logo
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০, ৩০ আষাঢ় ১৪২৬

  যাযাদি ডেস্ক   ৩০ মে ২০২০, ০০:০০  

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যার নেপথ্যে 'প্রতিশোধ'

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যার নেপথ্যে 'প্রতিশোধ'
এক লিবিয়ান আততায়ী -ফাইল ছবি
লিবিয়ায় নিহত ২৬ বাংলাদেশি মানবপাচারকারী চক্রের কাছ থেকে অপহৃত হওয়ার পর অপহরণকারীদের হাতে খুন হয়েছেন বলে জানিয়েছে লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস।

যদিও লিবিয়ার জাতিসংঘ সমর্থিত সরকার জানিয়েছে, লিবিয়ার একজন মানবপাচারকারীকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে ২৬ জন বাংলাদেশিসহ ৩০ জন অভিবাসন প্রত্যাশীকে হত্যা করেছে ওই পাচারকারীর পরিবারের সদস্যরা। বাংলাদেশি বাদে মারা যাওয়া অন্য ৪ জন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত।

হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া একজন আহত বাংলাদেশি নাগরিকের বয়ানের ভিত্তিতে লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম বিষয়ক কাউন্সিলর আশরাফুল ইসলাম জানান, মারা যাওয়া ২৬ জনসহ মোট ৩৮ জন বাংলাদেশি ও কিছু সুদানি নাগরিক প্রায় ১৫ দিন ধরে ওই অপহরণকারী চক্রের হাতে আটক ছিলেন।

লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর মিজদায় আটক করে রাখা হয়েছিল তাদের।

আশরাফুল ইসলাম জানান, সেখানেই ২৮ শে মে সকালে বন্দিদের ওপর গুলি চালায় অপহরণকারীরা।

কীভাবে অপহরণকারীদের কবলে পড়লেন তারা? :মূলত ইতালিতে অভিবাসনের উদ্দেশ্যে ওই ৩৮ জন বাংলাদেশি লিবিয়ায় গিয়েছিলেন বলে জানান আশরাফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, 'করোনাভাইরাস সংক্রান্ত জটিলতা শুরু হওয়ার আগে তারা ভারত ও দুবাই হয়ে বেনগাজি বিমানবন্দরে পৌঁছান। এরপর গত প্রায় দুই মাস তাদেরকে লিবিয়ার ভেতরে গোপনে রাখা হয়েছিল। উপকূলীয় অঞ্চল যুওয়ারা হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অভিবাসীদের নিয়ে ইতালির দিকে যাত্রা করার পরিকল্পনা ছিল পাচারকারীদের।'

আশরাফুল ইসলাম বলেন, বছরের এই সময়টায় সাগর অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকায় এটিকেই সাগর পাড়ি দেয়ার আদর্শ সময় বলে মনে করা হয়। কিন্তু প্রচলিত ও ব্যবহৃত পথে না গিয়ে মরুভূমির মধ্যে দিয়ে বেশ বিপদসংকুল একটি পথে তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

তিনি বলেন, যুদ্ধকবলিত লিবিয়ায় একাধিক সরকার থাকায় ত্রিপোলি হয়ে যুওয়ারা যাওয়ার প্রচলিত পথে নানা রকম তলস্নাশি হয়। সেই পথ এড়িয়ে কম ব্যবহৃত মরুভূমির মধ্যকার রাস্তা দিয়ে অভিবাসীদের নিয়ে যুওয়ারা যাচ্ছিলেন পাচারকারীরা।

তিনি আরও বলেন, কিন্তু ওই মরুভূমির পথ সশস্ত্রসন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণাধীন, যারা সরকারহীনতার সুযোগ নিয়ে অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে অনেকদিন ধরে। সন্ত্রাসী ও অপহরণকারীদের একাধিক গ্রম্নপের মধ্যে দ্বন্দ্বের ঘটনাও ঘটে থাকে।

বেনগাজি থেকে মরুভূমির রাস্তায় যুওয়ারা যাওয়ার পথে তারা অপহরণকারীদের কবলে পড়েন।

কেন হত্যা করা হলো অভিবাসন প্রত্যাশীদের? :অপহরণের পর মিজদাতেই প্রায় ১৫ দিন অপহরণকারীদের জিম্মায় ছিলেন অভিবাসন প্রত্যাশী বাংলাদেশি ও সুদানি নাগরিকরা।

কাউন্সিলর আশরাফুল ইসলাম জানান, অপহরণকারীদের সঙ্গে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তিপণ নিয়ে দর কষাকষি চলছিল। আটককৃতদের অনেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কাঙ্ক্ষিত মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হয় তারা।

মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আটককৃতদের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে অপহরণকারীরা।

তিনি বলেন, এক পর্যায়ে বাংলাদেশিদের সঙ্গে থাকা সুদানি নাগরিকরা অপহরণকারী চক্রের এক সদস্যকে মেরে ফেলেন। এরপর অপহরণকারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালালে ৩৮ জন বাংলাদেশির সবাই গুলিবিদ্ধ হয়। মারা যায় ২৬ জন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় কয়েকজন ভেতরেই পড়ে ছিল, দুই-একজন আহত অবস্থায় বের হয়ে আসে। তাদের দেখে স্থানীয় লোকজন সেনাবাহিনীকে খবর দেয় এবং সেনাবাহিনী তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে।

আশরাফুল ইসলাম জানান, আহত বাংলাদেশিদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে লিবিয়ার একটি সংবাদ মাধ্যম আল-ওয়াসাত খবর প্রকাশ করেছে যে মোহাম্মদ আব্দুর রহমান, যিনি একজন মানব পাচারকারী হিসেবে পরিচিত, অজানা কারণে শুরু হওয়া এক বিদ্রোহে মারা যান। এরপর তার পরিবারের সদস্যরা ওই ভবনটি ঘেরাও করে এবং মরদেহ ফিরে পাওয়ার জন্য আলোচনা শুরু করে।

এক পর্যায়ে ওই ভবনে উপস্থিত ১০০ জন অভিবাসী আত্মসমর্পণ করেন, কিন্তু ৪০ জন ভবন ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। এরপর ওই ভবনে ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও রকেট দিয়ে হামলা করার পর ভবনের ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা নিহত হন।

তবে অন্য কোনো সূত্র থেকে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

লিবিয়ার পরিস্থিতি কেন অস্থিতিশীল? :২০১১ সালে পশ্চিমা সমর্থিত বিদ্রোহীদের হাতে কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন হওয়ার পর থেকে লিবিয়ায় চলছে সীমাহীন নৈরাজ্য এবং অরাজকতা। লিবিয়ায় নানা মত ও পথের অসংখ্য সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী তৎপর। দেশের পূর্বে এবং পশ্চিমে রয়েছে দুটো ভিন্ন রাজনৈতিক শাসন কেন্দ্র।

কিছু মিলিশিয়া দল পূর্বের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুগত, কিছু আবার সমর্থন করে পশ্চিমের অর্থাৎ ত্রিপোলি নিয়ন্ত্রণকারী প্রশাসনকে।

লিবিয়াতে এখন যার হাতে যত বেশি অস্ত্র, তার শক্তি এবং প্রভাবও ততবেশি। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন লিবিয়া এখন অস্ত্রের বাজারে পরিণত হয়েছে। আর অস্ত্রের সহজলভ্যতার কারণে পুরোদেশেই বিভিন্নপন্থি ছোট ছোট মিলিশিয়া গ্রম্নপ তৈরি হয়েছে।

আশরাফুল ইসলাম বলেন, এখানে অপহরণকারী চক্র খুবই শক্তিশালী। তারা এখানে সেনাবাহিনীর সঙ্গেও কখনো কখনো মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং মাঝেমধ্যে সেনাবাহিনীও পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই মিলিশিয়ারা এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। এখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সামনে অসহায়।

আশরাফুল ইসলাম বলেন, লিবিয়ায় একক সরকার ব্যবস্থা না থাকায় মিলিশিয়া বাহিনীগুলো মানবপাচার ও অপহরণের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করে। আর দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট শক্তিশালী না হওয়ায় মিলিশিয়াদের তৎপরতার বিরুদ্ধে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে না তারা।

চীনের তীব্র নিন্দা :এদিকে লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ঢাকার চীনা দূতাবাস। শুক্রবার এক বার্তায় নিন্দা জানায় দূতাবাসটি।

ঢাকার চীনা দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন হুয়ালং ইয়ান বার্তায় বলেন, লিবিয়ায় ২৬ জিম্মি বাংলাদেশি নাগরিককে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। আমরা এই বর্বর ও সন্ত্রাসী কান্ডের তীব্র নিন্দা জানাই।

তিনি বলেন, সেখানে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি আমরা সমবেদনা জানাই। একইসঙ্গে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করি।

হত্যাকারীদের বিচার দাবি ব্র্যাকের :লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িত মানবপাচারকারী চক্রকে দ্রম্নত গ্রেপ্তার ও শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে প্রয়োজনে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা নিতে হবে। কারণ লিবিয়ার এই পাচারকারী চক্র ইউরোপে পাঠানোর নামে দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসীদের জিম্মি ও নিপীড়ন করছে। এরই সর্বশেষ শিকার বাংলাদেশিরা।

শুক্রবার ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান সাংবাদিকদের দেয়া এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন।

হতাহত বাংলাদেশিদের পরিচয় :লিবিয়ায় মানবপাচারকারী চক্রের এক সদস্যের সহযোগী ও স্বজনদের বর্বরোচিত আক্রমণে হতাহত বাংলাদেশিদের পরিচয় মিলেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ওই ঘটনায় ২৬ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক খুন হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১১ জন।

হতাহতদের মধ্যে 'নিখোঁজ বা মৃত' হিসেবে ২৪ জনের এবং আহত হিসেবে ১১ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রে।

'নিখোঁজ বা মৃত' ২৪ জন হলেন- গোপালগঞ্জের সুজন ও কামরুল; মাদারীপুরের জাকির হোসেন, সৈয়দুল, জুয়েল ও ফিরুজ, রাজৈরের বিদ্যানন্দীর জুয়েল ও মানিক, টেকেরহাটের আসাদুল, আয়নাল মোলস্না (মৃত) ও মনির, ইশবপুরের সজীব ও শাহীন, দুধখালীর শামীম; ঢাকার আরফান (মৃত); টাঙ্গাইলের মহেশপুরের বিনোদপুরের নারায়ণপুরের লাল চান্দ; কিশোরগঞ্জের ভৈরবের রাজন, শাকিল, সাকিব ও সোহাগ, রসুলপুরের আকাশ ও মো. আলী, হোসেনপুরের রহিম (মৃত) এবং যশোরের রাকিবুল।

আহত ১১ জন হলেন- মাদারীপুর সদরের তীর বাগদি গ্রামের ফিরোজ বেপারী (হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ), ফরিদপুরের ভাঙ্গার দুলকান্দি গ্রামের মো. সাজিদ (পেটে গুলিবিদ্ধ), কিশোরগঞ্জের ভৈরবের শম্ভপুর গ্রামের মো. জানু মিয়া (পেটে গুলিবিদ্ধ), ভৈরবের জগন্নাথপুর গ্রামের মো. সজল মিয়া (দুই হাতে মারাত্মকভাবে জখম ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন), গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বামনডাঙ্গা বাড়ির ওমর শেখ (হাতে মারাত্মকভাবে জখম ও আঙ্গুলে কামড়ের দাগ, দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ), টাঙ্গাইলের মহেশপুরের বিনোদপুরের নারায়ণপুরের মো. তরিকুল ইসলাম (২২), চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার বেলগাছির খেজুরতলার মো. বকুল হোসাইন (৩০), মাদারীপুরের রাজৈরের কদমবাড়ির মো. আলী (২২), কিশোরগঞ্জের ভৈরবের সখিপুরের মওটুলীর সোহাগ আহমেদ (২০), মাদারীপুরের রাজৈরের ইশবপুরের মো. সম্রাট খালাসী (২৯) এবং চুয়াডাঙ্গার বাপ্পী (মস্তিষ্কে গুলিবিদ্ধ, গুরুতর অবস্থা)। এরা সবাই ত্রিপোলি মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে