logo
শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৬

  যাযাদি ডেস্ক   ১২ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

সরকারি পাটকল বন্ধে দায় কার?

সরকারি পাটকল বন্ধে দায় কার?
পাট দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করছেন এক নারী -ফাইল ছবি
দেশে রাষ্টায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ ঘোষণা করে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিককে অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এর মধ্য দিয়ে মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল যুগের অবসান ঘটল।

সরকার বলছে লোকসানের কারণেই এসব পাটকল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে গবেষকরা বলছেন লোকসানের জন্য দায়ী ছিল ব্যবস্থাপনাগত ত্রম্নটি আর দুর্নীতি; যেগুলো সরকার কখনো বন্ধের চেষ্টা করেনি।

অথচ গত বছরের পাট দিবসে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন 'এত হতাশ হওয়ার কি আছে। আর আমি লোকসান লোকসান করব কেন। এমন একটি পণ্য যার কিছুই ফেলা যায় না সেটা কেন লোকসান হবে। আমরা লোকসান শুনতে চাই না। লাভজনক কিভাবে করা যায়, কিভাবে করতে হবে সেটা দেখতে হবে। কৃষিপণ্য হিসেবে পাটজাত পণ্য প্রণোদনা পেতে পারে।'

এক বছর আগে জাতীয় পাট দিবসের অনুষ্ঠানে লোকসানে হতাশ না হওয়ার কথা বললেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই শেষ পর্যন্ত লোকসানকেই কারণ হিসেবে দেখিয়ে ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যা কার্যকর হয়েছে পহেলা জুলাই থেকে। এর ধারাবাহিকতাতেই এখন চলছে প্রায় পঁচিশ হাজার শ্রমিকের দেনা-পাওনা মেটানোর হিসাব।

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়ার পর সরকার অবশ্য বলেছে শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, কারণ তাদের প্রাপ্য সব পরিশোধ করা হবে, যার ফলে চাকরি হারানো প্রায় পঁচিশ হাজার শ্রমিক কমপক্ষে ১৪ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৫৪ লাখ টাকা পাবেন।

আর এত অর্থ ব্যয় করে পাটকলগুলো বন্ধ করার ক্ষেত্রে সরকারের একমাত্র যুক্তিই হলো এগুলোর লোকসান, এখন যার পরিমাণ প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা। সরকারি পাটগুলোর দায়িত্বে থাকা বিজেএমসি সর্বশেষ লাভের মুখ দেখেছিল ২০১১ সালে, তাও সেটি ছিল সাতাশ বছরের মধ্যে লাভের একমাত্র উদাহরণ।

স্বাধীনতার পর সব পাটকল সরকারি করে সেগুলো পরিচালনার জন্য যখন বিজেএমসি গঠন করা হয়েছিল তখন পাটই ছিল সরকারের আয়ের প্রধান উৎস।

সরকারি কৃষি তথ্য সার্ভিসের হিসাবে স্বাধীনতার পর দেড় যুগ ধরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটের অবদানই ছিল বেশি। সেই পাটখাত বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের এমন পরিণতির কারণ কী?

জবাবে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্য জাহাঙ্গীর আলম, দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর পরিস্থিতি নিয়ে যার গবেষণা আছে। তার বাবাও ছিলেন তিন দশক ধরে খুলনা অঞ্চলের একটি পাটকলের শ্রমিক।

তিনি বলেন, 'যখন পাটখাতে শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হয় বছর দেড়েক আগে তখন আমি খুলনা অঞ্চলের পাটকলগুলো নিয়ে গবেষণা করি। এ পাটকলগুলোর সংকটের কারণ হলো সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও লুটপাট। ধরেন পাট ক্রয় থেকে শুরু করে পাট পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত ভেতরে ও বাইরে লুটপাট ও দুর্নীতি। অব্যবস্থাপনা ছিল মারাত্মক পর্যায়ে। তারপরে পাটশিল্পের যন্ত্রপাতির আধুনিকায়নের অভাব ছিল। রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছিল ব্যাপকভাবে।'

সরকারি পাটকলগুলোতে বরাবরই বামধারার রাজনীতির অনুসারীরা ইউনিয়নগুলো অর্থাৎ সিবিএতে প্রভাবশালী ছিল। যদিও বামধারার নানা ভাগে বিভক্ত হওয়ার প্রভাব পড়েছে সেখানেও।

আবার সামরিক শাসনামলে শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠনগুলোকে দুর্বল করতে এসব সিবিএ তে নিজেদের লোক তৈরির চেষ্টা করেছে তখনকার প্রশাসন। ফলে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সংঘাত চরম আকার ধারণ করে।

২০০৯ থেকে পরবর্তী দশ বছর এসব পাটকল নিয়ে গবেষণা করেছেন গবেষক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

তিনি বলছেন, সরকারি পাটগুলোকে কিভাবে কার্যকর বাজার কাঠামোতে আনা যায় সেটি কখনো সরকারের দিক থেকে বিবেচনাই করা হয়নি।

কখনোই আমরা পাটকলগুলোকে বাজারভিত্তিক কাঠামোতে চলবার উদ্যোগ দেখিনি। যে ধরনের ব্যবস্থাপনা বা যেভাবে লাভের বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার ছিল সেটি দেখা যায়নি। এ ধরনের কর্পোরেশনে দীর্ঘমেয়াদি পেশাদার নেতৃত্ব দরকার ছিল। কিন্তু এখানে চেয়ারম্যান বা ডিরেক্টররা কেউ দীর্ঘসময় কাজ করেননি। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সময়ে কোনো চেয়ারম্যান ১৩ মাসের বেশি ছিলেন না। ডিরেক্টররা ছিলেন আরও কম সময়।

এ ভূখন্ডে পাটকলগুলো গড়ে উঠতে শুরু করেছিল পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে। ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল আদমজী পাটকল। পরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে গড়ে ওঠে অনেকগুলো পাটকল যার বেশিরভাগই ছিল লাভজনক।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রথমে ৬৭টি পাটকলকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়। পরে আরও পাটকল সরকারি করে বিজেএমসির আওতায় আনা হয় মোট ৮২টি পাটকল।

কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকগুলোর নেতৃত্ব ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে কার্যকর কোনো কর্মপরিকল্পনা কখনো হয়নি যা ক্রমশ পাটকলগুলোকে দুর্বলতর করেছে বলে মনে করেন ড. মোয়াজ্জেম।

তিনি বলছেন, এসব পাটকলের দুর্দশার জন্য সঠিক নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা না দিয়ে সবসময় শ্রমিকদের দায়ী করার একটি প্রবণতা ছিল সরকারের দিক থেকেও।

এ জন্য আসলে শ্রমিকরা দায়ী নয় বরং অব্যবস্থাপনার কারণে ও রাজনৈতিক প্রভাবে বিভিন্ন সময়ে অতিরিক্ত শ্রমিক নেয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে অধিকাংশ কারখানা উদ্বৃত্ত শ্রমিকের কারখানায় পরিণত হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী কারখানাগুলোকে দাঁড় করানো গেলে শ্রমিকরা দক্ষতা বাড়াতে পারত ও কারখানাগুলোও লাভজনক হতো।

অর্থনীতিবিদ সায়মা হক বিদিশা বলছেন, সরকারি পাটখাত ঘিরে বড় সংস্কার পরিকল্পনা কখনোই হয়নি।

এখানে সংস্কারের কথা বলে শুধু পাটকল বন্ধ করা হয়েছে আর মাঝে মধ্যে স্বপ্ন দেখানো হলেও সংস্কারের জন্য কার্যকর কোনো পন্থা কখনোই অবলম্বন করা হয়নি।

২০১৫ সালের দিকে স্বল্প-মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা করা হয়েছিল কিন্তু তার বাস্তবায়ন দেখিনি। মূলত পাটকলের ব্যবস্থাপনায় যারা ছিলেন তারা সংস্কার বা উন্নতি বা নতুন ইনোভেটিভ কোনো কিছু দিকে তাদের কোনো আগ্রহ দেখিনি। ফলে অনিয়ম দুর্নীতি চলে ও তার দায়ভার শ্রমিকের ঘাড়ে পড়েছে।

তিনি বলছেন এখন রাষ্ট্রায়ত্ত কলগুলোর ভবিষ্যৎ কি হয় নির্ভর করবে সরকারি বেসরকারি খাতের নামে এগুলোর পরিচালন পদ্ধতি কেমন হয় তার ওপর। তবে দুর্নীতিমুক্ত ও কার্যকর ব্যবসায়িক নীতির ভিত্তিতে হলে সামনে পাটখাতে শক্তিশালী ভিত পাবে বলেই আশা করছেন তিনি।

তবে এবার পাটকল বন্ধের ঘোষণা দিয়ে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী বলেছেন বন্ধ করা পাটকলগুলো বিক্রি না করে এগুলোতে দক্ষ ম্যানেজমেন্ট দেয়া হবে সরকারি বেসরকারি যৌথ অংশীদারিতে এবং এর মাধ্যমে আর বিকশিত হয়ে উঠবে এক সময়ের সোনালী আঁশ-পাট। বিবিসি বাংলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে