকদ্রব্যের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করা এই মূহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। আর এই জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমগুলোর অত্যন্ত স্পষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। এ ছাড়া মাদকদ্রব্য চোরাচালানীদের বিরুদ্ধেও গণসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ সমাজে সুস্থ সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবন কামনা করে। সুস্থ জীবন সুনাগরিক হওয়ার অন্যতম অবলম্বন। সুনাগরিক হতে হলে রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিককে সুস্থ জীবনের অধিকারী হতে হবে। শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক দিয়ে সুস্থ হলেই একজন নাগরিক রাষ্ট্রের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে পারে। কাজেই সুস্থ জীবন সুনাগরিক হওয়ার চাবিকাঠিস্বরূপ। মানব ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে মাদকের উৎপত্তি হলেও বর্তমানে এর অনিয়ন্ত্রিত এবং ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে সমাজব্যবস্থায় এক মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি হয়েছে। মাদকের করাল গ্রাসে মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংস হচ্ছে। বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। এ সমস্যা প্রতিরোধে প্রয়োজন সামাজিক গণসচেতনতা। সমাজের সব গুণী লোককে মাদকবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে বিশেষত সব তরুণ ছাত্রছাত্রী ও যুবকর্মীদের মাধ্যমে একে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিয়ে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সবাইকে কার্যকর ভূমিকার প্রতি যত্নশীল হতে হবে।

আজকের ও আগামী দিনের সুস্থ, সুন্দর, সুখকর জীবনের জন্যই মাকদ্রব্যের ব্যবহার রোধ করতে হবে। সমগ্র বিশ্ববাসীকে মাদকবিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার করার মধ্যদিয়ে মাদকের মরণ ছোবল থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। দেশ ও বিশ্ববিবেক সে প্রত্যাশাতেই প্রহর গুনছে। কবি সুকান্তের মতো আমাদের সকলের দৃঢ় প্রত্যয় হোক-

'চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ'

প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল,

এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি

নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার'

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ: লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে