logo
বৃহস্পতিবার ২২ আগস্ট, ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬

  সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান চৌধুরীপাড়া, মালিবাগ, ঢাকা   ১১ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০  

বেদনা ও আতঙ্ক ভুলে ঈদ হোক আনন্দময়

পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদ হচ্ছে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। আগামী ১২ আগস্ট সারা দেশের মানুষ কোরবানির ঈদ আনন্দে মেতে উঠবে। ঈদ যেন সবার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ছে কিন্তু জনমনে ঈদ নিয়ে আগের মতো তেমন একটা উচ্ছ্বাস নেই। বন্যা ও ডেঙ্গুর কবলে দেশের সাধারণ মানুষের বিশাল একটি অংশ ভুক্তভোগী ও আতঙ্কিত। দেশের যেসব অঞ্চল বন্যায় পস্নাবিত হয়েছে, সেখানকার সাধারণ মানুষ এখনো চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে। কোরবানির ঈদ নিয়ে তাদের তেমন একটা মাথাব্যথা নেই। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার লড়াইয়ে-ই তারা ব্যস্ত। সত্যি কথা বলতে, সারা দেশেই কোরবানির ঈদ নিয়ে তেমন একটা উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে না। বিগত বছরগুলোতে ঈদের প্রায় ১৫-২০ দিন আগেই সারা দেশে ব্যাপকভাবে চলে কোরবানির পশুর হাটের জমজমাট প্রচার-প্রচারণা। মফস্বলে কোরবানির পশুর হাট সপ্তাহে দশ দিন আগেই জমে ওঠে। মিডিয়াগুলো ব্যস্ত থাকে কোরবানির পশুর হাটের সংবাদ সংগ্রহ করতে। এবারের দৃশ্যপট বিগত বছরগুলো থেকে একটু ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে বন্যা ও ডেঙ্গু। বন্যায় দেশের বিশাল একটি অংশ পস্নাবিত হওয়ার পর বর্তমানে ডেঙ্গু সারা দেশে মহামারী আকারে বিস্তার লাভ করছে। বন্যায় বিপর্যস্ততার ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ডেঙ্গুর বিস্তার যেন সরকার ও সাধারণ মানুষের জন্য 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'। বর্তমানে ডেঙ্গুর বিস্তারে দেশের মানুষ সাংঘাতিক রকম আতঙ্কিত হয়ে আছে। সারা দেশে প্রতিদিন আশঙ্কাজনক হারে মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। তেমনি উদ্বেগজনকভাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত অসুস্থ রোগীরা মৃতু্যর দিকে ধাবিত হচ্ছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৮৫ জনের মৃতু্য হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকায় যেন এক মৃতু্যর মিছিল চলছে। সরকার পর্যন্ত ডেঙ্গু মোকাবিলায় রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা দেয়া এখন বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অধিকাংশ হাসপাতালে সিরিয়াল নিয়েও রোগী ভর্তি করানো কঠিন হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর মানুষের মধ্যেও ঈদ নিয়ে কিছুটা স্থবিরতা বিরাজ করছে।

সংবাদপত্রে পাওয়া তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যে সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় ১৭ হাজার ৭৯৪ জন। আর চলতি আগস্ট মাসের প্রথম চার দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৬ হাজার ৯১৮ জন। এতেই বোঝা যায়, অল্প কয়েক দিনে কি হারে ডেঙ্গু বিস্তার লাভ করেছে এবং এটা কতটা ভয়াবহ অবনতির দিকে যেতে পারে। প্রথম দিকে বড় শহর, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। কিন্তু বর্তমানে এটা সারা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ঈদের পর সারা দেশে ডেঙ্গু রোগের বিস্তার তীব্র আকার ধারণ করবে। বিশেষ করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের অনেকেই সুস্থ হয়ে ঈদ উদযাপনে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাবে। তখন তাদের মাধ্যমেই ডেঙ্গুর বিস্তার ভয়াবহভাবে ব্যাপকতা লাভ করবে। এর কারণ হচ্ছে, সদ্য সুস্থ ডেঙ্গু রোগীর শরীরের রক্তে তখনও ডেঙ্গুর ভাইরাস বিদ্যমান থাকে। তার শরীরে কোনো সাধারণ মশা কামড়ে দিলে, ওই মশা তখন ডেঙ্গুর ভাইরাস বহন করবে। ওই মশা যদি সুস্থ কারও শরীরে কামড়ে দেয়, তখন সেই ব্যক্তি ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মূলত সারা দেশে এভাবেই ডেঙ্গুর বিস্তার হচ্ছে। তাই ইতোমধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত কেউ যেন অবস্থান পরিবর্তন না করে, এই বিষয়ে জোরালোভাবে গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা করা হচ্ছে। তবে সচেতনতার অভাবে অনেকেই এই বিষয়টা আমলে নেবে না আর এতেই ঘটবে বিপত্তি। এই বিষয়টি উপলব্ধি করে ইতোমধ্যেই স্বাস্থ্য বিভাগের সবার ছুটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনুপাতে চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল। যদি এর বিস্তার আরও বেশি ব্যাপকতা লাভ করে, তখন ডেঙ্গু আক্রান্ত অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

সাম্প্রতিককালে মাথা কাটা গুজবের গজব সামাল দেয়ার আগেই গণপিটুনিতে ১২ জনের মর্মান্তিক মৃতু্য হয়। এর শোক এখনো আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এখন দেখার পালা, ডেঙ্গুর গজব সামাল দেয়ার আগে কত জনের অকালে প্রাণহানি ঘটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিষেধকের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয় কিন্তু সময়মতো সঠিক সময়ে যথাযথভাবে মশক নিধন অভিযান পরিচালনা হয়নি। তাই আজ সারা দেশে ডেঙ্গু মহামারী আকার ধারণ করেছে। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আজকের এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। বলতে গেলে এই কাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ও প্রতিষ্ঠান অনেকাংশেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। তবে দেশের কিছু নেতারা জনসচেতনতা সৃষ্টির পরিবর্তে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন। আবার কেউ কেউ জনসচেতনতা বৃদ্ধির নামে হাস্যকর কর্মকান্ড করছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে এমন কোনো কিছু মোটেও কাম্য নয়। সবাইকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কথায় আছে, 'যার হারায়, সেই বোঝে হারানোর কষ্ট'। বন্যায় বিপর্যস্ত মানুষের ব্যাপকভাবে জানমালের ক্ষতি হয়েছে। সেই সঙ্গে মাথা কাটা গুজবে গণপিটুনিতে আকালে বেশ কিছু প্রাণহানি ঘটেছে। আর এখন ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপে বলতে গেলে গণমৃতু্য শুরু হয়েছে। শোকের মাসে দেশজুড়ে যেন করুণ শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঠিক এমনই এক ক্রান্তিকালে আমরা কোরবানি ঈদের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে স্বজন হারানোর বেদনা ও ডেঙ্গুর আতঙ্কে ঈদের আনন্দ অনেকাংশেই ভাটা পড়বে। যার প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়েছে।

সব কিছু সত্ত্বেও যথাযথভাবেই কোরবানি ঈদের প্রস্তুতি নিতে হবে। শহরের মানুষ যেন নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের প্রায় ৫০০ কিলোমিটার রেলপথ ঝুঁকিপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা বেশ কিছু মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনা দেখেছি। সড়ক পথের অবস্থাও খুব বেশি ভালো নয়। নৌ-পথেও রয়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। এ ছাড়া ছিনতাইকারী ও মলম পার্টিদের দৌরাত্ম্য তো আছেই। এসব কিছু মাথায় রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এমনিতেই দেশের মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। আর যেন কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সংঘটিত না হয়। ডেঙ্গু নিয়ে জনমনের আতঙ্ক দূর করে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করতে হবে। অনেকেই শহর ছেড়ে দেশের বাড়িতে গিয়ে কোরবানি ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যারা ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত কিংবা আক্রান্ত ছিলেন, জনস্বার্থে তাদের দেশের বাড়িতে না যাওয়া উত্তম হবে। দেশের বাড়িতে গিয়ে ঈদ উদযাপনের আনন্দ তাদের কোরবানি দিতে হবে। এতে ডেঙ্গু বিস্তারের ভয়াবহতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সর্বোপরি, ঈদ মানেই আনন্দ। সব দুঃখ-বেদনা, আতঙ্ক-ভীতি ও সামাজিক বৈষম্য ভুলে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে হবে। দেশের জনগণ যেন নিরাপদে কোরবানির ঈদ উদযাপন করতে পারে, সেই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সজাগ দৃষ্টিপাত রাখতে হবে। ঈদের ছুটি চলাকালে ঈদ আনন্দ বিসর্জন দিয়ে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার স্বার্থে স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ মানবিকতা প্রদর্শন একান্তই কাম্য
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে